বাংলাদেশ কেবল একটি অতুলনীয় ভূখণ্ডের নাম নয়, বরং এটি ইতিহাসের চরম বেদনায় জন্ম নেওয়া এক অসাধারণ জাতির আজন্ম লালিত স্বপ্নের নাম। এই ভূমি রক্তে ভেজা, ত্যাগে গড়া আর মানুষের চরম আবেগ ও আকাঙ্ক্ষায় উদ্দীপ্ত। এ দেশের মুক্তিযুদ্ধ কেবল পতাকা ও নাম বদলের নয়, বরং এটি ছিল মানুষের মর্যাদা, সাম্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য এক মহৎ সংগ্রাম। তাই ‘ইনসাফের বাংলাদেশ’ নিছক কোনো রাজনৈতিক স্লোগান নয়, বরং এটি আমাদের অস্তিত্ব ও আত্মমর্যাদাবোধের গভীরতম দাবি।
একটি জাতির প্রকৃত পরিচয় তার আকাশচুম্বী ভবনে নয়, সামরিক শক্তি কিংবা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতেও নয়, বরং সে কীভাবে তার সবচেয়ে দুর্বল, সাধারণ ও প্রান্তিক মানুষদের প্রতি আচরণ করে, তার মধ্যেই জাতির নৈতিক চেহারা প্রতিফলিত হয়। যে রাষ্ট্রে সাধারণ মানুষ ন্যায়বিচার পায় না, সে রাষ্ট্র হয়তো সামরিক বা অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী হতে পারে, কিন্তু সে রাষ্ট্র কোনোভাবেই মানবিক নয়।
ন্যায় শুধু আদালতের রায় নয় এটি হৃদয়ের আলো, বিবেকের প্রহরী আর সভ্যতার ভিত্তি। যেখানে শক্তি সত্যকে চুপ করায়, সেখানে রাষ্ট্র বাঁচে কিন্তু মানুষ হারিয়ে যায়। যেখানে ক্ষমতা জবাবদিহিতাহীন হয়, সেখানে আইন থাকে কিন্তু ইনসাফ থাকে না। আমাদের আকাঙ্ক্ষা এমন বাংলাদেশের, যেখানে মানুষ স্বীয় মর্যাদায় বাঁচবে, যেকোনো অন্যায়ে ভীত হবে, আর সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে সাহসী হবে। আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা ন্যায়ের ওপর দৃঢ় প্রতিষ্ঠিত থাকো, আল্লাহর জন্য সাক্ষ্য দাও নিজেদের, পিতামাতা বা আত্মীয়দের বিরুদ্ধে হলেও।’ (সুরা নিসা: ১৩৫)। এই আয়াত আমাদের শেখায় ন্যায় কোনো সুবিধার বিষয় নয়, বরং এটি ঈমানের পরীক্ষা ও মানবিকতারও মাপকাঠি।
মানুষ জন্মগতভাবেই ন্যায়প্রিয়। একটি শিশু যখন বঞ্চিত হয়, তখনই সে কাঁদে। যখন অবিচার দেখে, সে প্রতিবাদ করে। এই স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিক্রিয়া প্রমাণ করে, ন্যায় মানুষের প্রকৃতির ভেতরেই গেঁথে আছে। এটি কোনো আরোপিত মূল্য নয়, এটিই স্বাভাবিক মানবিক প্রবৃত্তি। আল-কোরআনে বলা হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায়, সদাচার ও আত্মীয়স্বজনকে দানের নির্দেশ দেন।’ (সুরা আন-নাহল: ৯০)। অর্থাৎ, ন্যায় কেবল সামাজিক শৃঙ্খলা নয়, এটি মানুষের আত্মার খাদ্য। যে জাতি ন্যায়কে অবহেলা করে, সে জাতি ধীরে ধীরে আত্মিকভাবে মৃত হয়ে যায়। প্রকৃত সভ্যতার ইতিহাস মূলত ন্যায়ের ইতিহাস। যখন ন্যায় ক্ষীণ হয়, তখন সভ্যতা ভেঙে পড়ে। রোম, মোগল কিংবা আধুনিক সাম্রাজ্য সবাই পতনের মুখ দেখেছে, যখন শাসনব্যবস্থা ন্যায়ভ্রষ্ট হয়েছে। কারণ অন্যায় শুধু ব্যক্তি নয় পুরো সমাজকেই বিষাক্ত করে এবং পরিণামে তার মৃত্যু ঘটে।
