ভোরের আলো তখনো পুরোপুরি ফোটেনি। কুয়াশা আর হালকা রোদের আলো-ছায়ার খেলায় ঢাকা শহর তখনো কিছুটা ঘুমন্ত। যান্ত্রিক জীবনের একঘেয়েমি থেকে মুক্তি পেতে এবং স্থাপত্যের এক অনন্য বিস্ময়কে নিজের চোখে প্রত্যক্ষ করতে আমরা চার বন্ধু (ইব্রাহিম, হাদী, মেহেদী ও প্রান্ত) মিলে বেরিয়ে পড়লাম। ঠিক করলাম, আজ আমাদের গন্তব্য টাঙ্গাইল জেলার গোপালপুর উপজেলার নগদা শিমলা ইউনিয়নের দক্ষিণ পাথালিয়া গ্রাম। সেখানে ঝিনাই নদীর পূর্ব তীরে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে বিশ্বের অন্যতম স্থাপত্যশৈলী ‘২০১ গম্বুজ মসজিদ’!
মাইক্রোবাস স্টার্ট হতেই মনের মধ্যে এক অন্যরকম রোমাঞ্চ অনুভব শুরু হলো। আমরা মূলত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ফুলার রোড থেকে যাত্রা শুরু করলাম। টাঙ্গাইল সদর হয়ে গোপালপুরের উদ্দেশে রওনা হলাম। দীর্ঘদিনের ব্যস্ততার পর গ্রামীণ পিচঢালা আঁকাবাঁকা পথ আর দুপাশে সবুজের সমারোহ দেখে চোখ জুড়িয়ে যাচ্ছিল। টাঙ্গাইল শহর পার হয়ে যখন গোপালপুরের রাস্তায় ঢুকলাম, তখন গ্রামীণ পরিবেশ আরো স্পষ্ট হয়ে উঠল। পথের ক্লান্তি দূর করে দিচ্ছিল শাঁ-শাঁ করে বয়ে যাওয়া মৃদু হাওয়া।
গ্রামের পথে অনন্য প্রবেশ
গোপালপুর উপজেলা সদর থেকে প্রায় সাত কিলোমিটার পশ্চিমে এগোতেই গ্রামীণ মেঠো পথ আমাদের স্বাগত জানাল। নদীর কাছাকাছি আসতেই দূর আকাশপানে চোখ আটকে গেল। দিগন্ত ভেদ করে আকাশ ছুঁয়ে দাঁড়িয়ে আছে একটি বিশাল মিনার! বন্ধুদের মধ্য থেকে হাদী চিৎকার করে বলে উঠল, ‘ওই দেখ্, আমাদের গন্তব্য!’ গাড়ি যত সামনের দিকে যাচ্ছে, ততই বিস্ময় ঘনীভূত হচ্ছে। গাড়ি থেকে যখন নামলাম, তখন আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে এক আধুনিক মুসলিম স্থাপত্যের মহাকাব্য। ঝিনাই নদীর মৃদু স্রোতের কলতান আর মসজিদের শান্ত পরিবেশ এক অদ্ভুত আত্মিক শান্তি এনে দিল।
স্থাপত্যের আলোয় প্রথম দেখা
মসজিদ প্রাঙ্গণে পা রাখতেই পুরো শরীর-মন মুগ্ধতায় ভরে গেল। প্রায় ১৫ বিঘা জমির ওপর নির্মিত এই বিশাল মসজিদ ও তার চারপাশের পরিবেশ এক রাজকীয় আবহ তৈরি করে রেখেছে। নকশা ও কাঠামোর দিক থেকে এটি যে কত আধুনিক এবং একইসঙ্গে ঐতিহ্যবাহী, তা প্রথম দেখাতেই অনুমেয়। আমাদের গাইড হিসেবে স্থানীয় এক ব্যক্তি, নাম রেদোয়ান, এগিয়ে এলেন। তিনি অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে আমাদের এই মসজিদের খুঁটিনাটি ইতিহাস ও স্থাপত্যের বিবরণ দিতে লাগলেন।
তিনি জানালেন, বীর মুক্তিযোদ্ধা রফিকুল ইসলাম কল্যাণ ট্রাস্টের উদ্যোগে ২০১৩ সালের জানুয়ারি মাসে এই অনন্য মসজিদের নির্মাণকাজ শুরু হয়। আনুমানিক ১০০ কোটি টাকারও বেশি ব্যয়ে নির্মিত এই স্থাপনাটি এরই মধ্যে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি গম্বুজবিশিষ্ট মসজিদ হিসেবে দর্শনার্থীদের মাঝে ব্যাপক সমাদৃত হয়েছে।

২০১ গম্বুজের গোলকধাঁধায় হারিয়ে যাওয়া
