কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও নিষিদ্ধ ছাত্রলীগসহ অঙ্গ-সংগঠনগুলোর দেশব্যাপী অস্থিরতা তৈরির সব নীলনকশা শেষ পর্যন্ত ব্যাপকভাবে ফ্লপ করেছে। মাঠে নামতে পারেনি গত ২০২৪ সালে গণঅভ্যুত্থানে পালিয়ে যাওয়া আওয়ামী লীগ। উল্টো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে ঢাকাসহ সারা দেশে অন্তত দেড় শতাধিক আওয়ামী সদস্যকে নাশকতার অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর মধ্যে রাজধানীতে গ্রেপ্তার হয়েছে অন্তত ২৬ জন আওয়ামী সদস্য।
সতর্কতার অংশ হিসেবে দেশের বিভিন্ন স্থানে সেনাবাহিনী ও বিজিবি মোতায়েন করা হয় নিয়মিত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি। ঢাকাসহ পোশাকের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ছাড়াও সাদা পোশাকে জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই), পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চ (এসবি), ডিজিএফআইসহ অন্যান্য সংস্থার সদস্যরা মাঠে অবস্থান নেয়। সম্ভাব্য ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলোতে কড়া নজরদারি ছিল। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় দিনভর অতিরিক্ত সতর্কতা বজায় ছিল। কোথাও বড় ধরনের সহিংসতা বা সংঘাতের খবর পাওয়া যায়নি। ব্যবসা-বাণিজ্য, যানচলাচল এবং জনজীবন ছিল স্বাভাবিক। আওয়ামী লীগের নাশকতার বিরুদ্ধে রাজপথে ছিল প্রধান বিরোধী দল জামায়াত, এনসিপি, ছাত্রশিবির ও ছাত্রশক্তি। কিছু স্থানে ক্ষমতাসীন বিএনপির নেতাকর্মীরাও ছিল সতর্ক। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আগাম প্রস্তুতি এবং ফ্যাসিবাদবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর সমন্বিত প্রচেষ্টা সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

ছবি: আওয়ামী লীগের নাশকতা ঠেকাতে মঙ্গলবার চট্টগ্রামে সতর্ক অবস্থানে পুলিশ।
ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদ বলেছেন, প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ঘিরে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর চেষ্টা করেছিল, তবে তাদের পরিকল্পনা নস্যাৎ করা হয়েছে। রাজধানীতে আওয়ামী নেতাকর্মীসহ অন্তত ১১৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
নাশকতার আওয়ামী পরিকল্পনা ভেস্তে যাওয়ার পর এখন ঢাকার পরিস্থিতি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক রয়েছে। যে কোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি মোকাবিলায় শহরজুড়ে সেনা, বিজিবি ও পুলিশের যৌথ টহল অব্যাহত থাকছে বলে জানা গেছে।
জানা গেছে, ২৩ জুনকে কেন্দ্র করে কয়েক সপ্তাহ ধরেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, বিভিন্ন এনক্রিপটেড যোগাযোগ প্ল্যাটফর্ম এবং ভারতে অবস্থানরত আওয়ামীপন্থি কয়েকটি নেটওয়ার্কের তৎপরতা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছিল। আমার দেশ-এর রিপোর্ট অনুযায়ী এবং গোয়েন্দা প্রতিবেদনে রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রাম, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা, সিলেটসহ কয়েকটি শহরে আকস্মিক জমায়েত এবং বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি, ককটেল বিস্ফোরণসহ ভীতিকর পরিবেশ সৃষ্টি করার অপচেষ্টার আশঙ্কার কথা উঠে আসে। সেই প্রেক্ষাপটে সরকার আগাম নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করে। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে সম্ভাব্য প্রতিটি ঝুঁকিপূর্ণ পয়েন্টে বসানো হয়েছিল কড়া সিসিটিভি নজরদারি ও নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা চৌকি।