‘সাধারণ মানুষ’ শব্দটি কোনো দুর্বলতার প্রতীক নয়, বরং জাতির প্রাণশক্তির প্রতীক। কৃষক, শ্রমিক, রিকশাচালক, গৃহকর্মী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, স্কুল বা মাদরাসার শিক্ষক তারাই অর্থনীতি চালান। তারাই আমাদের সংস্কৃতি বহন করেন, পরিবার টিকিয়ে রাখেন এবং সমাজের নৈতিক মেরুদণ্ড গড়ে তোলেন। কিন্তু যখন তারা অন্যায় মামলায় হয়রানির শিকার হন, ঘুষ ছাড়া সেবা পান না, থানায় গেলে নিরাপত্তা পান না, হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসা পান না, আদালতে ন্যায়বিচার পান না—তখন রাষ্ট্র শুধু অমানবিক হয় না, বরং নিজেই এর নৈতিক ভিত্তি হারিয়ে ফেলে।
একজন দরিদ্র মানুষ যখন অন্যায়ের শিকার হন এবং কোথাও আশ্রয় পান না, তখন তিনি শুধু হতাশ হন না, তিনি মানুষের ওপর বিশ্বাসও হারিয়ে ফেলেন। আর যে জাতির মানুষ মানুষের ওপর বিশ্বাস হারায়, সে জাতি কখনোই মানবিক হতে পারে না। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সতর্ক করেছেন, ‘মজলুমের বদদোয়া থেকে সাবধান থেকো, কারণ তার ও আল্লাহর মধ্যে কোনো পর্দা নেই।’ (সহিহ বুখারি)। অর্থাৎ, সাধারণ মানুষের বেদনা শুধু সামাজিক নয়, এটি ঐশী নৈতিকতার সঙ্গেও যুক্ত।
অন্যায় কেবল আইন ভাঙা নয়, এটি মানুষের আত্মসম্মানেরও হত্যা। একজন দরিদ্র মা যখন তার সন্তানের চিকিৎসা করাতে পারেন না, তখন শুধু দারিদ্র্য নয়, রাষ্ট্রের ব্যর্থতাও তাকে আঘাত করে। একজন কৃষক যখন তার জমির ফসলের ন্যায্য দাম পান না, তখন শুধু অর্থনীতি নয়, ন্যায় ভেঙে পড়ে। একজন আদর্শবান টগবগে তরুণ যখন দেখে সততা দিয়ে টিকে থাকা অসম্ভব, তখন শুধু তার স্বপ্ন নয় সমাজের নৈতিকতাও ধ্বংস হয়ে যায়। ন্যায়হীনতা ধীরে ধীরে সমাজকে তিনটি বিষে আক্রান্ত করে—অবিশ্বাস, হতাশা ও বিদ্বেষ। এই তিনটি মিলেই একটি জাতির পতন নিশ্চিত হয়ে যায়।
ইনসাফের বাংলাদেশ মানে এমন একটি দেশ—যেখানে ক্ষমতা নয়, সত্য জয়ী হয়, যেখানে ধনী-দরিদ্রের জন্য একই আইন, যেখানে একজন দিনমজুরও বিচারকের সামনে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারেন, যেখানে রাষ্ট্র নাগরিককে ভয় দেখায় না, বরং রক্ষা করে, যেখানে পুলিশ নিরাপত্তার প্রতীক, ভয়ের নয়, যেখানে আদালত ধীরগতি ও অন্যায়ের নয় বরং ন্যায়ের দ্বার। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে জাতিতে দুর্বলদের থেকে শক্তিশালীদের জন্য ন্যায় আদায় করা হয় না, সে জাতি ধ্বংসপ্রাপ্ত।’ (ইবনে মাজাহ)। এটি শুধু ধর্মীয় বাণী নয়, এটি রাজনৈতিক বাস্তবতারও চূড়ান্ত সতর্কতা।
বাংলাদেশ আজ এক কঠিন ও জটিল সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। আমরা অর্থনৈতিক অগ্রগতি দেখেছি, অবকাঠামোগত উন্নয়ন দেখেছি, কিন্তু একই সঙ্গে দেখেছি অকল্পনীয় প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি, রাজনৈতিক বিভাজন, বিচারবিভাগের ধীরগতি ও অন্যায্য বিচার, বিচারবহির্ভূত হত্যা, গুম ও খুন। একই সঙ্গে দেখেছি ক্ষমতার চরম অপব্যবহার ও প্রকট সামাজিক বৈষম্য।
তবে এত সব সংকটই শেষ কথা নয়, সংকট পরিবর্তনের প্রচেষ্টার মাঝেই রয়েছে মুক্তির সম্ভাবনা। আল্লাহ সুবহানু ওয়া তাআলা তাঁর অসীম মেহেরবানিতে এ জাতিতে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট মুক্তি দিয়েছেন। কেননা এ জাতির সর্বশ্রেণির মানুষ অন্যায়ের প্রতিবাদ বুকের তাজা রক্ত দিয়ে সর্বতোভাবে প্রচেষ্টা চালিয়ে স্বৈরাচার থেকে মুক্তির প্রচেষ্টা চালিয়েছে। আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয় আল্লাহ কোনো জাতির অবস্থা পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ না তারা নিজেদের অবস্থা পরিবর্তন করে।’ (সুরা আর-রাদ: ১১)
