দিনের আলো ফুরিয়ে সন্ধ্যা নামতেই জামালপুর শহরের পাঁচ রাস্তা মোড়ে ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপে জমে ওঠে আড্ডা। সেই ব্যস্ততার মাঝেই হাসিমুখে ক্রেতাদের হাতে একের পর এক চায়ের কাপ তুলে দেন ১৮ বছর বয়সি জিহাদ। তবে তিনি শুধু একজন চা বিক্রেতা নন, তিনি একজন স্বপ্নবাজ শিক্ষার্থীও। সকালে কলেজে ক্লাস করেন আর বিকেল থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত বাবার সঙ্গে চায়ের দোকানে কাজ করেন। দিন শেষে বাড়ি ফিরে শুরু হয় তার আরেক যুদ্ধ পড়াশোনা।
জিহাদ জামালপুরের শহীদ জিয়াউর রহমান ডিগ্রি কলেজের এইচএসসি প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী। অভাবের সংসারে বাবার কাঁধের বোঝা কিছুটা হালকা করতেই কলেজ শেষে ছুটে আসেন চায়ের দোকানে। বাবার সঙ্গে কাজ করে নিজের পড়াশোনার খরচের পাশাপাশি পরিবারের আয়েও হাত বাড়ান।
জিহাদের বাবা আব্দুর রশিদ পেশায় একজন চা বিক্রেতা। জামালপুর শহরের ইকবালপুর এলাকায় ভাড়া বাসায় স্ত্রী, দুই ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে পাঁচ সদস্যের সংসার। সীমিত আয়ে সংসারের খরচ চালানোই কঠিন। তবুও বড় ছেলে জিহাদকে উচ্চশিক্ষিত করার স্বপ্ন ছাড়েননি তিনি।
জিহাদ বলেন, দরিদ্র পরিবারে জন্ম নিয়েছি। কিন্তু দারিদ্র্যকে কখনো আমার স্বপ্নের বাধা হতে দিইনি। আমাদের পাঁচ জনের সংসার চালাতে আর আমার লেখাপড়ার খরচ জোগাতে বাবাকে অনেক কষ্ট করতে হয়। তাই কলেজ শেষে বাবার সঙ্গে চা বিক্রি করি। রাতে বাড়ি ফিরে পড়াশোনা করি।
তিনি আরও বলেন, আমি উচ্চশিক্ষা অর্জন করে দেশের উন্নয়নে কাজ করতে চাই। একই সঙ্গে দরিদ্র ও অসহায় শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়াতে চাই। আমার মতো যেন কোনো শিক্ষার্থী শুধু অর্থের অভাবে তার স্বপ্ন থেকে পিছিয়ে না যায়, এটাই আমার সবচেয়ে বড় ইচ্ছা।
বাবা আব্দুর রশিদ বলেন, অভাবের সংসার হলেও ছেলেকে মানুষ করার স্বপ্ন ছাড়িনি। যত কষ্টই হোক, চাই সে লেখাপড়া করে একজন শিক্ষিত মানুষ হোক। ছেলেও আমার কষ্ট বুঝে দোকানে কাজ করে। ওর এই দায়িত্ববোধ আমাকে নতুন করে সাহস জোগায়।
জিহাদের জীবনসংগ্রাম প্রমাণ করে, প্রতিকূলতা যতই কঠিন হোক, ইচ্ছাশক্তি আর পরিশ্রম থাকলে স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখা যায়। বই আর চায়ের কেতলি দুটোকেই সমান গুরুত্ব দিয়ে এগিয়ে চলা এই তরুণ বিশ্বাস করেন, একদিন শিক্ষাই বদলে দেবে তার পরিবারের ভাগ্য। আর সেই দিন তিনি নিজের মতো সংগ্রামী শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়িয়ে তাদের স্বপ্নপূরণের পথও সহজ করে দিতে চান।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

