ওয়াশিংটন ও তেহরান যখন যুদ্ধবিরতির দিকে এগোচ্ছে, তখন ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে অভিযুক্ত বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু তা বানচাল করতে বদ্ধপরিকর। তিনি বিশ্বাস করেন, ইরানকে অক্ষত রেখে যেকোনো মীমাংসা মানেই পরাজয়। নেতানিয়াহু সবসময়ই পাশবিক শক্তির ব্যবহার, স্থায়ী উত্তেজনা বৃদ্ধি এবং কৃত্রিম সংকট তৈরির মাধ্যমে শান্তির যেকোনো উদ্যোগকে নস্যাৎ করায় সিদ্ধহস্ত। পুরো কর্মজীবনেই তিনি নিজের রাজনৈতিক অস্তিত্ব রক্ষা ও ইসরাইলি আধিপত্য প্রতিষ্ঠার জন্য যুদ্ধকে কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছেন। যুদ্ধ বন্ধ হলেই ঘুসগ্রহণসহ দুর্নীতির অভিযোগে বিচারাধীন কয়েকটি মামলায় তার দীর্ঘ মেয়াদে জেল হতে পারে, যা তার রাজনৈতিক জীবনের সমাপ্তি ঘটাবে। সেজন্যই তিনি ট্রাম্পের যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষর বানচালে মরিয়া।
বর্তমানে নেতানিয়াহুর প্রধান লক্ষ্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধে প্রায় চূড়ান্ত হওয়া একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করা থেকে বিরত রাখা। এজন্য তিনি রাজনৈতিক, সামরিক, কূটনৈতিক, গণমাধ্যম এবং লবিং কৌশলসহ তার হাতে থাকা সব অস্ত্রই ব্যবহার করছেন। কারণ তিনি সবসময়ই আপস-মীমাংসার পথকে প্রত্যাখ্যান করেন। তার কাছে মীমাংসা গ্রহণযোগ্য নয়, যদি না তা গাজায় হামাস ও ইসলামিক জিহাদকে নিরস্ত্র করে, লেবাননে হিজবুল্লাহকে ভেঙে দেয় এবং ইরান রাষ্ট্রকে নিষ্ক্রিয় বা ধ্বংস করে।
গাজা, পশ্চিম তীর, লেবানন, সিরিয়া, ইরাক, ইয়েমেন এবং ইরানের যুদ্ধ কখনোই বিচ্ছিন্ন সংঘাত ছিল না। এগুলো ছিল ‘বৃহত্তর ইসরাইল’ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা এবং দেশটির আঞ্চলিক আধিপত্যকে সুসংহত করার অভিযানের অংশ। কিন্তু নেতানিয়াহু জানেন, ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালানো সত্ত্বেও তার এই লক্ষ্যগুলো পূরণ হয়নি। এই ব্যর্থতা তিনি মানতে পারছেন না। তার কাছে যুদ্ধ শেষ হতে এখনো অনেক বাকি। আগামীতে আরো ব্যাপক শক্তি প্রয়োগ করে এই লক্ষ্যগুলো পূরণ করাই তার টার্গেট।
নেতানিয়াহু ইরানের সঙ্গে গত বছর জুন মাসের সংঘাতে ট্রাম্পকে জড়িয়ে ফেলার পর এবার ফেব্রুয়ারি মাসেও একইভাবে সফল হয়েছেন। তিনি নিশ্চিত যে, আবার সেই ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারবেন। এবার তার লক্ষ্য সীমিত হামলার সীমা ছাড়িয়ে এমন এক চূড়ান্ত ও সর্বাত্মক যুদ্ধ, যা আঞ্চলিক ক্ষমতার ভারসাম্যকে স্থায়ীভাবে বদলে দেবে। তাই ইরানের সঙ্গে স্থায়ী বা দীর্ঘ মেয়াদে কোনো যুদ্ধবিরতি চুক্তির ঘোর বিরোধী তিনি।
যুক্তরাষ্ট্রে বিভক্তি বাড়ছে
অন্যদিকে, ট্রাম্প ইরান যুদ্ধ নিয়ে নিজ দেশেই জটিল বাস্তবতার মুখোমুখি। তিনি বিশ্বাস করেন, আগের হামলাগুলো ইরান এবং তার সমর্থিত আঞ্চলিক প্রতিরোধ অক্ষকে দুর্বল করেছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের একটি বড় অংশ প্রকাশ্যে ইরান যুদ্ধের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
যুক্তরাষ্ট্রে সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘ বা ‘চিরস্থায়ী’ যুদ্ধের প্রতি দেশটির জনগণের সমর্থন কমছে, যা আমেরিকান স্বার্থের পরিবর্তে বিদেশি উদ্দেশ্য সাধনের জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে বলে মনে করা হয়। এমনকি এই যুদ্ধ ট্রাম্পের নিজের দলে ও ন্যাটো জোটেও বিভক্তি তৈরি করছে। ট্রাম্পের ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ বা ‘ম্যাগা’ আন্দোলনের প্রভাবশালী ব্যক্তিরাও ইরান যুদ্ধের সমালোচনা করেছেন। তারা মনে করেন, এই যুদ্ধে ট্রাম্পের জড়িয়ে পড়া আমেরিকান রক্ত ও সম্পদকে নেতানিয়াহুর এজেন্ডার অধীন করেছে।
