আজ থেকে প্রায় ছয় দশক আগে গ্রামে কিংবা গ্রামীণ শহরে কালো, সৎ এবং বিপদে-আপদে কাছে পাওয়া যায়Ñএমন মানুষকেই এমপি চেয়ারম্যান, মেম্বার নির্বাচন করা হতো। যাকে ওইসব পদ-পদবির জন্য নির্বাচন করা হতোÑতারা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই রাজি হতেন না। কারণ হিসেবে দেখানো হতো, এতে পকেটের পয়সা খরচ করে যতটুকু সম্ভব উন্নয়ন করা হতো। এই ‘ভদ্রলোক’ অর্থাৎ ভালো মানুষরা রাজি না হলে সবাই দল বেঁধে তার বাড়িতে গিয়ে অনুনয়-বিনয় করতেন। এটাকে ‘সম্মিলিত সামাজিক সম্মতি’ হিসেবেই দেখা বাঞ্ছনীয়। কালক্রমে ওই প্রথা উঠতে থাকে। সম্মিলিত সামাজিক সম্মতি ব্যবস্থায় ভাঙন ধরতে থাকে। ভোটের বিনিময়ে ‘ঘুস’ যেখানে ছিল ‘পান-তামাক’Ñতার স্থান ক্রমান্বয়ে অর্থ বা টাকা পর্যন্ত গড়িয়েছে। আগে ভোটারদের ‘সম্মান’ ছিল সততা, ন্যায় ও ন্যায্যতার আর এখন ভোটারদের সম্মান কমেছেÑ ‘টাকা নামক’ উপাদানটি যুক্ত হয়েছে।
আগে নিজ পকেটের অর্থ খরচ করে মানুষের কল্যাণ করা হতো। আর এখন উন্নয়ন নামক নতুন ব্যবস্থা যুক্ত হয়েছে।
এখন জাতীয় নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় শতকোটি টাকার প্রয়োজন হয়। দলীয় মনোনয়ন এখন কিনতে হয়। যার যত বেশি অর্থবিত্ত, তিনি নির্বাচনের বাজারে তত বেশি ‘মোটাতাজা’। এই মোটাতাজাকরণ প্রকল্পে নির্বাচনের উপকার তো হয়ইনি; বরং ‘ভোটারদের রুগ্ণকরণ প্রক্রিয়া’ জোরদার হয়েছে।
নির্বাচনের নামে এমন কর্মকাণ্ডের আবিষ্কারক ‘ঔপনিবেশিকতা’। কারণ নির্বাচনের নামে একটি ‘নতুন শ্রেণির’ উত্থান ঘটানো ছিল তাদের উদ্দেশ্য। এটা শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বজুড়ে ঘটছে। একসময়ের ‘বাই দ্য পিপল, ফর দ্য পিপল’-এর জমানা নয়। আব্রাহাম লিংকন এবং গেটিসবার্গ বক্তৃতা এখন অচল।
গণতন্ত্রের সংজ্ঞা যেমন পরিবর্তিত হয়েছে, তেমনি নির্বাচনের সবকিছুরই ঘটে গেছে পরিবর্তনের ঘটনাবলি। এ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনার আগে বর্তমান বিশ্বের প্রাচীন যুগের কিছুটা ঘুরে আসা প্রয়োজন আছে বলে মনে করি।
খ্রিষ্টপূর্ব প্রায় ৪০০ বছর আগে গ্রিক দার্শনিক, এরিস্টটলের কাছে তার শিষ্যরা জানতে চাইলেন কেমন গণতন্ত্র এবং গণতান্ত্রিক পদ্ধতি চান? চটজলদি জবাব দিলেন, এরিস্টটল একটি মাঠের মধ্যে যত মানুষ ধরবে, ততটুকু। তার জবাব ছিল এ রকমÑ‘তিনি সবার কথা শুনতে চান।’ এটা হচ্ছে সরাসরি গণতন্ত্র। আবার এরিস্টটলের গুরু প্লেটো গণতন্ত্রের ঘোরতরবিরোধী ছিলেন। এর কারণ প্লেটোর গুরু সক্রেটিসকে তার ভাষায় ‘কথিত গণতন্ত্রের’ নামে মৃত্যুদণ্ড হয়। খ্রিষ্টপূর্ব ৩৯৯-এ সক্রেটিসের যে বিচার হয়েছিল, তাতে ৫০১ জন বিচারকের মধ্যে ২৮০ জন মৃত্যুদণ্ডের পক্ষে এবং ২২১ জন বিপক্ষে ভোট দেন। পরবর্তীকালে এই বিচারকার্য এবং সক্রেটিসের জবানবন্দি নিয়ে প্লেটো বিখ্যাত একটি বই লেখেন, যার ইংরেজি তরজমা ‘The last days of Socrates’ (সক্রেটিসের জবানবন্দি)। ওই বইয়ে সক্রেটিস বলেছেন, জনগণ কী ভাবে তা বড় বিষয় নয়। জনগণ আপনাদের বিচারক মনোনীত করেছে। এখন আপনারাই জনগণের মতামতের প্রতিফলন ঘটাবেন এবং বলবেন, এটাই হচ্ছে জনগণের অভিমত, কোনটা ন্যায়, কোনটি অন্যায় তা বিবেচ্য বিষয় নয়। তবে কেউ এটা বলতেই পারে, জনগণ আমাদের মৃত্যুদণ্ড দিতে পারে। তবে জ্ঞানীদের অভিমত, শান্ত এবং আওয়াজবিহীন আর মূর্খদের অভিমত ভুল, বিভ্রান্তি, ত্রুটিপূর্ণ যুক্তিতে ভরা। [তথ্য সূত্র : The last days of socratis, penguin Books, England 1995; Page-81-83]
এ কথা মনে রাখতে হবে, নির্বাচনব্যবস্থা গণতন্ত্রের একটি পর্যায় মাত্র। যে প্রাচীন গ্রিসের কথা বলা হলো, সেখানে নারী, দাস এবং জন্মসূত্রে ওই এলাকার আদি অধিবাসী নন, তারা ভোটার হতে পারতেন না। এভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা হলো, গণতন্ত্রকে কতটা গণমুখী করা যায়। এই পরীক্ষা-নিরীক্ষার একপর্যায়ে দার্শনিক জন স্টুয়ার্ড মিল ১৮৬১ সালে লিখলেনÑ‘The Representative Govt.’ (প্রতিনিধিত্বমূলক সরকার)। তিনিই প্রথম সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব বিষয়টির ওপর আলোকপাত করেন। মিল প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্রের পক্ষে যুক্তি দেন এই কারণে যে, না হলে সংখ্যালঘিষ্ঠের স্বৈরাচার কায়েম হবে। আর জনগণের মতামত প্রতিফলিত হবে তাদের প্রতিনিধিদের মাধ্যমে। এটাই হচ্ছে আধুনিক গণতন্ত্রের শুরুর কথা এবং আধুনিককালের নির্বাচন নিয়ে চিন্তাভাবনার শুরু।
এখানে একটি বিষয় উল্লেখ করতেই হবে যে, চরম ভুল ও ভ্রান্তিটি ঘটে নির্বাচনকে গণতন্ত্রের সমার্থক বানিয়ে ফেলার মধ্য দিয়ে নির্বাচনই গণতন্ত্রÑএকটি ঐতিহাসিক ভ্রান্তি। আর এই ভ্রান্তি ইচ্ছাকৃতভাবেই বলে অন্তত আমি মনে করি। গণতন্ত্র একটি প্যাকেজ অর্থাৎ অনেক কিছু মিলিয়েই একটি গণতান্ত্রিক সমাজ এবং এর ভিত্তিতেই একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রকাঠামো নির্মাণ সম্ভব। নির্বাচন গণতন্ত্রের অনেকগুলো উপাদান এবং অঙ্গের একটি। পরিপূর্ণ একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য ন্যায়বিচার, সামাজিক এবং ক্ষমতার জন অংশীদারত্ব, ন্যায্যতার ব্যবস্থাসহ অনেক কিছু নিশ্চিত করতে হয়। রাজনৈতিক বন্দোবস্তে সর্বজনের অংশীদারত্ব একশ ভাগ নিশ্চিত করা না গেলে গণতন্ত্র আছে এটা বলা যাবে না। গণতন্ত্রের জন্য ‘সাংবিধানিকভাবে’ দেশ চলছে কি নাÑতা যেমন জরুরি, তেমনি মানবাধিকার, রাষ্ট্র ক্ষমতার ক্ষেত্রে জনগণের সার্বভৌমত্ব, বাকস্বাধীনতা, ক্ষমতার বিকেন্দ্রায়নসহ ওই প্যাকেজটির প্রয়োজন হয়। জন স্টুয়ার্ড মিলের প্রতিনিধিত্বশীল সরকার ব্যবস্থার পথ ধরে সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্বই হচ্ছে নির্বাচন। ফরাসি দার্শনিক Alexis de Tocqueville (আলেক্সি ডি টকোভিল) যেমনটি তার ডেমোক্রেসি ইন আমেরিকা বইয়ে বলেছেন, গণতন্ত্রের শাসনের অস্তিত্বের মোদ্দা কথা, অর্থাৎ গণতান্ত্রিক শাসনের অন্তর্গত প্রকৃতি হচ্ছে সংখ্যাগরিষ্ঠের সর্বোচ্চ ক্ষমতা এবং জনগণের সার্বভৌমত্ব। একই কথা জন স্টুয়ার্ড মিল তার On Liberty বইয়েও বলেছেন, ব্যক্তির অর্থাৎ এককের শাসনের সীমিতকরণই হচ্ছে গণতন্ত্র। তাহলে আমরা যে নির্বাচনের মাতামাতি করছিÑতা কী? এটাই কি গণতন্ত্র অথবা গণতন্ত্রের রক্ষাকবচ বা গ্যারান্টি?
খুব সংক্ষেপে বলা যায়, নির্বাচনকেই গণতন্ত্রের সমার্থক অথবা নির্বাচনই হচ্ছে গণতন্ত্রÑএমন ধারণার বিস্তার আসলে একটি ‘কুমতলবি প্রকল্প’।’ আগের ঔপনিবেশিক শক্তিÑযাকে এখন আমরা সাম্রাজ্যবাদ অথবা নয়া-উপনিবেশবাদ বলি, তারা তাদের সহযোগী গোষ্ঠীতন্ত্র বা কতিপয়ের শাসনের মাধ্যমে শাসন ক্ষমতাকে নিজেদের হাতে রাখতে চায়। এ জন্য কালের বিবর্তন অভিজাততন্ত্র, গোষ্ঠীতন্ত্র, অলিগার্কি এবং হালের ডিপ স্টেট নির্ধারণ করে দিচ্ছেÑনির্বাচনই হচ্ছে গণতন্ত্রের সমার্থক। উদাহরণ হিসেবে তথাকথিত গণতন্ত্রের আঁতুড়ঘর ব্রিটেনে এবং রাজতন্ত্রের ইউরোপের কোনো কোনো দেশে ১৮৬০ সময়কালে জনসংখ্যার মাত্র ২ শতাংশ এবং ১৮৬৭-৭-এর সময়কালে ৭ শতাংশ মানুষ ভোটার হতে পারতেন। তখন তারা ঢাকঢোল পিটিয়ে বলত, এটাই হচ্ছে সত্যিকারের নির্বাচন, যা গণতন্ত্রকে নিশ্চিত করতে পারছে এবং পারবে। আমরাও খুব ভক্তি-শ্রদ্ধা সহকারে ‘গণতন্ত্রের পশ্চিমা মডেল’কে পূর্জা অর্চনা করে থাকি। যাই হোক, এই আলোচনা দীর্ঘ করার কোনো কারণ আছে বলে মনে হয় না।
ইতোমধ্যে জাতীয় নির্বাচনের নানা কর্মকাণ্ড চলছে। তবে যতটা নির্বাচন অনুষ্ঠান নিয়ে হচ্ছে, তার চেয়েও বেশি সংশয়, সন্দেহও রয়েছে বিস্তর। সাধারণত জাতীয় নির্বাচন বা সংসদ নির্বাচন নিয়ে আগ মুহূর্তে যে ধরনের উত্তাপ সৃষ্টি হয়, এবারে বোধ করি তা কিছুটা কম। নির্বাচনি তাপ আছে, উত্তাপ অনুপস্থিত। এর কারণ নানা মাত্রিক। ২০০৮-এর ‘পাতানো’ নির্বাচনের পর মানুষ থমকে যায়। এরপর ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪-এর নানা কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে যা হয়েছে, তাতে মানুষের আস্থাহীনতা এমন একপর্যায়ে পৌঁছেছে যে, ওই আস্থাহীনতার ক্ষত সারাতে বহুকাল লাগবে। নির্বাচন প্রকাশ্যেই এখন আর দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় নেই। এটা এখন বহির্দেশীয় চাওয়া-পাওয়ায় এবং চাপে ও কূটনীতির অঙ্কে পরিণত হয়েছে। ২০০৮ সালে মানুষ পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারেনি। ২০১৪ সালের খাতা-কলমের নির্বাচনে বিষয়টি স্পষ্ট হয়। ২০১৪ সালে ভারতীয় তৎকালীন পররাষ্ট্র সচিব সুজাতা সিংয়ের দৌড়ঝাঁপ, ঢাকায় তার উপস্থিতিতে মানুষ অসহায় হয়ে পড়ে।
২০১৪-এর বাংলাদেশের নির্বাচন এবং সরকার গঠনের ভাগ্য নির্ধারিত হয় তৎকালীন কথিত ‘দিল্লি বৈঠকে’। ওই বৈঠকে ভারত এবং যুক্তরাষ্ট্র নির্ধারণ করে দেয় সবকিছু অর্থাৎ নির্বাচন কীভাবে হবে, কে সরকার গঠন করবে। ২০১৮ সালেও একই পরিস্থিতি ছিল। ২০২৪-এর নির্বাচনের কথা হয়তো অনেকের মনেই নেই।
এখনো পরিস্থিতির কোনা পরিবর্তন হয়েছে বলে মনে করি না। বাংলাদেশের নির্বাচন ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক’ হতেই হবে বলে যে নসিহত করা হচ্ছে, তার সঙ্গে অতীত দিনের ঘটনাবলির পার্থক্য কোথায়? আর ইনক্লুসিভ বা অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন বলতে কী বোঝাতে চান, তাও বাংলাদেশের সবাই বোধ করি জানেন এবং বুঝতে পারেন। তবে এক কথায় বলা যায়, ২০২৪ সালের তরুণদের নেতৃত্বে শ্রমিক, কৃষক, কর্মচারী, রিকশাওয়ালা, দিনমজুর, নারীসহ সবার অংশগ্রহণে যে ঐতিহাসিক বিপ্লবটি হয়েছে, তা শুধু রাজনৈতিক দৃশ্যপট, বাস্তবতা, প্রেক্ষাপট, ভূরাজনীতি, সামাজিক ও রাজনৈতিক ইস্যু অর্থাৎ মোদ্দাকথায় পলিটিক্যাল ল্যান্ডস্কেপ পরিবর্তন করে দিয়েছে। এ বিষয়টিকে মাথায় রাখতে হবে।
এ বিষয়গুলো মাথায় নিয়ে সব দেশি-বিদেশি রাজনৈতিক পক্ষকে মনে রাখতে হবে, বিগত দিনের নির্বাচন থেকে এ বছরের, অর্থাৎ ২০২৬-এর নির্বাচনটি বিশেষ আলাদাভাবে বৈশিষ্ট্যপূর্ণ, উল্লেখযোগ্য, চূড়ান্ত নিষ্পত্তি ও সিদ্ধান্তমূলক এবং রাজনৈতিক ক্ষেত্রে নির্ণায়কের ভূমিকা পালন করবে। ভবিষ্যতে রাজনৈতিক কাঠামো, বিন্যাস, রাজনৈতিক বন্দোবস্ত কেমন হবে, তাও যেমন নির্ধারিত হবে, সঙ্গে সঙ্গে ভূরাজনৈতিক, প্রতিরক্ষা, নিরাপত্তা, পররাষ্ট্রনীতির গতিপথের সিদ্ধান্তও হবে। হবে এ কারণে যে, ২০২৬ সালের নির্বাচন শুধু নয়, পুরো ২০২৬ সালই হবে নির্ধারক ও নির্ণায়কের বছর এবং ঘটনাবহুল।
প্রায় নিশ্চিত হয়েই বলা যায়, এই নির্বাচন এবং বছরটিতে জনগোষ্ঠীর অধিকাংশই প্রকৃত স্বাধীনতা এবং সত্যিকার সার্বভৌমত্বকামী মুখোমুখি হবে অলিগার্কি বা কতিপয় অথবা গোষ্ঠী শাসনের বিরুদ্ধে। তার চেয়েও বড় যে ঘটনাটি ঘটবে, তা হলো দেশি-বিদেশি সমন্বয়ে অধিক ‘ডিপ স্টেট’কেও প্রথমবারের মতো চ্যালেঞ্জ করা হবে ওই সর্বসাধারণের পক্ষ থেকে, যাদের কারণে বিপ্লবকে আবার ব্যর্থ করা হয়েছে। রাজনৈতিক জন অংশীদারত্বের বন্দোবস্ত যতক্ষণ পর্যন্ত না অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়িত হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত বিপ্লব এবং বিপ্লবের চেতনা সমুন্নত থাকবে, ততক্ষণ পর্যন্ত এটা ঘটতে থাকবে। এটা ইতিহাসের অবধারিত ‘সংশোধন এবং বিলোপ’ প্রক্রিয়ারই অংশ। মনে রাখতে হবে, বিপ্লব এক দিনের বা নির্দিষ্ট সপ্তাহের জন্য ঘোষণা দিয়ে হয় না। ফরাসি বিপ্লব, জার্মান বিপ্লবসহ দুনিয়ায় এর বহু উদাহরণ আছে।
সংক্ষেপে ডিপ স্টেট কী, সে সম্পর্কে বলা প্রয়োজন। ‘ডিপ স্টেট হচ্ছে রাষ্ট্রকাঠামোর, অর্থাৎ সরকারের মধ্যে থাকা অননুমোদিত অতি গোপনীয় একটি গোপন নেটওয়ার্ক, যারা রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের বদলে নিজস্ব এজেন্ডা বাস্তবায়নে গঠিত। এরা জনআকাঙ্ক্ষার বিপরীতে নিজস্ব ক্ষমতার উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে কাজ করে। একে এক অদৃশ্য কাঠামো হিসেবে চিহ্নিত করা বাঞ্ছনীয়। আর এটির হয়ে কাজ করে সামরিক-বেসামরিক আমলাতন্ত্র, গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর নেটওয়ার্ক, এলিট ও অলিগার্কি শ্রেণির প্রতিনিধিসহ অনেকে। এরা শুধু দেশের অ্যাক্টরদের হয়ে কাজ করে না, শত্রু বা বৈরী দেশের স্বার্থরক্ষার সঙ্গে ভালোভাবেই জড়িত। এ সম্পর্কে বিস্তারিত পরে একদিন আলোচনা করার ইচ্ছে রইল।
জরিপের দোকান
নির্বাচন এলেই একদল জরিপকারীর ‘প্রাদুর্ভাব’ ঘটে। ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪, অর্থাৎ যখন নির্বাচনের নামে ‘খাতা-কলমের’ বা রাতের ভোট হয়েছে, তখনো এই জরিপকারীদের কার্যক্রম লক্ষ করা গেছে। কাজেই এদের উদ্দেশ্য-বিধেয় বুঝতে কি বাকি আছে?