ছবি: আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে নাশকতা ঠেকাতে মঙ্গলবার ধানমন্ডি-৩২ নম্বরে বিজিবির সতর্ক অবস্থান।
রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ মোড়, সরকারি স্থাপনা, কূটনৈতিক এলাকা, আদালতপাড়া এবং রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর স্থানগুলোতে বাড়তি পুলিশ মোতায়েন করা হয়। পাশাপাশি সেনাবাহিনী ও বিজিবির সদস্যদেরও মোতায়েন করা হয়। সরেজমিনে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, ফার্মগেট, কারওয়ানবাজার, তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল, মহাখালী, মিরপুর, উত্তরা, শাহবাগ, ধানমন্ডি ৩২ নম্বর, মতিঝিল ও পুরোনো ঢাকার বিভিন্ন মোড়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর টিম মোতায়েন ছিল। কিছু পয়েন্টে সেনাবাহিনীর সাঁজোয়া যান ও বিজিবির টহল দল মোতায়েন ছিল। নিয়মিত পুলিশ ও র্যাবের পাশাপাশি সাদা পোশাকে জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই), পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চ (এসবি) এবং অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা মাঠে সক্রিয় ছিলেন। কয়েকদিন ধরেই রাজধানীর বিভিন্ন পয়েন্টে চেকপোস্ট বসানো হয়। গতকাল সকাল থেকেই সন্দেহভাজন সংঘবদ্ধ লোক জড়ো হলেই তাদের পরিচয় তল্লাশি করা হয়েছে। রাজধানীজুড়ে নিরাপত্তা জোরদার করতে ড্রোন টহল এবং তল্লাশি চৌকি বাড়ানো হয়। পুলিশ সদর দপ্তর সূত্র জানায়, শুধু ঢাকাতেই নয়, দেশের প্রতিটি বিভাগীয় ও জেলা শহরেও একই ধরনের সতর্কাবস্থা জারি ছিল। যার ফলে আওয়ামী লীগের জেলা পর্যায়ের নেতারাও কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে সাহস পাননি।

ছবি: গাজীপুরের টঙ্গীতে মিছিল বের করে যুবদল।
ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদ গতকাল এক ব্রিফিংয়ে বলেন, নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীকে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর চেষ্টা করেছিল। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বিত প্রস্তুতির কারণে তাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের আগেই ভেস্তে গেছে। তিনি বলেন, রাজধানীর নিরাপত্তা নিশ্চিতে সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল এবং পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণে রাখা হয়। তিনি আরো জানান, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে গত রোববার রাত থেকে শুরু হওয়া বিশেষ অভিযানে রাজধানীতে ২৬ জন চিহ্নিত আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীসহ মোট ১১৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট সহিংসতা ও অন্তর্ঘাতমূলক কর্মকাণ্ডের মামলা রয়েছে। শুধু ঢাকা নয়, দেশের বিভিন্ন জেলাতেও বিশেষ অভিযান পরিচালিত হয়েছে।
ফ্যাসিবাদী শক্তির এই অন্তর্ঘাতমূলক পরিকল্পনা সম্পূর্ণ ব্যর্থ হওয়ায় রাজধানীর সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে স্বস্তি ফিরে এসেছে। মতিঝিলের ব্যবসায়ী সায়েম খান বলেন, ‘আমরা আর কোনো সহিংসতা চাই না। যারা অতীতে মানুষের ওপর জুলুম করেছে, তারা আবার ফিরে এসে বোমাবাজি করবে— এটা দেশের মানুষ কখনোই মেনে নেবে না।
নিরাপত্তা সংস্থার একাধিক সূত্র এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের মতে, গত দুই বছরে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক কাঠামো কার্যত ভেঙে পড়েছে। শীর্ষ পর্যায়ের বহু নেতা আত্মগোপনে, কারাগারে অথবা দেশের বাইরে অবস্থান করছেন। ফলে কেন্দ্রীয় নির্দেশনা মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নের সক্ষমতা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ২৩ জুনকে ঘিরে ব্যাপক প্রস্তুতির গুঞ্জন থাকলেও মাঠে উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি নিশ্চিত করতে না পারা সেই দুর্বলতারই প্রতিফলন। সম্ভাব্য কর্মসূচির স্থানগুলোতে আগাম নজরদারি ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের ফলে সংগঠিত হওয়ার সুযোগ পায়নি সংশ্লিষ্ট নেটওয়ার্কগুলো।

ছবি: রাজধানীর ধানমন্ডি-৩২ নম্বরে মিছিল করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।
নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, ২৩ জুন আওয়ামী লীগের জন্য সাংগঠনিক অস্তিত্বের একটি প্রতীকী পরীক্ষা ছিল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিপুল প্রচারণা, বিদেশভিত্তিক কর্মীদের সক্রিয়তা এবং বিভিন্ন বার্তার পরও মাঠে দৃশ্যমান কোনো শক্তি প্রদর্শন না হওয়া দলটির বর্তমান বাস্তবতার একটি স্পষ্ট চিত্র তুলে ধরেছে।
নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র বলছে, এখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে অনলাইন প্রচারণা, গোপন অর্থায়ন এবং সংগঠনের অবশিষ্ট নেটওয়ার্ক শনাক্ত করার দিকে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে ব্যবহার করে সাংগঠনিক পুনর্গঠনের যে কোনো প্রচেষ্টা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