অনেক আমেরিকান প্রশ্ন তুলছেন, কেন যুক্তরাষ্ট্র একটি বিদেশি শক্তির জন্য আরেকটি আঞ্চলিক যুদ্ধের অর্থনৈতিক, সামরিক ও রাজনৈতিক মূল্য বহন করবে, যার লক্ষ্য অস্পষ্ট। ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক চাপের মধ্যে এই প্রশ্ন আরো তীব্র হচ্ছে। কারণ জ্বালানির বাজার এখনো ঝুঁকিপূর্ণ এবং মুদ্রাস্ফীতির চাপ আবার বাড়ছে, যা ট্রাম্পের সংকট বাড়াচ্ছে।
ট্রাম্প জানেন, ইসরাইলের পক্ষ নিয়ে ইরান যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার জন্য কংগ্রেসের মধ্যবর্তী নির্বাচনে তাকে পরিণতি ভোগ করতে হবে। হাউস এবং সিনেট উভয়ই ডেমোক্রেটিক পার্টির সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের নাগালের মধ্যে আছে। যদি তার দল কংগ্রেসে হেরে যায়, তাহলে তার প্রেসিডেন্সির বাকি সময়টা অচল হয়ে পড়বে এবং অভিশংসনের হুমকি আবার ফিরে আসবে।
২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ইরানে হামলা শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল। এরপর ইরান ও তার আঞ্চলিক মিত্রদের পাল্টা হামলায় মধ্যপ্রাচ্যের আটটি দেশে অন্তত ১৬টি মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যার মধ্যে কয়েকটি প্রায় অকেজো হয়ে গেছে। স্যাটেলাইট চিত্রের ওপর ওয়াশিংটন পোস্টের এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ইরানি হামলায় মার্কিন ঘাঁটিগুলোয় থাকা হ্যাঙ্গার, জ্বালানি ডিপো, বিমান, রাডার নেটওয়ার্ক, যোগাযোগ সরঞ্জাম এবং বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মতো অন্তত ২২৮টি স্থাপনা ও সরঞ্জাম ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে।
কয়েক দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্র তার উপসাগরীয় ঘাঁটিগুলোর নেটওয়ার্ককে প্রতিরোধ ও ভীতি প্রদর্শনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে। প্রতিপক্ষকে শাস্তি দেওয়া এবং মিত্রদের রক্ষা করার মঞ্চ হিসেবে এগুলো কাজে লাগিয়েছে। কিন্তু ইরান যুদ্ধ দেখিয়েছে, এই ঘাঁটিগুলো এখন অরক্ষিত লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে, যা আমেরিকার আঞ্চলিক আধিপত্যের কাঠামোকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। ইরানের সঙ্গে ৩৯ দিনের যুদ্ধের পর প্রকাশিত প্রতিবেদনে প্যাট্রিয়ট, থাড, টমাহক এবং অন্যান্য ক্ষেপণাস্ত্রসহ ইন্টারসেপ্টর যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত মারাত্মকভাবে কমে যাওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
পেন্টাগন সতর্ক করে বলেছে, সমরাস্ত্রের এই মজুত পুনর্গঠন করতে কয়েক বছর লাগতে পারে এবং এর মধ্যে কিছু মজুত এই দশকের শেষ পর্যন্ত পূরণ হওয়ার সম্ভাবনা নেই। যে দেশকে রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে সংঘাতের জন্যও পরিকল্পনা করতে হয়, তার জন্য এটি একটি বিপজ্জনক দুর্বলতা। আধিপত্য বিস্তারের উদ্দেশ্যে করা একটি যুদ্ধ উল্টো যুক্তরাষ্ট্রের শিল্প ও প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতাগুলো সবার সামনে উন্মোচিত করেছে।
কৌশলগত অচলাবস্থা
ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর লক্ষ্য ছিল ইরানকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করা, তার পারমাণবিক অবকাঠামো ভেঙে দেওয়া, ইউরেনিয়াম-সমৃদ্ধকরণ বন্ধ করা, সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম জব্দ করা, ইরান-সমর্থিত প্রতিরোধ অক্ষকে ধ্বংস করা এবং ইরানে সরকার উৎখাত অথবা দেশটিকে খণ্ডিত করা। কিন্তু এই লক্ষ্যগুলোর কোনোটিই পূরণ হয়নি। ইরান আত্মসমর্পণ করেনি, সরকারেরও পতন ঘটেনি এবং তার আঞ্চলিক প্রক্সিগুলো প্রচণ্ড চাপের মুখে থাকলেও নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়নি। এটি ১৯৫৬ সালের সুয়েজ সংকটের কথা মনে করিয়ে দেয়, যখন ব্রিটেন ও ফ্রান্স উপলব্ধি করেছিল, সামরিক বিজয় তাদের সাম্রাজ্যবাদী শক্তির পতন ঠেকাতে পারেনি। একই সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি এখন যুক্তরাষ্ট্রও।
