এইচএসসির প্রথম দুই পরীক্ষাতেই বিভিন্ন কেন্দ্রে ভুল প্রশ্ন বিতরণ

পরীক্ষার্থী-অভিভাবকরা ক্ষুব্ধ

Md. Raquibul Haque
রকীবুল হক

এইচএসসির প্রথম দুই পরীক্ষাতেই বিভিন্ন কেন্দ্রে ভুল প্রশ্ন বিতরণ
ছবি: সংগৃহীত

এসএসসি পরীক্ষার পর এবার চলমান এইচএসসিতেও প্রশ্নপত্র বিতরণে অব্যবস্থাপনার অভিযোগ উঠেছে। পরীক্ষা শুরুর প্রথম দুই দিনে দেশের বিভিন্ন কেন্দ্রে ভুল প্রশ্নপত্র বিতরণের ঘটনায় পরীক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে ক্ষোভ ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ভুল প্রশ্নে পরীক্ষা দেওয়ায় ফলাফলে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা। সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ডগুলো বিষয়টি সমাধান এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিলেও অনিশ্চয়তা কাটছে না পরীক্ষার্থীদের।

জানা গেছে, এইচএসসি পরীক্ষায় ভুল প্রশ্নপত্র বিতরণের ঘটনায় সংশ্লিষ্টদের সতর্ক করে নোটিস দিয়েছে আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটি। এ ধরনের ভুলের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলেও জানিয়েছেন আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও ঢাকা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান। গতকাল শনিবার তিনি আমার দেশকে আরো জানান, পরীক্ষার আগে কেন্দ্রসচিব ও দায়িত্বপ্রাপ্তদের নিয়ে মতবিনিময়সহ প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এর পরও কোনো অনিয়ম হলে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।

বিজ্ঞাপন

সূত্রমতে, গতকাল শনিবার দ্বিতীয় দিনের পরীক্ষায় জামালপুরের একটি কেন্দ্রে ২০২৫ সালের সিলেবাসের প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা দিয়েছেন ২০২৬ সালের ১০০ পরীক্ষার্থী। সরকারি আশেক মাহমুদ কলেজ কেন্দ্রে বাংলা দ্বিতীয় পত্র পরীক্ষায় সরকারি জাহেদা সফির মহিলা কলেজের ১০০ শিক্ষার্থী ওই প্রশ্নেই পরীক্ষা দেন। পরে বিষয়টি জানতে পেরে শিক্ষা বোর্ডকে অবহিত করা হয়।

পরীক্ষার্থীরা জানান, পরীক্ষা দেওয়া শেষে আমরা দেখতে পাই, প্রশ্নের ওপরে লেখা ‘২০২৫ সালের সিলেবাস অনুযায়ী’। তার মানে, এই প্রশ্ন আমাদের না। পরে অধ্যক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করলে সমাধানের আশ্বাস দেওয়া হয় কলেজ থেকে। তাদের একটি ভুলের কারণে যে আমার ‘এ’ প্লাস কেটে যাবে না, এটার নিশ্চয়তা কে দেবে?

তবে এসব বিষয়ে আশেক মাহমুদ কলেজের অধ্যক্ষ মীর শওকত আলম মীর গণমাধ্যমকে বলেন, আমাদের কাছে যে প্রশ্নপত্র আসে, সেগুলোয় ২০টি প্রশ্নপত্রে একটি বান্ডেল হয়। ৪২০২ নম্বর কক্ষের জন্য যে ৫টি বান্ডেল খোলা হয়, সেসবের প্রতিটি বান্ডেলের ওপরে ২০২৬ সালের প্রশ্নপত্র লেখা ছিল। কিন্তু ভেতরে ছিল ২০২৫ সালের সিলেবাস অনুযায়ী প্রশ্নপত্র। পরীক্ষা শুরুর আগে বিষয়টি দেখার সুযোগ না থাকায় শিক্ষকরা বান্ডেল খুলে পরীক্ষার্থীদের মধ্যে প্রশ্ন বিতরণ করেন। পরীক্ষা শেষে জানা যায়, যারা মূলত অনিয়মিত ও মানোন্নয়নের জন্য পরীক্ষা দিচ্ছেন তাদের জন্য ছিল এই প্রশ্ন।

তিনি আরো বলেন, বিষয়টি জানাজানির পর আমরা যোগাযোগ করলে বোর্ড থেকে বলা হয়েছে, সেই ১০০ পরীক্ষার্থীর উত্তরপত্র আলাদাভাবে পাঠাতে। তাদের উত্তরপত্রগুলো নমনীয়ভাবে এবং ২০২৫ সালের প্রশ্নপত্র অনুযায়ী দেখা হবে।

এর আগে নরসিংদীতে এইচএসসি পরীক্ষার দুটি কেন্দ্রে ভুল প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা গ্রহণের অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় দায়িত্বে থাকা ছয় শিক্ষককে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে এবং কেন্দ্র সচিবের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে প্রশাসন। গত বৃহস্পতিবার (প্রথম দিন) অনুষ্ঠিত এইচএসসি বাংলা প্রথমপত্রের পরীক্ষায় মনোহরদীতে এমসিকিউ ও সদর উপজেলায় লিখিত পরীক্ষায় ভুল প্রশ্নে পরীক্ষা নেওয়া হয়।

মনোহরদীর কেন্দ্রটিতে লিখিত অংশ শেষে ৩০ নম্বরের এমসিকিউ পরীক্ষার সময় দুটি কক্ষের শতাধিক পরীক্ষার্থীকে নির্ধারিত নতুন সিলেবাসের প্রশ্নপত্রের পরিবর্তে বাংলা প্রথমপত্রের ‘খ’ সেট (১২১ কোড) ভিন্ন প্রশ্নপত্র বিতরণ করা হয়। এ ঘটনায় শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে।

মনোহরদী সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর আব্দুল মান্নান বলেন, শিক্ষার্থীদের অভিযোগ পাওয়ার পর বিষয়টি জানা গেছে। পরীক্ষার দায়িত্বে থাকা শিক্ষকদের অবহেলার কারণেই এ ঘটনা ঘটেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিষয়টির সমাধানে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে।

এদিকে টাঙ্গাইলের মির্জাপুর শহীদ ভবানী প্রসাদ সাহা সরকারি কলেজ কেন্দ্রের একটি কক্ষে ভুলবশত ২০২৫ সালের প্রশ্নপত্র বিতরণের ঘটনায় দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে দুই শিক্ষককে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার এইচএসসি পরীক্ষার প্রথম দিন বাংলা প্রথমপত্র পরীক্ষায় এ ঘটনা ঘটে।

কলেজ সূত্রে জানা গেছে পরীক্ষার্থী ও উপজেলা সদরে অবস্থিত শহীদ ভবানী প্রসাদ সাহা সরকারি কলেজ কেন্দ্রের অডিটোরিয়াম কক্ষে প্রথমে ৩০ নম্বরের নৈর্ব্যক্তিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র বিতরণ করে পরীক্ষা নেওয়া হয়। এরপর তাদের সৃজনশীল প্রশ্ন দেওয়া হয়। এ সময় ভারতেশ্বরী হোমসের এক পরীক্ষার্থীকে নতুন সিলেবাসের প্রশ্নপত্রের পরিবর্তে ২০২৫ সালের বাংলা প্রথমপত্রের সৃজনশীল প্রশ্নপত্র দেওয়া হয়। পরীক্ষা শুরুর প্রায় ২০ মিনিট পর ভারতেশ্বরী হোমসের অধ্যক্ষ মন্দিরা চৌধুরী ও মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার জুলফিকার হায়দার ওই কক্ষ পরিদর্শনে গিয়ে শিক্ষার্থীর কাছ থেকে এ বিষয়ে অভিযোগ পান। পরে বিষয়টি নিশ্চিত হলে ওই শিক্ষার্থীকে ২০২৬ সালের সিলেবাসের প্রশ্ন দেওয়া হয়।

ভারতেশ্বরী হোমসের ওই শিক্ষার্থী বলেন, অন্যদের সঙ্গে তার প্রশ্ন না মেলায় সন্দেহ হয়। পরে তিনি ভালোভাবে খেয়াল করে দেখেন তাকে ২০২৫ সালের সিলেবাসের প্রশ্নপত্র দেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে প্রায় ২০ মিনিট কেটে যায়।

আন্তঃশিক্ষা বোর্ডের সতর্ক নোটিস

নিয়মিত পরীক্ষার্থী (২০২৬ সালের সিলেবাস) ও অনিয়মিত পরীক্ষার্থীদের (২০২৫ সালের সিলেবাস) ভিন্ন কক্ষে আসন ব্যবস্থাকরণ এবং প্রশ্ন বিতরণের ক্ষেত্রে (সিলেবাস অনুযায়ী) অধিক সতর্কতা নিতে নোটিস দিয়েছে আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটি।

গত শুক্রবার আন্তঃশিক্ষা বোর্ড পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক কমিটি আহ্বায়ক ও ঢাকা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক প্রফেসর জেসমিন তাসলিমা বানু স্বাক্ষরিত নোটিসে বলা হয়, এইচএসসি পরীক্ষা ২০২৬-এর বিভিন্ন কেন্দ্র পরিদর্শনকালে লক্ষ করা গেছে, কিছু কেন্দ্রে নিয়মিত পরীক্ষার্থী (২০২৬ সালের সিলেবাস) ও অনিয়মিত পরীক্ষার্থীদের (২০২৫ সালের সিলেবাস) ভিন্ন ভিন্ন কক্ষে আসনের ব্যবস্থা করা হয়নি। একই কক্ষে দুই বছরের (২০২৬ ও ২০২৫ সাল) সিলেবাসের পরীক্ষার্থী থাকায় প্রশ্ন বিতরণে জটিলতা সৃষ্টি হচ্ছে। বিষয়টি পাবলিক পরীক্ষা পরিচালনা নীতিমালা পরিপন্থী।

এ অবস্থায় নিয়মিত ও অনিয়মিত পরীক্ষার্থীদের ভিন্ন ভিন্ন কক্ষে আসন ব্যবস্থা গ্রহণ করা এবং প্রশ্ন বিতরণে অধিক সতর্কতা গ্রহণ করার জন্য এইচএসসি পরীক্ষা ২০২৬-এর সব কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের পুনরায় নির্দেশ দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে এ নির্দেশনার ব্যত্যয় ঘটলে কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন