বাংলা ভাগের আড়ালে নৌ-অফিসার

কমডোর জসীম উদ্দীন ভূইয়াঁ (অব.)

বাংলা ভাগের আড়ালে নৌ-অফিসার

আজ ২০ জুন। ১৯৪৭ সালের এই ঐতিহাসিক দিনটিতেই বঙ্গীয় আইনসভায় এক ভোটাভুটির মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলার বুকে কাঁচি চালিয়ে দেওয়া হয়েছিল। চিরকালের জন্য এক রক্তাক্ত মানচিত্রে রূপ নিয়েছিল আমাদের এই সোনার বাংলা। কিন্তু একটা সুস্থ-স্বাভাবিক ও বহু সংস্কৃতির সমাজ কীভাবে মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে নিজেদের ভিটেমাটি মাঝখান থেকে চিড়ে ফেলতে রাজি হয়ে গেল? কোন অভিশপ্ত ইতিহাস জড়িয়ে আছে আজকের এই দিনটির পেছনে?

ঝড়ের সময় হালধরা ক্যাপ্টেনের আসল পরিচয় ফুটে ওঠে। সমুদ্র উত্তাল হলে, ঢেউ যখন আকাশছোঁয়া, তখনই বোঝা যায় কে জাহাজ চালাতে পারে, আর কে জাহাজকে তীরে নয়, অচেনা শূন্যতার দিকে ঠেলে দেয়। ১৯৪৭ সালের ভারত বিভাজনের প্রেক্ষাপটে, সেই হালধরা ক্যাপ্টেন ছিলেন লর্ড মাউন্টব্যাটেন। ইতিহাসের পাতায় তিনি চিহ্নিত ভারতের শেষ ভাইসরয় হিসেবে, কিন্তু তার চালচলন ও সিদ্ধান্তগুলো ছিল একজন খাঁটি নৌ-অফিসারের মতো, যেখানে গন্তব্যে পৌঁছানোটাই আসল, পথিমধ্যে কতটা রক্তক্ষরণ হলো তা গৌণ। রাজনীতির এই উত্তাল সমুদ্রে তিনি যখন জাহাজের ক্যাপ্টেন হয়ে হাল ধরেছিলেন, তখন তার নৌ-অভিজ্ঞতার কৌশলগুলো এক নির্মম কূটনীতিতে রূপান্তর করেছিলেন।

বিজ্ঞাপন

নিচে এই নৌ-অফিসারের স্টিয়ারিং, দুই বাংলার নির্মম নিয়তি এবং সমসাময়িক ভূরাজনীতির সেই গভীর আন্ডারকারেন্ট তুলে ধরা হলোÑ

ঝড়ের প্রথম ঝলক : রয়্যাল নেভির বিদ্রোহ এবং ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের কম্পন

১৯৪৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ভারতীয় নাবিকরা এক অভূতপূর্ব বিদ্রোহে ফেটে পড়লেন। বোম্বে বন্দরে শুরু হওয়া এই বিদ্রোহ মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়ল করাচি থেকে কলকাতা পর্যন্ত। হাজারো নাবিক ব্রিটিশ পতাকা নামিয়ে দিয়ে গেয়ে উঠলেন স্বাধীনতার গান। ইতিহাসবিদরা একে ছোট্ট অধ্যায় বলে পাশ কাটালেও, আসলে এই বিদ্রোহই ব্রিটিশদের কাঁপিয়ে দিয়েছিল ভেতর থেকে। কারণ, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের শক্তির মূল ভিত্তিই ছিল সেনা ও নৌবাহিনী আর সেই বাহিনীর ভেতরেই যদি আনুগত্য ভেঙে পড়ে, তবে শাসন আর কত দিন টিকবে? নৌ-বিদ্রোহ ছিল এক ঝড়ের আগমনী বার্তা, যা ব্রিটিশদের বুঝিয়ে দিয়েছিল যে ভারত ছাড়ার সময় চলে এসেছে।

বারুদের স্তূপে দেশলাই : ক্ষুধার লড়াই যখন ক্ষমতার ধর্মীয় যুদ্ধ

নৌ-বিদ্রোহের রেশ মিলিয়ে যেতেই ব্রিটিশরা এক মাসের মধ্যে ক্যাবিনেট মিশন পাঠালেন। যে সাম্রাজ্য একসময় বলত, ‘সূর্য অস্ত যায় না,’ তারা হঠাৎ করেই ভারত ছাড়ার তাড়াহুড়ো শুরু করল। ঠিক এই পটভূমিতেই বাংলায় শুরু হয়েছিল এক নোংরা রাজনৈতিক খেলা।

