পাকিস্তানের বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সহযোগিতার সম্ভাবনা

ড. শাহজাহান খান

পাকিস্তানের বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সহযোগিতার সম্ভাবনা
ফাইল ছবি

পাকিস্তানের উচ্চশিক্ষা খাতের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ও তদারকি প্রতিষ্ঠান হলো হায়ার এডুকেশন কমিশন এইচইসি। প্রতিষ্ঠানটি দেশটির উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়ন, আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিতকরণ এবং বিশ্বমানের গবেষণা ও উদ্ভাবনকে এগিয়ে নেওয়ার দায়িত্ব পালন করে। গত দুই বছরে এইচইসি বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা খাতের শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিদের নিয়ে একাধিক প্রতিনিধিদল সফরের আয়োজন করেছে। এসব প্রতিনিধিদলে ছিলেন বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক এএসএমএ ফয়েজ ও অধ্যাপক মামুন আহমদ, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এবং জ্যেষ্ঠ শিক্ষাবিদরা। এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো দুই দেশের উচ্চশিক্ষা নেতৃত্বের মধ্যে সংযোগ স্থাপন, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার মানোন্নয়ন, গবেষণা সহযোগিতা বৃদ্ধি, উদ্ভাবন বিনিময় এবং প্রযুক্তি হস্তান্তরের সুযোগ সৃষ্টি করা।

এই কার্যক্রম পাকিস্তান সরকারের ‘পাকিস্তান-বাংলাদেশ নলেজ করিডোর’ উদ্যোগের অংশ। এ কর্মসূচির আওতায় অন্তত ৫০০ বাংলাদেশি শিক্ষার্থীকে আল্লামা ইকবাল স্কলারশিপ দেওয়া হবে, যার মাধ্যমে তারা পাকিস্তানের শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় চিকিৎসাবিজ্ঞান, প্রকৌশল, উদীয়মান প্রযুক্তি এবং অন্যান্য বিষয়ে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে পড়াশোনার সুযোগ পাবে। আমাদের সফরের সময় গত বছর ভর্তি হওয়া ৭৪ বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর অনেকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার সুযোগ হয়। একই সঙ্গে নতুন ব্যাচের শিক্ষার্থী নির্বাচনের প্রক্রিয়াও চলমান রয়েছে। সফরটি এইচইসির উদ্যোগে ঢাকার পাকিস্তান দূতাবাসের সহযোগিতায় আয়োজিত হয় ।

বিজ্ঞাপন

চোখ খুলে দেওয়া এক অভিজ্ঞতা

১৫ সদস্যের বাংলাদেশি প্রতিনিধিদলের জন্য সপ্তাহব্যাপী এ সফর ছিল পাকিস্তানের উচ্চশিক্ষা, গবেষণা ও উদ্ভাবন সম্পর্কে গভীরভাবে জানার এক অসাধারণ সুযোগ। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত গবেষণা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা এবং আধুনিক প্রযুক্তিগত সক্ষমতা অর্জনে পাকিস্তানের অগ্রগতি প্রত্যক্ষ করা সত্যিই বিস্ময়কর ও শিক্ষণীয় ছিল।

পাকিস্তানের জ্যেষ্ঠ শিক্ষাবিদরা বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে বিশেষ করে প্রকৌশল, চিকিৎসাবিজ্ঞান, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং সাইবার নিরাপত্তার মতো ক্ষেত্রে সহযোগিতার ব্যাপারে অত্যন্ত আগ্রহ প্রকাশ করেন। তারা সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং প্রযুক্তি হস্তান্তরের মাধ্যমে বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার উন্নয়নে অবদান রাখতে আগ্রহী।

শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রতিষ্ঠানে সফর

আমাদের সফর শুরু হয় জামশোরোর লিয়াকত ইউনিভার্সিটি অব মেডিকেল অ্যান্ড হেলথ সায়েন্সেস থেকে। এরপর আমরা পাকিস্তানের বেশ কয়েকটি খ্যাতনামা শিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করি। এর মধ্যে ছিল : ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর কেমিক্যাল অ্যান্ড বায়োলজিক্যাল সায়েন্সেস (ICCBS); NED ইউনিভার্সিটি অব ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি; ইকরা ইউনিভার্সিটি; ইনস্টিটিউট অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (IBA) করাচি; COMSATS ইউনিভার্সিটি ইসলামাবাদ; বাহরিয়া ইউনিভার্সিটি, ইসলামাবাদ; ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি (NUTECH); কায়েদ-ই-আজম ইউনিভার্সিটি; খাইবার মেডিকেল ইউনিভার্সিটি; ইসলামিয়া কলেজ পেশোয়ার; ইনস্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্ট সায়েন্সেস (IMSciences) ; ইউনিভার্সিটি অব ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি, পেশোয়ার; শওকত খানম মেমোরিয়াল ক্যানসার হাসপাতাল ও রিসার্চ সেন্টার; মুরির পর্যটন এলাকায় অবস্থিত কোহসার ইউনিভার্সিটি মুরি।

উদ্ভাবন ও গবেষণায় উৎকর্ষ

শুধু অবকাঠামো পরিদর্শনেই সীমাবদ্ধ না থেকে প্রতিনিধিদল পাঠ্যক্রম, শিক্ষণ সুবিধা, অবকাঠামো, শিক্ষার্থী সহায়তা ব্যবস্থা, গবেষণাগার অর্থায়ন, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন, পিএইচডি কর্মসূচি, জার্নাল প্রকাশনা, উদ্ধৃতি অর্জন, বৈশ্বিক র‌্যাংকিং এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা নিয়ে গভীর আলোচনা করে। বিশেষভাবে মুগ্ধ হয়েছি মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অত্যাধুনিক সুবিধা এবং বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার ব্যবস্থায়। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য উদ্ভাবন ছিল হাজার হাজার শিক্ষার্থীর জন্য একযোগে অনলাইন পরীক্ষার ব্যবস্থা, যা বিভিন্ন স্থানে পরিচালিত হলেও সম্পূর্ণ নিজস্ব প্রযুক্তিতে পরিচালিত হয় এবং পরীক্ষা শেষ হওয়ার কয়েক মিনিটের মধ্যেই ফল প্রকাশ করা সম্ভব হয়।

NED বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নত সাইবার নিরাপত্তা গবেষণাগার, চিকিৎসা প্রযুক্তি এবং জ্বালানি পরিমাপসংক্রান্ত উদ্ভাবন বিশেষভাবে প্রশংসনীয়। IBA করাচি এবং IMSciences পেশোয়ার, উভয়ই আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন ব্যবসায় শিক্ষা প্রদান করছে।

COMSATS বিশ্ববিদ্যালয়ে AI-ভিত্তিক প্রশাসনিক অনুমোদন ও ফাইল ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি অনুমোদনের সময় ৩২ দিন থেকে কমিয়ে মাত্র ৩০ ঘণ্টায় নিয়ে এসেছে এবং পুরো ব্যবস্থাকে কাগজবিহীন করেছে। OIC-এর সেন্টার অব এক্সেলেন্স হিসেবে স্বীকৃত ICCBS আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বিজ্ঞানী অধ্যাপক আতাউর রহমানের মতো গবেষকদের নেতৃত্বে বৈজ্ঞানিক উৎকর্ষের এক অনন্য কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তিনি ২০০৬ সালে এইচইসি প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

অন্যদিকে NUTECH-এর ব্যবহারিক ও হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা শিল্প খাতের জন্য দক্ষ ও কর্মোপযোগী স্নাতক তৈরির এক অনুকরণীয় উদাহরণ।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে ইতিবাচক প্রতিযোগিতা

যদিও আমরা লাহোরসহ পাকিস্তানের অন্যান্য শহরে আরো অনেক শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয় পরিদর্শনের সুযোগ পাইনি, তবু স্পষ্ট হয়েছে, দেশটির উচ্চশিক্ষা খাত বৈশ্বিক র‌্যাংকিংয়ের পাশাপাশি প্রাদেশিক ও ফেডারেল র‌্যাংকিং ব্যবস্থার সুবিধা ভোগ করছে। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে শিক্ষার মান ও গবেষণার উৎকর্ষ বৃদ্ধির জন্য প্রকৃত প্রতিযোগিতা গড়ে উঠেছে। আমরা পাকিস্তানের প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ মানুষের আন্তরিক আতিথেয়তায় গভীরভাবে মুগ্ধ হয়েছি। বিশেষ করে, এইচইসি পরিচালক জাহানজেব খান এবং তার দলের অক্লান্ত সহযোগিতা বিশেষভাবে প্রশংসার দাবিদার।

ভবিষ্যতের সম্ভাবনা

বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে এখনো পুরোপুরি বিকশিত না হওয়া শিক্ষাগত সহযোগিতার বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। এই সহযোগিতা একাডেমিক উৎকর্ষ, গবেষণা উদ্ভাবন এবং প্রযুক্তিগত অগ্রগতির জন্য শক্তিশালী অনুঘটক হিসেবে কাজ করতে পারে। সফরের সময় বিনিময় হওয়া জ্ঞান, অভিজ্ঞতা এবং সৌহার্দ্য প্রমাণ করে যে যৌথ গবেষণা, শিক্ষক ও শিক্ষার্থী বিনিময় এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক অংশীদারত্বের মাধ্যমে দুই দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ই ব্যাপকভাবে উপকৃত হতে পারে। এই সম্পর্ক আরো সুদৃঢ় হলে তা শুধু উচ্চশিক্ষার উন্নয়নই নয়, বরং আঞ্চলিক সহযোগিতা ও সামগ্রিক উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।

লেখক : অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন কুইন্সল্যান্ডের ইমেরিটাস অধ্যাপক, বাংলাদেশ বিজ্ঞান একাডেমির প্রবাসী ফেলো এবং এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের সাবেক উপাচার্য

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ

এলাকার খবর
Loading...