সেচের জন্য সূর্যনির্ভর পরিকল্পনা সরকারের

গাজী শাহনেওয়াজ

সেচের জন্য সূর্যনির্ভর পরিকল্পনা সরকারের

দেশের কৃষি সেচ ব্যবস্থাকে নীরবচ্ছিন্ন করতে মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার। এর অংশ হিসেবে দেশজুড়ে সব ধরনের জ্বালানি ও বিদ্যুৎচালিত সেচ পাম্পকে সৌরশক্তিতে রূপান্তরিত করার নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। এর ফলে আগামীতে দেশের কৃষি খাতে সেচব্যবস্থা শতভাগ সূর্যনির্ভর হয়ে পড়ছে বলে কৃষি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

তবে সরকারের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানালেও মাঠপর্যায়ের কৃষকরা কিছু বাস্তব জটিলতার কথা তুলে ধরেছেন। কয়েকজন কৃষকের সঙ্গে আলাপে জানা গেছে, নির্বিঘ্ন সেচ কাজের জন্য ডিজেল ও বিদ্যুতের বিকল্প হিসেবে সৌরবিদ্যুৎ ভালো উদ্যোগ হলেও অতীতে স্থাপিত কিছু সৌরপাম্প থেকে কাঙ্ক্ষিত সেবা মেলেনি।

বিজ্ঞাপন

নেত্রকোনার দুর্গাপুর গ্রামের কৃষক আজমি আমার দেশকে বলেন, সরকারি ব্যয়ে তাকে একটি সৌর সেচপাম্প বসিয়ে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সারফেস ওয়াটার (উপরিভাগের পানি) দিয়ে চলায় এবং পর্যাপ্ত সূর্যালোক না থাকলে বা আকাশ মেঘলা থাকলে এই পাম্পগুলো চাহিদানুযায়ী পানি দিতে পারে না। সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত সূর্যের পর্যাপ্ত আলো থাকলেও, রাতে বা দিনে রোদ না থাকলে প্যানেলের ব্যাটারি পর্যাপ্ত ব্যাকআপ দিতে পারে না। ফলে ২৪ ঘণ্টার বড় একটি সময় সেচ বন্ধ রাখতে হয়।

অন্য আরো কয়েকজন কৃষক জানান, নীরবচ্ছিন্ন সেচ না পাওয়ায় দিনে যতটুকু জমির মাটি ভিজে, দীর্ঘসময় সেচ বন্ধ থাকায় পরের দিন আসার আগেই তা শুকিয়ে যায়। এ কারণে পরের দিন দ্বিগুণ সেচ দিতে হয়, যা শ্রম ও সময়ের অপচয় ঘটায়। গভীর নলকূপ ছাড়া সার্বক্ষণিক সেচ দেওয়া সম্ভব হয় না, কারণ পানির উপরিভাগের স্তরের ওপর এই সৌর পাম্পগুলো নির্ভরশীল।

এছাড়া বছরের প্রায় ছয় মাস সেচের প্রয়োজন থাকে না। ওই অফ-সিজনে মূল সার্ভারের সঙ্গে সংযোগ না থাকায় অব্যবস্থাপনায় অনেক দামি যন্ত্রাংশ নষ্ট হয়ে যায়। এসব জটিলতার কারণে আজমি নামের ওই কৃষক পরবর্তীতে আড়াই লাখ টাকা ব্যয়ে নিজস্ব উদ্যোগে গভীর নলকূপ বসাতে বাধ্য হয়েছেন।

কৃষকদের মতে, বিকল্প ব্যবস্থা রেখেই সরকারকে সৌরশক্তিতে যেতে হবে, অন্যথায় কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।

কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, সেচকে শতভাগ সৌরশক্তিতে রূপান্তরিত করার এই নীতিগত সিদ্ধান্তের পর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান সৌরপ্যানেল স্থাপনে আগ্রহ দেখাচ্ছে। বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিরা প্রতিনিয়ত কৃষিমন্ত্রী ও কৃষি সচিবের সঙ্গে সাক্ষাৎ করছেন। সম্প্রতি ‘সুপার স্টার’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা মন্ত্রণালয়ের নীতি-নির্ধারকদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ আমার দেশকে বলেন, এটি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ের আলোচনা, চূড়ান্ত কোনো নীতি-নির্ধারণী সিদ্ধান্ত হয়নি। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান সাক্ষাৎ করছে মানেই তারা কাজ পেয়ে যাচ্ছে বিষয়টি এমন নয়। যখন এই বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা বা পলিসি নেওয়া হবে, তা গণমাধ্যমকে অবহিত করা হবে।

তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কৃষি মন্ত্রণালয়ের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা আমার দেশকে জানান, ডিজেল ও জ্বালানির বিকল্প হিসেবে সেচ কাজে শতভাগ সৌরবিদ্যুতায়নের নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছে। এটি বাস্তবায়নের জন্য বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনকে (বিএডিসি) নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সংস্থাটিই এটি বাস্তবায়নের সার্বিক সিদ্ধান্ত নেবে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই) ও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশে আউশ, আমন ও বোরো—এই তিন মৌসুমে ধানের আবাদ হয় প্রায় এক কোটি হেক্টর জমিতে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আমন (৫৮ লাখ হেক্টর), এরপর বোরো (৫০ থেকে ৫১ লাখ হেক্টর) এবং সবচেয়ে কম আউশ (১০ লাখ হেক্টর) চাষ হয়। তবে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বন্যা বা খরার কারণে প্রতি বছর আবাদের পরিমাণের কিছুটা তারতম্য ঘটে। ভালো ফলনের জন্য নীরবচ্ছিন্ন সেচ অত্যন্ত জরুরি। সেচ পাম্পগুলো সোলার সিস্টেমে কনভার্ট করা হলে দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট অনেকটাই লাঘব হবে।

এ বিষয়ে পরিবেশ গবেষক ও সোলার বিশেষজ্ঞ মো. আরিফুল ইসলাম আমার দেশকে বলেন, অগভীর নলকূপগুলোকে সৌরশক্তিতে রূপান্তরিত করা হলে কৃষকের দীর্ঘমেয়াদি খরচ কমবে। একইসঙ্গে ডিজেল ও বিদ্যুতের ব্যবহার কমায় কার্বন নিঃসরণ হ্রাস পাবে, যা আন্তর্জাতিক বাজারে ‘কার্বন ক্রেডিট’ হিসেবে বিক্রি করা সম্ভব হবে।

বিএডিসি ও টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (স্রেডা)-এর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে মোট সেচযন্ত্র রয়েছে ১৭ লাখ ২৬ হাজার ৭১টি। এর মধ্যে ডিজেলচালিত পাম্প ১২ লাখ ২০ হাজার ৭৮১টি (গভীর নলকূপ ৭৩৭টি, অগভীর নলকূপ ১০ লাখ ৩৫ হাজার ৬৬৯টি এবং লো লিফট পাম্প বা এলএলপি এক লাখ ৮৪ হাজার ৩৭৫টি)। এই পাম্পগুলোর জন্য বছরে ৭ দশমিক ৬০ লাখ মেট্রিক টন ডিজেল আমদানি করতে হয়, যার মূল্য প্রায় ১১ হাজার ৩৮৫ কোটি টাকা।

অন্যদিকে, বিদ্যুৎচালিত সেচ পাম্প রয়েছে ৫ লাখ ১১ হাজার ১৪টি (গভীর নলকূপ ৩৪ হাজার ২৭০, অগভীর নলকূপ ৪ লাখ ৪৩ হাজার ৫৭৫টি এবং এলএলপি ২৩ হাজার ২৬৯টি। যেগুলোতে বিদ্যুতের চাহিদা ৩ হাজার ২৫১ দশমিক ৫৫ মেগাওয়াট।

বিএডিসির তথ্যমতে, ২০১১-১২ অর্থবছরে দেশে প্রথম ১১টি সোলার পাম্প স্থাপনের মাধ্যমে এই যাত্রা শুরু হয়। পরবর্তীতে ক্ষুদ্র সেচ উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় ৩৪ জেলার ১৪১টি উপজেলায় আরো ২৫০টি সোলার পাম্পের মাধ্যমে ২২শ হেক্টর জমি সৌরসেচের আওতায় আনা হয়। বর্তমানে বিএডিসি বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে এক হাজার ২৮৪টি সোলার পাম্প স্থাপন করে ৮ হাজার ৩৩০ হেক্টর জমিতে সেচ দিচ্ছে। বিএডিসির বাইরে বর্তমানে দেশে আরো ৫ হাজার ১০৮টি সোলার সেচ পাম্প রয়েছে। এর মধ্যে গভীর নলকূপ ২ হাজার ৩৫৩টি, এলএলপি ১ হাজার ৬৯৭ ও ডাগওয়েল ৯৬৪টি। বর্তমানে এসব সোলার পাম্প থেকে মোট ৭২ দশমিক ২৯৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে।

বিএডিসির সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, কৃষি মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে এবং বিএডিসির সহযোগিতায় ‘সৌরশক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে সেচ উন্নয়ন প্রকল্প’ (জুলাই-২০২৫ থেকে জুন-২০৩০) নামে পাঁচ বছর মেয়াদি একটি প্রকল্প প্রস্তাব করা হয়েছে। সরকারি অর্থায়নে ৬ হাজার ৯৯৬ দশমিক ০২ কোটি টাকা ব্যয়ে দেশজুড়ে ৫০ হাজার ৯০০টি সৌরচালিত সেচযন্ত্র স্থাপন করা হবে। এর মধ্যে রয়েছে ১০০টি গভীর নলকূপ, ৮০০টি এলএলপি এবং ৫০ হাজার অগভীর নলকূপ।

এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে বছরে গভীর নলকূপে চার লাখ লিটার ডিজেল; যার মূল্য ৪ দশমিক ৬ কোটি টাকা, এলএলপিতে ১৬ লাখ লিটার ডিজেল; মূল্য ১৮ কোটি টাকা এবং অগভীর নলকূপে বিপুল পরিমাণ ডিজেল সাশ্রয় হবে, যার আর্থিক মূল্য ৫৬০ কোটি টাকা।

এছাড়া নতুন প্রকল্পের আওতাধীন পাম্পগুলোর মধ্যে ২ হাজার ৫০০টি পাম্পে ‘নেট মিটারিং’ পদ্ধতি ব্যবহার করা হবে, যা থেকে বছরে প্রায় ১৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে এবং এর আর্থিক মূল্য প্রায় ২০০ কোটি টাকা।

কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম এই উদ্যোগকে স্বাগত জানান। তবে, কাঠামোগত দুর্বলতার কথা উল্লেখ করে আমার দেশকে তিনি বলেন, অতীতে আমাদের কারিগরি দক্ষতা ও প্রশিক্ষণের অভাব ছিল। বড় পরিসরের এই প্রকল্প আমাদের জ্বালানি আমদানি নির্ভরতা অনেক কমাবে। তবে মাঠপর্যায়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ। অনেক সময় যন্ত্রাংশ নষ্ট হলে তা মেরামত করতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়, যা কৃষকের বড় ক্ষতি করে।

তিনি আরো বলেন, অফ-সিজনে (যখন সেচের প্রয়োজন থাকে না) এই সোলার প্যানেল থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ যেন দ্রুত নেট মিটারিংয়ের মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করা যায়, সেই নীতিমালা দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। তবেই এই বিশাল বিনিয়োগ শতভাগ সফল হবে এবং কৃষকের সেচ খরচ স্থায়ীভাবে কমে আসবে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...