১৯৪১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী অবিভক্ত বাংলায় মুসলিম জনসংখ্যা ছিল প্রায় ৫৪ শতাংশ এবং হিন্দু জনসংখ্যা ছিল ৪৪ থেকে ৪৬ শতাংশ। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের কারণে বাংলার সমাজ আক্ষরিক অর্থেই দুটো শ্রেণিতে বিভক্ত ছিল, একদিকে কলকাতার শিক্ষিত জমিদার ও উচ্চবিত্ত সমাজ, অন্যদিকে গ্রামীণ ভূমিহীন মুসলিম এবং নিম্নবর্ণের হিন্দু কৃষক। এই শ্রেণিগত বৈষম্যের বারুদে প্রথম আগুন জ্বলে ওঠে ১৯৪৩ সালের ভয়াবহ কৃত্রিম দুর্ভিক্ষে, যেখানে প্রাণ হারায় ৩০ থেকে ৫০ লাখ মানুষ। ব্রিটিশ প্রশাসন এবং একদল সুবিধাবাদী রাজনীতিক মানুষের পেটের খিদেকে সুকৌশলে বদলে দিয়েছিলেন এক ভয়ংকর ধর্মীয় পরিচয়ের লড়াইয়ে।

এরই চূড়ান্ত রূপ ছিল ১৯৪৬ সালের সেই অভিশপ্ত নির্বাচন। ব্রিটিশদের তৈরি পৃথক নির্বাচনি ব্যবস্থা অনুযায়ী হিন্দুরা শুধু হিন্দু প্রার্থীকে এবং মুসলিমরা শুধু মুসলিম প্রার্থীকে ভোট দিতে পারত। সবচেয়ে বড় প্রহসন ছিল, এই ভোটে বাংলার ৯০ শতাংশ গরিব মানুষের কোনো ভোটাধিকারই ছিল না। মাত্র ১০ শতাংশ মুষ্টিমেয় এলিটদের দেওয়া ভোটে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে মুসলিম লীগ ১১৭টি আসনের মধ্যে ১১৩টিতে একচেটিয়া জয় লাভ করে। এই ফল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর হাতে এমন এক শেষ অস্ত্র বা অমোঘ চাল তুলে দেয়, যা পাকিস্তান শব্দটিকে একটি রাজনৈতিক স্লোগান থেকে ভৌগোলিক বাস্তবতায় পরিণত করতে বাধ্য করে।

অখণ্ড বাংলার শেষ চেষ্টা : দিল্লির রোষানলে ডুবন্ত ‘ইউনাইটেড বেঙ্গল’

১৯৪৭ সালের মার্চে মাউন্টব্যাটেন যখন ভাইসরয় হয়ে ভারতে এলেন, তখন পরিস্থিতি উত্তাল সমুদ্রের মতো। চারদিকে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যে অবিশ্বাস আর ব্রিটিশদের মাথায় একটাই চিন্তা, কীভাবে দ্রুত বেরিয়ে যাওয়া যায়। মাউন্টব্যাটেন এসেই বুঝলেন, তাকে করতে হবে দ্রুত ভাগাভাগি আর চূড়ান্ত প্রস্থান।

তিনি ছিলেন আকর্ষণীয় ও বন্ধুবৎসল, এমনকি সাধারণ ভারতীয় নেতাদের কাছেও খুব সহজলভ্য। জওহরলাল নেহরুর সঙ্গে তার সম্পর্ক হয়ে উঠল গভীর আর তার স্ত্রী এডউইনা মাউন্টব্যাটেন হয়ে উঠলেন নেহরুর ঘনিষ্ঠ সহচর। এই ব্যক্তিগত সম্পর্ককে ইতিহাস কেউ রোমান্স হিসেবে, কেউ বা কূটনীতি হিসেবে দেখেছে। কিন্তু নিশ্চিত একটাই, এই ঘনিষ্ঠতার ভেতরেই বাংলার ভাগ্য নির্ধারিত হচ্ছিল।