নির্বাচনি জরিপ শুরু হয় ভালো উদ্দেশ্য নিয়েই অর্থাৎ, ১৮২৮ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সামনে রেখে। ১৯৩৬ সালে জর্জ গ্যালআপ মোটামুটি ‘সহি’ একটি জরিপ কার্যক্রম পরিচালনা করেন। তার নামেই নির্বাচনি জরিপকে গ্যালআপ পোল বলা হয়ে থাকে।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি নির্বাচন নিয়ে ইতোমধ্যে কয়েকটি জরিপ হয়েছে। এর মধ্যে দুটিকে নমুনা হিসেবে যদি দেখা হয়, তাহলে দেখা যাবে যে, কারো দৃষ্টিতে এসব জরিপ মারাত্মক পর্যায়ে ত্রুটিপূর্ণ।
২০২৫-এর জুলাইয়ে ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউটের (বিআইজিডি) নির্বাচনি জরিপে দেখা যায়, কাকে ভোট দেবেন এমন প্রশ্নে ৪৮ দশমিক ৫ শতাংশ মানুষ কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি। এখানে বলা প্রয়োজন, রাজনৈতিক বাস্তবতা, দৃশ্যপট, প্রেক্ষাপট, ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং সামাজিক-রাজনৈতিক ইস্যুগুলো, অর্থাৎ পলিটিক্যাল ‘ল্যান্ডস্কেপ’ জরিপের সময়ে বিবেচনায় রাখতে হবে। ৪৮ দশমিক ৫ ভাগ মানুষের সিদ্ধান্তহীনতার মধ্যে তাহলে এই জরিপের ফলাফলের গুরুত্ব বা তাৎপর্য কোথায়? দ্বিতীয়ত, এর আগের জরিপে অর্থাৎ আট মাসের ব্যবধানে সিদ্ধান্তহীন মানুষের সংখ্যা বেড়েছে ১০ শতাংশ। তাহলে কেন এমন পরিস্থিতি হলো, তার জরিপটি আগে হওয়া উচিত ছিল। তৃতীয়ত, এর বাইরে ১৪ দশমিক ৪ শতাংশ উত্তরদাতা পছন্দের দলের নাম প্রকাশ করতে চান না। তাহলে পরিস্থিতি দাঁড়াল এমন যে, শতকরা ৬২ দশমিক ৯ শতাংশ উত্তরদাতার বাইরে, অর্থাৎ ৩৭ দশমিক ১ শতাংশ মানুষ তাদের স্পষ্ট মতামত জানিয়েছে। তাহলে এই জরিপের প্রয়োজনীয়তা এবং যৌক্তিকতা কোথায়? জরিপে যে দল আনুষ্ঠানিকভাবে নিষিদ্ধ, তাদের জনসমর্থন কতটুকুÑএই প্রশ্নের পেছনে আসলে মূল উদ্দেশ্যটি নিহিত। তারাও কি পাশের একটি দেশের ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক’ নির্বাচনের তত্ত্বের প্রচারক? এভাবে নানা ত্রুটি-বিচ্যুতি তাদের তিনটি পালস জরিপে চোখে পড়ে। এ নিয়ে বিস্তারিত আর কিছু আলোচনার প্রয়োজন আছে বলে মনে করি না।
আরেকটি জরিপে, অর্থাৎ এমিলেন্স অ্যাসোসিয়েট বা (ইএনএসডি) নামের একটি সংস্থার জরিপে দেখানো হয়েছে, শতকরা ৭০ শতাংশ উত্তরদাতা বলেছেন, তারা বিএনপিকে ভোট দিতে চান। জামায়াতকে ১৯ এবং এনসিপিকে ২ দশমিক ৬ শতাংশ উত্তরদাতা ভোট দিতে আগ্রহী। এই হিসাবের ওপর ভিত্তি করে বলা যায়, বিএনপি তাহলে দুই শতাধিক আসনে অর্থাৎ ২১০-এর বেশি আসনে জয়ী হবে নিশ্চিতভাবে। আবার ওই একই জরিপের ফলে বলা হয়েছে, ৭৭ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করেন বিএনপি সরকার গঠন করবে।
এ কারণে জরিপের ফলে জনগণের বিশ্বাস থাকার কোনো কারণ আছে বলে মনে হয় না। ভবিষ্যতে এ বিষয় নিয়ে আরো লেখার ইচ্ছে রইল।
পরিসংখ্যান নিয়ে একটি কথা ঠাট্টাচ্ছলে বলা হয়। ১৮ শতকের ব্রিটিশ রাজনীতিবিদ, প্রধানমন্ত্রী এবং দার্শনিক বেঞ্জামিন ডিজরেলি বলেন, পরিসংখ্যান হচ্ছেÑমিথ্যা, জঘন্য মিথ্যা এবং পরিসংখ্যান। (Lies, damn lies and statistics)।
জরিপের দোকানদার ও ফেরিওয়ালাদের ক্ষেত্রেও কি আমাদের বলতে হবেÑমিথ্যা, জঘন্য মিথ্যা এবং তথাকথিত জরিপ। এই দোকানদারদের হাত থেকে যত শিগগির মুক্তি মিলবে, ততই দেশ এবং জনগণের প্রকৃত উন্নয়ন হবেÑরাহুমুক্ত হবে দেশ এবং জনগণ। আমিন।
লেখক : গবেষক ও সাংবাদিক
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