ইনসাফের বাংলাদেশ কেমন হবে? ইনসাফের বাংলাদেশ হবে ন্যায়ভিত্তিক শাসনব্যবস্থা, আইন হবে সবার জন্য সমান, বিচার হবে দ্রুত ও নিরপেক্ষ। ক্ষমতার জবাবদিহিতা এখানে নিশ্চিত হবে, দুর্নীতির বিরুদ্ধে থাকবে কঠোর ব্যবস্থা। অর্থনীতি হবে মানবিক, যে অর্থনীতিতে সম্পদ মুষ্টিমেয় মানুষের হাতে থাকবে না। দরিদ্রের অধিকার রক্ষায় থাকবে জাকাত, ওশর, ওয়াক্ফ ও সাদাকাহ। সামাজিক কল্যাণ কার্যকর হবে, নিশ্চিত হবে শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি।
ইনসাফের বাংলাদেশের রাজনীতি হবে নৈতিকতাসম্পন্ন। এখানে ঘৃণা নয়, সংলাপের মাধ্যমে উত্তরণের পথ বের করা হবে। প্রতিশোধ বা বিভাজন নয়, ঐক্যবদ্ধভাবে আগামী দিনের স্বপ্নের বীজ বোনা হবে। ইনসাফের বাংলাদেশ হবে মূল্যবোধভিত্তিক। সততা, সহমর্মিতা ও দায়িত্ববোধ শিক্ষার মূল বিষয়। এখানে শিক্ষা হবে চরিত্র গঠনের জন্য। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘আমি প্রেরিত হয়েছি উত্তম চরিত্র পূর্ণ করার জন্য।’ (মুয়াত্তা মালিক)
ইনসাফ শুধু সরকারের কাজ নয়, নাগরিক হিসেবে আমাদের দায়িত্ব। এটি নাগরিকের নৈতিক দায়—অন্যায় দেখলে নীরব না থাকা, সত্য বলার সাহস রাখা, ঘুষ না দেওয়া না নেওয়া, দুর্নীতিকে প্রশ্রয় না দেওয়া এবং ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে জাতীয় কল্যাণ ভাবা। আমাদের মনে রাখতে হবে, একজন সৎ নাগরিক হাজার দুর্নীতিবাজের চেয়েও শক্তিশালী। ইনসাফের বাংলাদেশ গড়তে দরকার তাকওয়া বা আল্লাহর ভয় ও ভালোবাসা। আধ্যাত্মিক ভিত্তিই হচ্ছে তাকওয়া—আসল শক্তি।
রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য আইন অবশ্যই প্রয়োজন, কিন্তু তা যথেষ্ট নয়। যখন নেতা আল্লাহকে ভয় করবে, সে জনগণকে ঠকাবে না। যখন নাগরিক আল্লাহকে ভয় করবে, সে অন্যের অধিকার নষ্ট করবে না। আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা ন্যায় প্রতিষ্ঠা করো; এটাই তাকওয়ার নিকটতম।’ (সুরা মায়িদা: ৮)
ইনসাফের বাংলাদেশের দৃশ্যপট সেদিন স্বপ্ন থেকে বাস্তবে পরিণত হবে, যেদিন একজন রিকশাচালক বলবে, ‘অন্যায় হলে আমিও বিচার পাব,’ একজন দরিদ্র মা বলবে, ‘আমার সন্তান নিরাপদে থাকবে,’ একজন তরুণ বলবে, ‘সততা আর যোগ্যতা দিয়েই আমি টিকে থাকতে পারব,’—সেদিনই বাংলাদেশ সত্যিকার অর্থে মানবিক জাতিতে পরিণত হবে। এই বাংলাদেশ হবে দুর্নীতিমুক্ত, বৈষম্যহীন, মানবিক, নৈতিক ও আল্লাহভীরু।
ইনসাফ বা ন্যায় কোনো বিলাসিতা নয়, কল্পনাও নয়, এটিই জাতির প্রাণ, আত্মা। যেখানে ন্যায় থাকে, সেখানে ভয় থাকে না। সেখানে বিশ্বাস বাড়ে, মানুষ সম্মানের সঙ্গে বাঁচে; ন্যায়ই জাতির প্রাণস্পন্দন। আমাদের প্রত্যেকের দায়িত্ব নিজ জীবনে, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রে ন্যায়ের চর্চা করা। কারণ ন্যায় ছাড়া জাতি বাঁচতে পারে না। আর ন্যায়ের ওপর থাকলে জাতি অমর হয়। আল্লাহ তায়ালা আমাদের ইনসাফের পথে পরিচালিত করুন। আমিন।
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও গবেষক
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


ক্ষমতার ভাষা যখন রাজনীতিকে গ্রাস করে