অথচ ঠিক সেই খাদের কিনারায় দাঁড়িয়ে বাংলার নেতারা এক অবিশ্বাস্য ব্লুপ্রিন্ট তৈরি করেছিলেন। মুসলিম লীগের সোহরাওয়ার্দী ও আবুল হাশিম হাত মিলিয়েছিলেন কংগ্রেসের শরৎচন্দ্র বসু এবং কিরণশঙ্কর রায়ের সঙ্গে। তৈরি হয়েছিল ঐতিহাসিক বোস-হাশিম প্যাক্ট, যেখানে একটি স্বাধীন, ধর্মনিরপেক্ষ এবং অখণ্ড বাংলার প্রস্তাব করা হয়। এমনকি জিন্নাহও কলকাতাসহ এই স্বাধীন বাংলাকে মেনে নিতে প্রস্তুত ছিলেন।

কিন্তু দিল্লির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব, বিশেষ করে জওহরলাল নেহরু ও সর্দার প্যাটেল এই পরিকল্পনার তীব্র বিরোধিতা করেন। নেহরু জানতেন, বঙ্গভাগ ছাড়া বাংলায় কংগ্রেসের আধিপত্য টিকবে না।

অন্যদিকে ডক্টর শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ও তার তত্ত্বে অনড় ছিলেন যে, হিন্দুদের সংস্কৃতি ও সম্পত্তি বাঁচাতে হলে বাংলাকে ভাগ করতেই হবে। এর পেছনে ছিল এক বিপুল অর্থনৈতিক স্বার্থও। জিডি বিড়লার মতো মাড়োয়ারি পুঁজিপতিরা, যাদের হাতে কলকাতার বড় বড় কলকারখানার নিয়ন্ত্রণ ছিল, তারা নিজেদের সম্পত্তি হারানোর ভয়ে কোনোভাবেই কলকাতাকে হাতছাড়া করতে চাননি।

রক্তের বালুচরে নোঙর : মাউন্টব্যাটেনের স্টিয়ারিং এবং এক খণ্ডিত মানচিত্র

মাউন্টব্যাটেন ছিলেন সেই হালধরা ক্যাপ্টেন, যিনি চাইলে বিকল্প পথ খুঁজতে পারতেন, পাশে দাঁড়াতে পারতেন স্বাধীন অখণ্ড বাংলার। কিন্তু তিনি নেহরুর সঙ্গে কৌশলগতভাবে মেলালেন হাত। তার নৌ-অভিজ্ঞতায় জাহাজ ভেসে থাকার কৌশল জানা ছিল ঠিকই, কিন্তু রাজনীতির উত্তাল সমুদ্রে তিনি স্টিয়ারিং ঘোরালেন ভাগাভাগির দিকে।

তার এক বছর আগে, ১৯৪৬ সালের ১৬ আগস্ট মুসলিম লীগের ডাকা প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবস কলকাতাকে এক জীবন্ত টাইম বোমায় পরিণত করেছিল। মাত্র কয়েক দিনের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় কলকাতার রাজপথে খুন হয় ৫ থেকে ১০ হাজার সাধারণ মানুষ। এই নারকীয় হত্যাকাণ্ডের ট্রমা সাধারণ মানুষের মন থেকে একত্রে বেঁচে থাকার শেষ আশাটুকুও কেড়ে নেয়।

অবশেষে আসে সেই নিয়তির দিন, ১৯৪৭ সালের ২০ জুন। বঙ্গীয় আইনসভায় ভোটাভুটির মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলার বুকে কাঁচি চালিয়ে চিরকালের জন্য বসিয়ে দেওয়া হলো কাঁটাতারের দাগ। বাংলাকে ভাগ করেই মাউন্টব্যাটেন তার ভারতবর্ষ নামক জাহাজকে তীরে ভেড়ালেন, যদিও সেই তীরটি ছিল আসলে লাখো মানুষের রক্তের বালুচর।

নেহরুর কৌশল ও মাউন্টব্যাটেনের পুরস্কার

নেহরুর সিদ্ধান্ত ছিল স্পষ্ট, মাউন্টব্যাটেনকে শুধু ভাইসরয় হিসেবে বিদায় দেওয়া হবে না, তাকে করা হলো স্বাধীন ভারতের প্রথম গভর্নর-জেনারেল। কেন? কারণ নেহরু তাকে দেখতেন এক শক্তিশালী সেতু হিসেবে, ভারত ও ব্রিটেনের মধ্যে, রাজনীতির অস্থিরতা আর আন্তর্জাতিক কূটনীতির মধ্যে। মাউন্টব্যাটেনের কাছে এই পদটি ছিল ব্যক্তিগত গৌরবের। এটি প্রমাণ করল তিনি শুধু সমুদ্রে নয়, জাতির হাল ধরতেও সক্ষম। ১৯৪৮ সালে তিনি যখন অবশেষে ভারতে বিদায় নিলেন, তখন তার ঝুলিতে ছিল বিশ্বমঞ্চে ঝলমল করা পরিচিতি। সেই কৃতিত্বই তাকে ব্রিটেনে ফিরিয়ে দিল তার জীবনের বহুকাঙ্ক্ষিত শ্রেষ্ঠ আসনে, রয়্যাল নেভির নেভি চিফ (ফার্স্ট সি লর্ড)।

‘১৬০ কোটি’র উইন্ডোজ হিসাব : দিল্লির নতুন ক্যাপ্টেনের ‘নৌ-কূটনীতি’

ইতিহাসের সেই ২০ জুনের কাঁটাতারের ছায়া আজ প্রায় আট দশক পার করলেও, দুই বাংলার মনস্তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক সংকট যেন আজও কাটেনি। সম্প্রতি ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের নতুন রাষ্ট্রদূত দীনেশ ত্রিবেদী দায়িত্ব নিয়ে এসে দুদেশের অভিন্ন আকাশ, বাতাস এবং ভাগ্যের কথা উল্লেখ করে বলেছেন, ‘ভারতের জনসংখ্যা ১৪০ কোটি আর বাংলাদেশের ২০ কোটি যোগ করলে তা হয় ১৬০ কোটি। আমি আলাদাভাবে নয়, যৌথভাবে কাজ করতে চাই। আমাদের চ্যালেঞ্জগুলোও এক।’ কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, পেশাদার কূটনীতিকদের প্রথাগত রুটিন চাল ভেঙে একজন ঝানু ও পোড়খাওয়া রাজনৈতিক ক্যাপ্টেন হিসেবে দীনেশ ত্রিবেদীকে ঢাকায় পাঠানো দিল্লির এক বড় স্ট্র্যাটেজিক চাল। ঢাকায় পা রাখার ঠিক আগে ভারতের সেনাপ্রধানের সঙ্গে তার উচ্চপর্যায়ের কৌশলগত নিরাপত্তা বৈঠকটি প্রমাণ করে যে, উপমহাদেশের জলসীমায় এক গভীর নৌ-কূটনীতি বা নেভাল ডিপ্লোমেসি শুরু করেছে দিল্লি। কিন্তু একজন দক্ষ নৌ-অফিসার যেভাবে সমুদ্রের উপরিভাগের শান্ত ঢেউ দেখে নিচের বিপজ্জনক চোরাস্রোত বা আন্ডারকারেন্ট মেপে নেন, বাংলাদেশের সাধারণ মানুষও আজ দিল্লির এই কূটনীতির বাতাসের গতিপ্রকৃতি হিসাবটি ধরে ফেলেছে।

ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর স্বৈরাচারী শেখ হাসিনা, আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতা এবং দেশের সঙ্গে বিশ্বাসভঙ্গ করা কিছু জেনারেলদের ভারতে নিরাপদ আশ্রয় দেওয়া এবং সেখান থেকে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডা চালানোর সুযোগ করে দেওয়া, বাংলাদেশের মানুষের মনে ভারতের প্রতি এক গভীর অবিশ্বাসের জন্ম দিয়েছে।

ফলে আজ যখন দিল্লির রাজনৈতিক প্রতিনিধিরা ১৬০ কোটির সম্মিলিত আকাঙ্ক্ষা কিংবা অভিন্ন ভাগ্যের কথা বলেন, তখন বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ তার মধ্যে বন্ধুত্বের চেয়েও বেশি দিল্লির সেই পুরোনো আধিপত্যবাদী নেভিগেশন ও খবরদারির গন্ধ খুঁজে পায়। ১৯৪৬ সালের মতোই, আজও সাধারণ মানুষের ইচ্ছা-অনিচ্ছাকে পাশ কাটিয়ে ক্ষমতার অলিন্দে যে কূটনীতি চলছে, তা দুদেশের সম্পর্কের মধ্যে এক বিশাল অবিশ্বাসের দেয়াল খাড়া করে রেখেছে।

ইতিহাসের নতুন পাঠ ও দীনেশ ত্রিবেদীর ‘অভিন্ন নিয়তি’র ধাঁধা

১৯৪৭ সালের সেই রক্তক্ষয়ী বিভাজনের ইতিহাস আর বর্তমান ভূরাজনীতি আমাদের সামনে এক ভিন্নধর্মী ও নতুন শিক্ষা হাজির করে। যখন ভারতের নতুন দূত দুদেশের জনসংখ্যাকে এক সুতোয় গেঁথে ১৬০ কোটির যৌথ আকাঙ্ক্ষা ও অভিন্ন ভাগ্যের বুলি আওড়ান, তখন ইতিহাস সচেতন যেকোনো মানুষের মনে, বিশেষ করে স্ট্র্যাটেজিক ও ডিফেন্স ব্যাকগ্রাউন্ডের চিন্তাবিদদের মনে এক গভীর সংশয় ও সন্দেহের উদ্রেক হওয়া স্বাভাবিক। ৮৯ বছর আগের ১৯৪৬ সালেও ঠিক এভাবেই সাধারণ মানুষের ডাল-ভাতের অধিকার আর যৌথ স্বপ্নের স্লোগানকে হাইজ্যাক করে ক্ষমতার ভাগাভাগির দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল। ইতিহাস আমাদের এই শিক্ষা দেয় যে, শাসকরা বা বড় রাষ্ট্রশক্তি যখনই অভিন্ন সীমান্ত, অভিন্ন আকাশ কিংবা অভিন্ন নিয়তির মধুর বাণী শোনায়, তখন তার অন্তরালে অধিকাংশ সময়ই লুকিয়ে থাকে একটি বড় অংশের মানুষের ইচ্ছা ও অধিকারকে কুক্ষিগত করার গভীর চক্রান্ত।

আজকের বাংলাদেশের মানুষ ভারতের এই যৌথ এগিয়ে যাওয়ার রূপকথার ওপর আস্থা রাখতে পারছে না, কারণ দিল্লির স্টিয়ারিং এখনো বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত ও বিতর্কিত স্বৈরাচারী শক্তির এবং পলায়নপর জেনারেলদের সেফ-হ্যাভেন হিসেবে কাজ করছে। ১৯৪৬ সালের রয়্যাল নেভির যে দেশপ্রেমিক নাবিকরা ব্রিটিশদের সিংহাসন কাঁপিয়ে দিয়েছিল, তারা উপেক্ষিতই রয়ে গিয়েছিল ইতিহাসের পাতায় আর ক্ষমতার হাল ধরেছিল অ্যাডমিরাল মাউন্টব্যাটেনের মতো চতুর এলিটরা।

আজকের দিনে দাঁড়িয়ে দীনেশ ত্রিবেদীর এই বক্তব্যের সংশয় আমাদের এই নতুন পাঠই দেয় যে, মুষ্টিমেয় এলিটের স্বার্থে তৈরি করা কোনো যৌথ গন্তব্য কখনো সাধারণ মানুষের মুক্তি আনতে পারে না। যদি প্রকৃতই ১৬০ কোটি মানুষের কল্যাণ চাওয়া হতো, তবে ঢাকার রাজপথের গণআকাঙ্ক্ষাকে পাশ কাটিয়ে দিল্লির নিরাপদ আশ্রয়ে বসে থাকা ষড়যন্ত্রকারীদের পৃষ্ঠপোষকতা করা হতো না। অতএব, আজ ২০ জুনের এই খণ্ডিত মানচিত্রের দিনে দাঁড়িয়ে নতুন শিক্ষা এটাই যে, আকাশ কিংবা বাতাস এক হতে পারে, কিন্তু একটি আত্মমর্যাদাশীল জাতির ভাগ্য এবং স্বাধীনতার স্টিয়ারিং কখনোই অন্য কোনো রাষ্ট্রের ভূরাজনৈতিক হিসাবনিকাশের ওপর ছেড়ে দেওয়া যায় না।

লেখক : সাবেক সহকারী নৌবাহিনী প্রধান ও উপ-উপাচার্য, বিইউপি

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...