মীর মশাররফ হোসেনের বিষাদ-সিন্ধু বাংলা সাহিত্যের ক্লাসিক উপন্যাস। ট্রাজিক গল্প, ভাষার সৌন্দর্য, আবেগঘন বিবরণ, নাটকীয়তা এবং পাঠকমন জয় করার অসাধারণ নৈপুণ্য এই উপন্যাসকে যুগের পর যুগ পাঠকের হৃদয়ে অজর করে রেখেছে। কিন্তু একই সঙ্গে এই গ্রন্থকে ঘিরে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন বারবার আলোচিত হয়েছে—‘বিষাদ-সিন্ধু কি ইতিহাস, নাকি নিছক সাহিত্যকর্ম?’
ইতিহাসের কাজ সত্য অনুসন্ধান ও সংরক্ষণ। সেখানে তথ্যের নির্ভুলতা গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে সাহিত্য মানুষের অনুভূতি, কল্পনা ও শিল্পবোধের প্রকাশ। একজন ঔপন্যাসিক বাস্তব ঘটনাকে অবলম্বন করতে পারেন, আবার গল্পবলায় কল্পনার আশ্রয়ও নিতে পারেন। ফলে গল্পটি ইতিহাসভিত্তিক হলেও তা সবসময় কেবল ইতিহাস থাকে না।
বিষাদ-সিন্ধু মূলত কারবালার মর্মন্তুদ ঘটনাকে কেন্দ্র করে রচিত। ইসলামের ইতিহাস বা বিশ্বের ইতিহাসে কারবালার ঘটনা কেবল রাজনৈতিক নয়; সত্য ও অসত্যের, ন্যায় ও অন্যায়ের এবং আদর্শ ও ক্ষমতালিপ্সার চিরন্তন সংগ্রামের প্রতীক। ইমাম হুসাইনের শাহাদাত পৃথিবীর ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়।
কিন্তু বিষাদ-সিন্ধুতে কারবালার ঘটনাকে যেভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গবেষক ও ইতিহাসবিদদের মধ্যে বিতর্ক রয়েছে। অনেকের মতে, উপন্যাসটিতে কিছু ঐতিহাসিক নাম ও ঘটনার উল্লেখ থাকলেও এর অধিকাংশ কাহিনি লেখকের কল্পনার ফসল। বিশেষত ইয়াজিদের সঙ্গে জয়নাবের সম্পর্ক, ইমাম হাসানের বিয়েকে কেন্দ্র করে বিরোধের শুরু, কারবালার ময়দানে কাসেম ও সাকিনার বিয়ে, মুহাম্মদ ইবনে হানাফিয়ার নানা অভিযান এবং আরো বহু ঘটনা ইতিহাসসম্মত নয়।
একটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষণীয়। বাংলা ভাষাভাষী মুসলমানদের একটি বড় অংশ দীর্ঘদিন ধরে বিষাদ-সিন্ধুকে কেবল উপন্যাস হিসেবে নয়, কারবালার ইতিহাস হিসেবে গ্রহণ করে এসেছে। এর পেছনে কয়েকটি কারণ আছে। প্রথমত, দীর্ঘ সময় বাংলায় কারবালার নির্ভরযোগ্য ইতিহাসগ্রন্থ সুলভ ছিল না। দ্বিতীয়ত, মীর মশাররফ হোসেন অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে তার কাহিনি নির্মাণ করেছেন। তিনি এমন আবেগময় ভাষা ব্যবহার করেছেন, যা পাঠককে চরিত্রগুলোর সঙ্গে একাত্ম করে ফেলে। ফলে পাঠক সাহিত্য ও ইতিহাসের সীমারেখা ভুলে যেতে বাধ্য হন।
সাহিত্যের এই শক্তি যেমন প্রশংসনীয়, তেমনি কখনো কখনো তা বিভ্রান্তিরও কারণ হতে পারে। কারণ মানুষ যখন কোনো সাহিত্যকর্মকে নিছক শিল্প হিসেবে না দেখে ইতিহাস হিসেবে গ্রহণ করে, তখন কল্পনা ও বাস্তবতার মিশ্রণ হয়। বিষাদ-সিন্ধুর ক্ষেত্রেও অনেকটা তা-ই ঘটেছে।
মীর মশাররফ হোসেনের ভাষা হৃদয়স্পর্শী এবং নাটকীয়। কারবালার শোককে তিনি এমনভাবে রূপ দিয়েছেন যে, পাঠক যেন নিজেই সেই ঘটনার সাক্ষী হয়ে ওঠেন। তার বর্ণনায় মরুভূমির তৃষ্ণা, অসহায় শিশুদের কান্না, যুদ্ধক্ষেত্রের রক্তাক্ত দৃশ্য এবং বন্দি পরিবারের আর্তনাদ জীবন্ত হয়ে ওঠে।
কিন্তু সাহিত্যিক সাফল্য আর ঐতিহাসিক সত্যতা এক বিষয় নয়। লেখক হিসেবে মীর মশাররফ হোসেন শিল্পের স্বাধীনতা ভোগ করেছেন। কিন্তু পাঠকের দায়িত্ব হলো সাহিত্যকে সাহিত্য হিসেবে এবং ইতিহাসকে ইতিহাস হিসেবে মূল্যায়ন করা।
আজকের যুগে তথ্যপ্রাপ্তি আগের তুলনায় অনেক সহজ। ইসলামের ইতিহাস, কারবালার ঘটনা এবং আহলে বাইতের জীবন সম্পর্কে অসংখ্য গবেষণামূলক গ্রন্থ বাংলাসহ বিভিন্ন ভাষায় পাওয়া যায়। ফলে এখন আমাদের দায়িত্ব হলো ঐতিহাসিক সত্য যাচাই করে দেখা এবং সাহিত্যিক কল্পনার সঙ্গে তার পার্থক্য নির্ণয় করা। কারণ সত্যের প্রতি দায়বদ্ধতা জ্ঞানচর্চার অন্যতম শর্ত।
কারবালার প্রকৃত শিক্ষা কোনো ব্যক্তিগত প্রতিশোধের কাহিনি নয়। এটি ক্ষমতার বিরুদ্ধে ন্যায়ের অবস্থান, অন্যায়ের কাছে আপস না করার অঙ্গীকার এবং ঈমানের জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকারের ইতিহাস। ইমাম হুসাইন এমন এক শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন, যা ইসলামের নৈতিক চেতনাকে বিপন্ন করে তুলেছিল। তার আত্মত্যাগ মানবসভ্যতার ইতিহাসে স্বাধীনতা, ন্যায়বিচার এবং সত্যের জন্য সংগ্রামের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


শহীদ আবু সাঈদের স্মৃতি সংরক্ষণ প্রকল্প শুরু হয়নি দুই বছরেও