আমরা যখন মসজিদের ছাদে তাকালাম, তখন আমাদের চোখ বিস্ময়ে চড়কগাছ! চারদিকে শুধু গম্বুজ আর গম্বুজ! ছাদের ঠিক মাঝখানে মূল গম্বুজটি উচ্চতায় প্রায় ৮১ ফুট। এই বিশাল আকৃতির মূল গম্বুজটিকে কেন্দ্র করে অত্যন্ত সুনিপুণভাবে ঘিরে রাখা হয়েছে ১৭ ফুট উচ্চতার আরো ২০০টি ছোট ছোট গম্বুজ। নীল, সাদা আর সোনালি রঙের টাইলসের নিখুঁত কাজ রোদের আলোয় হীরের মতো চকচক করছিল। আমরা সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে গম্বুজগুলো খুব কাছ থেকে দেখলাম। তখন মনে হচ্ছিল, যেন কোনো এক স্বপ্নিল দুনিয়ায় দাঁড়িয়ে আছি। প্রতিটি গম্বুজের নকশায় সাবকন্টিনেন্টাল বা উপমহাদেশীয় ইসলামি ঐতিহ্যের ছোঁয়া স্পষ্ট।
আকাশছোঁয়া মিনার ও কোরআনের লিপি
গম্বুজের সৌন্দর্য উপভোগ করার পর আমাদের নজর কাড়ল মসজিদের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে অবস্থিত মূল মিনারটি। রেদোয়ান আমাদের জানালেন, এটি বিশ্বের অন্যতম সর্বোচ্চ কংক্রিটের তৈরি মিনার। এর উচ্চতা ৪৫১ ফুট (প্রায় ৫৭ তলা ভবনের সমান)। এই সুউচ্চ মিনারের দিকে তাকালে মাথা সোজা রাখা দায়! মনে হয়, মিনারটি যেন মেঘ ফুঁড়ে আকাশ স্পর্শ করেছে। এছাড়া মসজিদের চার কোনায় রয়েছে ১০১ ফুট উঁচু আরো চারটি মিনার এবং মূল গম্বুজের পাশে রয়েছে ৮১ ফুট উচ্চতার আরো চারটি মিনার। মোট ৯টি মিনারের এই রাজকীয় বিন্যাস পুরো মসজিদের অবয়বকে এক অভূতপূর্ব মহিমান্বিত রূপ দিয়েছে।
আমরা ধীরে ধীরে মসজিদের অভ্যন্তরে প্রবেশ করলাম। ভেতরে ঢুকতেই এক স্নিগ্ধ-শীতল হাওয়া আমাদের মিষ্টি পরশ বুলিয়ে দিল। দোতলাবিশিষ্ট এই বর্গাকৃতির মসজিদের দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ সমান—১৪৪ ফুট করে। ভেতরের বিশাল হলরুমে একসঙ্গে প্রায় ১৫ হাজার মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন। মসজিদের ভেতরের দেয়ালগুলোর দিকে তাকাতেই আমরা স্তব্ধ হয়ে গেলাম। আধুনিক ক্যালিগ্রাফির মাধ্যমে দেয়ালজুড়ে খোদাই করে লেখা রয়েছে পবিত্র কোরআন শরিফ। রেদোয়ান গর্ব করে বললেন, ‘আপনি কি কল্পনা করতে পারেন—দেয়ালজুড়ে এভাবে পবিত্র কোরআন লিপিবদ্ধ করা হয়েছে!’ পিতল, মার্বেল পাথর আর আমদানিকৃত মূল্যবান টাইলসের এই কারুকার্য সত্যি দেখার মতো। জানা গেল, মসজিদের প্রধান দরজাটি তৈরিতে ব্যবহার করা হয়েছে প্রায় ৫০ মণ পিতল।

প্রশান্তির আসরের নামাজ
ঘড়ির কাঁটায় তখন বিকাল ৪টা বেজে ৫৫ মিনিট। মসজিদের মুয়াজ্জিনের সুমধুর কণ্ঠে আসরের আজান ধ্বনিত হলো। ঝিনাই নদীর বাতাস আর লাউডস্পিকারে ভেসে আসা আজানের সুর মিলেমিশে এক আধ্যাত্মিক পরিবেশের সৃষ্টি করল। আমরা দ্রুত অজুখানায় গিয়ে অজু সেরে নিলাম। অজুখানাটিও চমৎকার এবং অত্যন্ত পরিচ্ছন্ন।
ভেতরে প্রবেশ করে আমরা কাতারে দাঁড়ালাম। যখন ইমাম সাহেবের পেছনে সিজদায় গেলাম, তখন মনে হলো যান্ত্রিক জীবনের সমস্ত ক্লান্তি, হতাশা আর কোলাহল নিমেষেই ধুয়েমুছে গেছে। চারপাশের শান্ত পরিবেশ আর খোদাই করা কোরআনের আয়াতের মাঝে নামাজ আদায়ের সেই অভিজ্ঞতা আমার জীবনের অন্যতম সেরা অনুভূতি ও স্মরণীয় মুহূর্ত হয়ে থাকবে। নামাজ শেষে আমরা বেশ কিছুক্ষণ মসজিদের মেঝেতে বসে রইলাম। স্থানীয় মানুষ ও দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা দর্শনার্থীদের ভিড়ে মসজিদটি মুখরিত ছিল। তারপরও এক অদ্ভুত নীরবতা বিরাজ করছিল, সবার মনে যেন শান্তিময় অনুভূতি ছিল।
