গাইবান্ধার সাঘাটার উদয়ন মহিলা ডিগ্রি কলেজটি চরাঞ্চলসহ অবহেলিত এলাকার নারী শিক্ষায় বিশেষ অবদান রেখে চলেছে। তিন বছর ধরে শতভাগ পাসের রেকর্ডের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটি ধারাবাহিকভাবে ভালো ফল করে জেলার অন্যতম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করেছে। এখানকার শিক্ষকদের একাগ্রতা, ব্যতিক্রমধর্মী পাঠদান পদ্ধতি এবং শিক্ষার্থীদের ফল উন্নয়নে নেওয়া নানা উদ্যোগ পুরো জেলাজুড়ে প্রশংসা কুড়িয়েছে। এলাকার নারী শিক্ষার্থীদের জন্য আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন এই কলেজটি প্রত্যন্ত পল্লি অঞ্চলে অবস্থিত হয়েও একটি আকর্ষণীয় ও বৈচিত্র্যময় শিক্ষাঙ্গনের উদাহরণ সৃষ্টি করেছে।
উদয়ন মহিলা ডিগ্রি কলেজটি ১৯৯৬ সালে সাঘাটা উপজেলার মুক্তিনগর ইউনিয়নের পুটিমারীতে স্থাপিত হয়। যমুনা নদীর কোল ঘেঁষে জেলেপাড়া নামক স্থানে মাত্র ২৩ নারী শিক্ষার্থী নিয়ে প্রতিষ্ঠানটির পাঠদান কার্যক্রম শুরু হয়। অত্র এলাকার শিক্ষানুরাগী ব্যক্তিত্ব মরহুম শাহাদাত হোসেন মণ্ডলের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় কলেজটি গড়ে ওঠে। এ কলেজটি চরাঞ্চলের অবহেলিত পিছিয়ে পড়া নারীদের মধ্যে শিক্ষার আলো পৌঁছে দিয়ে জাতীয় উন্নয়নে অনন্য ভূমিকা রাখে।
বর্তমানে কলেজটিতে ৯ শতাধিক শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছে। শিক্ষক ও কর্মচারী রয়েছেন ৫৬ জন। ডিগ্রি (পাস) কোর্সে প্রায় ৩ শতাধিক শিক্ষার্থী পড়ালেখা করছে। বিগত দিনে প্রায় প্রতিবারই ৯০ শতাংশের বেশি পাসের হার নিয়ে কলেজটি স্থানীয় লোকজনের আস্থা অর্জন করেছে।
এ কলেজটির রয়েছে নিজস্ব ৩ দশমিক ১০ একর জমির ওপর নির্মিত অবকাঠামো। আধুনিক লাইব্রেরি, বিজ্ঞান গবেষণাগার, মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম এবং শিক্ষার্থী-শিক্ষকদের জন্য স্বল্পমূল্যের ক্যান্টিন প্রতিষ্ঠানটির উল্লেখযোগ্য সুবিধা। মাত্র ২০ টাকায় দুপুরের পুষ্টিকর খাবার খাওয়ার ব্যবস্থা চরাঞ্চলের অসচ্ছল শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদা সুযোগ তৈরি করেছে।
কলেজটির ব্যবস্থাপনা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক শহিদুল ইসলাম সোহেল বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের শুধু পাঠ্যপুস্তকের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সহশিক্ষা কার্যক্রমে অংশগ্রহণের মাধ্যমে যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে আমরা কাজ করে যাচ্ছি।’ তিনি বলেন, অত্র এলাকায় নারী শিক্ষা উন্নয়নে এ প্রতিষ্ঠানটি সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছে।
ইংলিশ ল্যাঙ্গুয়েজ ক্লাব, কম্পিউটার প্রশিক্ষণ, গল্পের আসর, রোভার স্কাউট, বিতর্ক প্রতিযোগিতা এবং বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে নিয়মিত সচেতনতামূলক কর্মসূচি পরিচালিত হয়। এসব কার্যক্রম শিক্ষার্থীদের আত্মবিশ্বাসী করে গড়ে তোলার পাশাপাশি সামাজিক দায়বদ্ধতা সম্পর্কে সচেতন করছে। এখানকার নারী শিক্ষার্থীরা লেখাপড়া শেষ করে বেকার থাকে না। নানামুখী শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে ব্যক্তি জীবনে তাদের সাফল্য ও প্রাপ্তি নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
এলাকার অভিভাবক ও উদয়ন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আনোয়ার হোসেন সাজু বলেন, নারী শিক্ষায় একসময় পিছিয়ে থাকা এ জনপদের মানুষকে এগিয়ে নিতেই প্রতিষ্ঠানটির যাত্রা শুরু হয়েছিল। বর্তমানে শতভাগ পাসের হার ও ধারাবাহিক ভালো ফলের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি অভিভাবকদের আস্থা অর্জন করেছে। এ ছাড়া তিন বছর ধরে ডিগ্রি পরীক্ষায় শতভাগ পাসের কৃতিত্ব অর্জন করে প্রতিষ্ঠানটি একটি অনন্য রেকর্ড গড়েছে।
এ ব্যাপারে কলেজের ইংরেজি বিভাগের প্রভাষক আরিফুল ইসলাম কাজী বলেন, পাঠ্যসূচির বাইরেও অধিক সময় ধরে নানা বিষয়ে শিক্ষা দেওয়ায় এখানকার শিক্ষার্থীরা আত্মনির্ভরশীল হয়ে উঠছে।
এ কলেজের পাঠদান কার্যক্রমের সাফল্য ইতোমধ্যে জাতীয় পর্যায়ে স্বীকৃতি পেলেও প্রতিষ্ঠানটি এখনো সরকারি হয়নি।
কলেজের অধ্যক্ষ মো. মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘আমাদের প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা শুধু শিক্ষিতই হচ্ছে না, তারা আত্মনির্ভরশীল মানুষ হিসেবেও গড়ে উঠছে। তাদের সাফল্যই প্রমাণ করে আমাদের শিক্ষকরা কতটা নিষ্ঠা ও পরিশ্রমের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন।’
তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘বিগত সময়ে অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ হলেও আমাদের এই প্রতিষ্ঠানটি বারবার উপেক্ষিত হয়েছে।’
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

