হালাল পণ্যের বৈশ্বিক বাজার ধরতে চায় বাংলাদেশ

আমার দেশ অনলাইন
আমার দেশ অনলাইন

হালাল পণ্যের বৈশ্বিক বাজার ধরতে চায় বাংলাদেশ
বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়া হালাল শিল্প নিয়ে একযোগে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। ছবি: বিবিসি বাংলা

বাংলাদেশের হালাল শিল্পের উন্নয়ন ও এই খাতের বৈশ্বিক বাণিজ্যিক সম্ভাবনা কাজে লাগাতে মালয়েশিয়ার অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দিচ্ছে ঢাকা। সম্প্রতি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া সফরে দেশটির প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে এবং এর আগে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সফরেও ‘হালাল শিল্প’ নিয়ে দ্বিপক্ষীয় অংশীদারিত্বের বিষয়টি বিশেষভাবে আলোচনায় আসে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রায় ৩ ট্রিলিয়ন ডলারের এই বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের ব্যাপক সম্ভাবনা থাকলেও আন্তর্জাতিক মানের পরীক্ষাগার ও একক সনদের অভাব বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে।

বিজ্ঞাপন

হালাল শিল্প আসলে কী?

বিশেষজ্ঞদের মতে, হালাল শিল্প কেবল ধর্মীয় রীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এটি একটি সমন্বিত বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ইকো-সিস্টেম। এই ব্যবস্থার আওতায় হালাল পণ্য ও সেবার উৎপাদন, উন্নয়ন, সরবরাহ এবং বিতরণের প্রতিটি স্তর একে অপরের সঙ্গে যুক্ত থাকে। এর মধ্যে ব্যাংকিং, পর্যটন, হোটেল, লজিস্টিকস, কসমেটিকস ও ফার্মাসিউটিক্যালসসহ মোট নয়টি প্রধান খাত অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। কাঁচামাল সংগ্রহ থেকে শুরু করে উৎপাদন, প্যাকেজিং, পরিবহন ও ভোক্তার কাছে পৌঁছানো পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে শতভাগ হালাল পদ্ধতি নিশ্চিত করাই এই শিল্পের মূল ভিত্তি।

মালয়েশিয়ার সফল মডেল বাজার পরিধি

হালাল শিল্পে মালয়েশিয়াকে বিশ্বের অন্যতম রোল মডেল ও পথিকৃৎ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ১৯৭০-এর দশক থেকে ধাপে ধাপে একটি আধুনিক, স্বচ্ছ ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন হালাল সার্টিফিকেশন ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে দেশটি। বর্তমানে মালয়েশিয়ায় হালাল পণ্যের চাহিদা ক্রমাগত বাড়ছে।

দেশটির সরকারি পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে সেখানে হালাল পণ্যের বাজার দাঁড়াবে ১১৩ বিলিয়ন ডলারে, যার মধ্যে খাদ্য ও পানীয় খাতের অংশই হবে ৮৫ বিলিয়ন ডলার। এই বিশাল বাজারে প্রতিবছর বিভিন্ন দেশ থেকে প্রায় দেড় হাজার কোটি ডলারের হালাল খাদ্য আমদানি করা হয়, যা ২০৩০ সাল নাগাদ পাঁচ হাজার কোটি ডলার ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।

মালয়েশিয়ায় জাকিম নামের সরকারি সংস্থা প্রতিটি স্তরে যাচাই-বাছাই করে হালাল সনদ দেয় এবং হালাল ডেভেলপমেন্ট কাউন্সিল (এইচডিসি) এই শিল্পের সক্ষমতা বাড়াতে কাজ করে।

বাংলাদেশের সম্ভাবনা চ্যালেঞ্জ

মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ হিসেবে বাংলাদেশে অভ্যন্তরীণভাবেই পণ্যের বড় বাজার রয়েছে। তবে বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের হালাল পণ্য রপ্তানির পরিমাণ এখন মাত্র ৮৫ কোটি ডলারের কাছাকাছি, যার সিংহভাগই কৃষিভিত্তিক পণ্য।

দেশের ব্যবসায়িক সংগঠনগুলো মনে করছে, যথাযথ পদক্ষেপ নিলে মালয়েশিয়ার এই বিশাল বাজারেই বাংলাদেশ কয়েক বিলিয়ন ডলারের খাদ্য রপ্তানি করতে পারে।

বর্তমানে এই খাতের প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো আন্তর্জাতিক মানের সনদ বা সার্টিফিকেশন জটিলতা। বাংলাদেশে ২০২১ সাল থেকে বিএসটিআই এবং ২০২৩ সালের নতুন নীতিমালার পর ইসলামিক ফাউন্ডেশন এই দুটি পৃথক সংস্থা হালাল সনদ দিচ্ছে। একই সঙ্গে দুটি সংস্থার সনদ দেওয়ার প্রক্রিয়া ব্যবসায়ীদের জন্য নতুন জটিলতা তৈরি করছে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ইসলামিক ফাউন্ডেশনের নিজস্ব কোনো পরীক্ষাগার বা ল্যাব নেই, আবার বিএসটিআইয়ের পরীক্ষার সক্ষমতাও সীমিত। বিশ্বমানের পরীক্ষাগার না থাকায় এবং যত্রতত্র পশু জবাইয়ের মতো সনাতন অভ্যাসের কারণে বাংলাদেশ থেকে মাংস ও মাংসজাত পণ্য মালদ্বীপ ছাড়া অন্য কোথাও পাঠানো যাচ্ছে না। এই সনদের দুর্বলতার কারণে অনেক বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠানকে সরাসরি মালয়েশিয়ার ‘জাকিম’ বা সমমানের বিদেশি সংস্থার কাছ থেকে সনদ নিতে হচ্ছে।

উত্তরণের পথ

খাত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, হালাল খাতে বৈশ্বিক সুফল পেতে হলে আন্তর্জাতিক মানের ল্যাবরেটরি সক্ষমতা বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। একই সঙ্গে একটি সুনির্দিষ্ট ‘হালাল অর্থনৈতিক জোন’ প্রতিষ্ঠা করা গেলে এই সংকটের কার্যকর সমাধান সম্ভব। ইতোমধ্যে বাংলাদেশের বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) মালয়েশিয়ার এইচডিসির সঙ্গে কাজ শুরু করেছে। পাশাপাশি আগামী মার্চ মাসে সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সরকারকে নীতিগত সহায়তা দিতে একটি বিশেষ সম্মেলনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন দেশের ব্যবসায়ীরা। আন্তর্জাতিক মানের সনদ নিশ্চিত করা গেলে হালাল শিল্প বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য অন্যতম ‘গেমচেঞ্জার’ হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কূটনৈতিক ও ব্যবসায়ী প্রতিনিধিরা।

সূত্র: বিবিসি বাংলা

এএম

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন