জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার বিপ্লবের চেতনাকে সমুন্নত রাখতে ‘জুলাই সনদ’ দ্রুত বাস্তবায়ন, মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনাসহ সকল অপরাধীর বিচার এবং আহত ও শহীদ পরিবারগুলোর যথাযথ পুনর্বাসনের দাবি জানিয়েছেন দেশের বিশিষ্ট রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, আইনজীবী, সাংবাদিক ও আহত যোদ্ধারা।
শনিবার (১১ জুলাই) রাজধানীর শিল্পকলা একাডেমিতে জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বক্তারা এসব দাবি জানান। অনুষ্ঠানে জুলাই বিপ্লব বিষয়ক অডিও-ভিজ্যুয়াল প্রকাশনা সিরিজের উদ্বোধনের পাশাপাশি এর প্রথম গানটি প্রকাশ করা হয়। বাপ্পী খানের সুর ও কথায় গানটিতে কণ্ঠ দিয়েছেন জনপ্রিয় শিল্পী এস আই টুটুল।
জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) কামাল আকবরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ও শহীদ জাবির ইব্রাহীমের মা রোকেয়া বেগম।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, “শহীদদের রক্তের ঋণ পরিশোধের অন্যতম উপায় হলো জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন এবং একটি ন্যায়ভিত্তিক, বৈষম্যহীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করা।” আহত ও পঙ্গুত্ববরণকারী যোদ্ধাদের দুর্দশার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, জুলাইয়ের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে গঠিত পার্লামেন্টে কেউ কেউ এই মহান বিপ্লবের আলোচনাকে ‘অপ্রয়োজনীয়’ বলছেন। এই গাদ্দারি দেশের জনগণ মেনে নেবে না। অনতিবিলম্বে জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করতে হবে।”
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিটি) চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনার উদ্দেশ্যে বলেন, “আপনি ডিসেম্বরে আসবেন না জানুয়ারিতে, তা আপনার ব্যাপার; তবে আমরা আপনাকে কালকেই চাই। কোনো স্ট্যান্ডবাজি বা অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরির চেষ্টা করবেন না। বাংলার মানুষ আর কোনো ফ্যাসিস্টের জন্ম হতে দেবে না।” তিনি আরও যোগ করেন, শেখ হাসিনা বা তার দলকে এ দেশের মানুষ আর কখনো গ্রহণ করবে না।
অনুষ্ঠানে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক উপদেষ্টা শারমিন এস মুরশিদ জুলাই বিপ্লবে নারীদের অবদানের যথাযথ স্বীকৃতি না পাওয়ার বিষয়টি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “৯ হাজার ‘জুলাই কন্যা’ শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতিত হয়েছেন, অনেকে চরম হতাশায় আত্মহত্যাও করেছেন। নারীদের সমমর্যাদা ও নেতৃত্বে স্থান না দিলে এই অভ্যুত্থান পূর্ণতা পাবে না।”
সাবেক চিফ প্রসিকিউটর ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী তাজুল ইসলাম হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, খুনিদের ফুলের মালার বদলে ফাঁসির দড়িতে ঝোলানো হবে। তিনি জানান, ট্রাইব্যুনালে সাক্ষীরা প্রমাণ করেছেন যে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজে আহতদের চিকিৎসা না দিতে এবং আটকে রাখতে ‘নো রিলিজ নো ট্রিটমেন্ট’ নির্দেশনা দিয়েছিলেন। জুলাইয়ের স্মৃতি সংরক্ষণে চলমান সংকটের কথা উল্লেখ করে তিনি অবিলম্বে জুলাই জাদুঘর উদ্বোধন এবং সুশীল সেজে জুলাইয়ের বিপক্ষে কথা বলা দুর্বৃত্তদের গণমাধ্যম ও টকশো থেকে সম্পূর্ণ বয়কটের আহ্বান জানান।
বিএফইউজে-এর সাবেক সভাপতি ও আমার দেশ-এর যুগ্ম সম্পাদক এম আবদুল্লাহ জুলাই ফাউন্ডেশনের আর্থিক সংকট ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন না হওয়ার বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, “জুলাই বিপ্লবের সুবাদে যারা আজ সংসদে ৩৫০ জন এমপি হয়ে সুযোগ-সুবিধা নিচ্ছেন এবং যেসব আমলা পদোন্নতি পেয়েছেন, তারা কি এক মাসের বেতন এই ফাউন্ডেশনে দিতে পারেন না? তা না হলে এই সুযোগ-সুবিধা হালাল হবে না।” একই সাথে তিনি নিজের বেতনের এক মাসের সমপরিমাণ টাকা জুলাই ফাউন্ডেশনে অনুদান দেওয়ার ঘোষণা দেন। তিনি সংবাদমাধ্যমের আমূল সংস্কারেরও দাবি জানান।
জাতীয় যুবশক্তির সাংগঠনিক সম্পাদক রিফাত রশিদ আক্ষেপ করে বলেন, পৃথিবীর অন্য দেশে যুদ্ধাহত বা শহীদদের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মান দেওয়া হলেও বাংলাদেশে আহতদের নিজেদের হকের জন্য হাসপাতালের সামনে বা মন্ত্রণালয়ে ধর্না দিতে হচ্ছে।
অনুষ্ঠানে আহত যোদ্ধাদের পক্ষে রাইসুল রহমান রাতুল, পা হারানো রিফাত এবং দৃষ্টি হারানো সাব্বির ও দুর্জয় তাদের চরম অবহেলা ও মানবেতর জীবনযাপনের চিত্র তুলে ধরেন। তারা অভিযোগ করেন, সরকার কেবল আশ্বাসই দিচ্ছে, কিন্তু গুরুতর আহত ও দৃষ্টিহীন ৪৩ জন যোদ্ধার পুনর্বাসনে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে না। জুলাই আন্দোলনের মাঠের নেত্রী সিনথিয়া জাহিন আয়েশা নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে নারীদের অবমূল্যায়নের অভিযোগ এনে দ্রুত জুলাই সনদের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন দাবি করেন।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