ওয়াশিংটন ও তেল আবিব তাদের চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধে এমন একটি একতরফা ফল চেয়েছিল, যেখানে ইরান তার পারমাণবিক সম্পদ, ক্ষেপণাস্ত্র এবং আঞ্চলিক প্রভাব বিসর্জন দেবে। এর বিনিময়ে দেশটা সাময়িক ও সহজে প্রত্যাহারযোগ্য নিষেধাজ্ঞা থেকে মুক্তি পাবে। তেহরান জানত, সাময়িক স্বস্তি কোনো নিরাপত্তা নয়। তাই তারা তাদের প্রতিরোধব্যবস্থা ছাড়তে রাজি হয়নি। যার ফলে একটি অচলাবস্থা তৈরি হয়। ইরানের দরকার ছিল পরাজয় এড়ানো, তার সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা এবং শত্রুকে তার রাজনৈতিক উদ্দেশ্য থেকে বঞ্চিত করা। অপ্রতিরোধ্য শক্তির মুখোমুখি একটি রাষ্ট্রের জন্য নিজের স্বকীয়তা অক্ষুণ্ণ রেখে টিকে থাকাই ইরানের জন্য একটি বড় বিজয়।
পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় এবং কয়েকটি আরব ও ইসলামি রাষ্ট্রের সমর্থনে যুদ্ধবিরতির যে আলোচনা চলছে, তা প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। এর শর্তগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে বর্তমান যুদ্ধবিরতিতে লেবাননকে অন্তর্ভুক্ত করে কমপক্ষে ৬০ দিনের জন্য একাধিক রণাঙ্গনে যুদ্ধবিরতি কার্যকর করা। অর্থনৈতিক চাপ, জ্বালানি বাজারে অস্থিতিশীলতা, যুক্তরাষ্ট্রসহ উত্তর আমেরিকায় আসন্ন ফুটবল বিশ্বকাপকে ব্যাহত করতে পারে, এমন বৃহত্তর যুদ্ধের ভয়ে ওয়াশিংটনের প্রয়োজন শান্ত পরিস্থিতি। সুতরাং, যুক্তরাষ্ট্রের পিছু হটা বিজয়ের ফল নয়, বরং প্রয়োজনের তাগিদেই ঘটেছে।
কিন্তু নেতানিয়াহু কূটনৈতিক উদ্যোগের বিরোধিতা করছেন। কারণ, ইরানের সঙ্গে ট্রাম্পের এ ধরনের চুক্তি তার কাছে অসহনীয়। কারণ এটি ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলার সুযোগ দেবে অথচ তার ক্ষেপণাস্ত্র ও আঞ্চলিক প্রক্সিগুলো অক্ষত রাখবে, যা ভবিষ্যতের আলোচনায় তেহরানকে আরো বেশি সুবিধা দেবে। এ কারণেই ট্রাম্পের ওপর নেতানিয়াহুর চাপ বাড়াচ্ছেন এবং দুজনের মধ্যে সাম্প্রতিক টেলিফোন আলোচনাকে উত্তেজনাপূর্ণ ও উত্তপ্ত বলে বর্ণনা করা হয়েছে।
নেতানিয়াহু চুক্তির পরিবর্তে গাজা ও লেবাননে নতুন করে উত্তেজনা বৃদ্ধির জন্য ট্রাম্পকে চাপ দিয়েছেন। ট্রাম্প ব্যক্তিগতভাবে হস্তক্ষেপ করে নেতানিয়াহুকে লেবাননে বৃহত্তর আগ্রাসন চালানো থেকে বিরত রেখেছেন এবং সেখানে যুদ্ধবিরতি কার্যকরের কথা বলেছেন, যা মানতে নারাজ নেতানিয়াহু। ফলে দুজনের মধ্যে উত্তেজনা বাড়ছে। ইরান সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শান্তি আলোচনা স্থগিত করার পরও ট্রাম্প দেশটিতে হামলা না করায় নেতানিয়াহু চরম ক্ষুব্ধ।
এই পরিস্থিতিতে নেতানিয়াহুর যদি সরাসরি কূটনীতিকে বাধা দিতে না পারেন, তবে তিনি এর বাস্তবায়ন বানচালের চেষ্টা করবেন। সে ক্ষেত্রে লেবাননই তার হাতে গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র, যেখানে উত্তেজনা বৃদ্ধি, গুপ্তহত্যা বা অভ্যন্তরীণ অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির চেষ্টা ট্রাম্পের কূটনৈতিক উদ্যোগকে লাইনচ্যুত করতে পারে। একই সঙ্গে নেতানিয়াহু ফিলিস্তিনকেও ট্রাম্পের যুদ্ধবিরতি চুক্তি বানচালের আরেকটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন।
মিডল ইস্ট আই অবলম্বনে মোতালেব জামালী
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