সামাজিক কল্যাণেও অনন্য…
নামাজ শেষে আমরা মসজিদ কমপ্লেক্সের বাকি অংশগুলো ঘুরে দেখতে বের হলাম। এটি কেবল একটি ইবাদতখানা নয়, বরং একটি পূর্ণাঙ্গ সামাজিক কল্যাণ কেন্দ্র। স্থানীয় মানুষদের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারলাম, এই কমপ্লেক্সের অধীনে একটি সম্পূর্ণ বিনা মূল্যে চিকিৎসা প্রদানের দাতব্য হাসপাতাল, একটি সমৃদ্ধ এতিমখানা, বৃদ্ধাশ্রম এবং অসচ্ছল মুক্তিযোদ্ধাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। দেশি-বিদেশি বিশিষ্ট অতিথিদের যাতায়াতের সুবিধার্থে এখানে একটি আধুনিক হেলিপ্যাডও নির্মাণ করা হয়েছে। ধর্মীয় অনুভূতির পাশাপাশি মানবকল্যাণের এই মহৎ উদ্যোগ দেখে এই মসজিদের পেছনের কারিগরদের প্রতি শ্রদ্ধায় মন ভরে গেল।

বিকেলের ঝিনাই নদী ও বিদায়ের সুর
দেখতে দেখতে সূর্য পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়ল। আমরা মসজিদের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া ঝিনাই নদীর পাড়ে গিয়ে বসলাম। পড়ন্ত বিকেলের সোনালি রোদ যখন ২০১টি গম্বুজের ওপর পড়ে, তখন নদীর পানিতে তার এক মায়াবী প্রতিফলন তৈরি হয়। নদীপারের শীতল হাওয়া আর দূরের মসজিদ থেকে ভেসে আসা শিশুদের কোরআন তেলাওয়াতের আওয়াজ আমাদের বিমুগ্ধ করল। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের ফেরার সময় হয়ে এলো। প্রকৃতির শান্ত রূপ আর মানুষের তৈরি এই স্থাপত্যের বিস্ময়কে পেছনে ফেলে আমরা গাড়িতে উঠলাম। টাঙ্গাইলের এই ২০১ গম্বুজ মসজিদ ভ্রমণ কেবল আমার চোখের দেখার তৃপ্তি মেটায়নি, বরং আমার আত্মাকে এক পরম প্রশান্তিতে ভরিয়ে দিয়েছে। গাড়ির জানালা দিয়ে যখন শেষবারের মতো সুউচ্চ মিনারটির দিকে তাকালাম, মনের ভেতর তখনো প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল এক পরম তৃপ্তির সুর। এটি কেবল ইটের তৈরি কোনো দালান নয়, এটি মানুষের ভক্তি, মেধা আর অসাধারণ নান্দনিকতার এক জীবন্ত দলিল।
যাতায়াত ব্যবস্থা
২০১ গম্বুজ মসজিদ দেখতে যেতে হলে বাংলাদেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে প্রথমে টাঙ্গাইল জেলা সদরে আসতে হবে। টাঙ্গাইল সদর থেকে মসজিদটি ৫০ কিলোমিটার এবং গোপালপুর উপজেলা সদর থেকে সাত কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। টাঙ্গাইল থেকে বাসে অথবা সিএনজিতে করে গোপালপুর উপজেলায় এসে অটো বা সিএনজি ভাড়া নিয়ে সহজেই ২০১ গম্বুজ মসজিদে যেতে পারবেন। এছাড়া ঢাকার মহাখালী বাস টার্মিনাল থেকে ‘দ্রুতগামী’ বাসে করে ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা ভাড়ায় গোপালপুর যেতে পারবেন। গোপালপুর থেকে ২০-৩০ টাকা ভাড়ায় সিএনজি, ইজিবাইক বা ভ্যানে যেতে পারবেন ২০১ গম্বুজ মসজিদে। ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের যেকোনো স্থান থেকে দ্রুতগামী বাসে উঠতে পারবেন। গোপালপুর থেকে বিকাল ৫টার সর্বশেষ ঢাকাগামী বাস ছেড়ে আসে।
লেখক : এমফিল শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

