তারেক রহমানের সরকার বাংলাদেশে দায়িত্ব নেওয়ার পর একশ দিনেরও বেশি সময় পার হয়ে গেছে। তবে তার নেতৃত্ব নিয়ে শুরুতে যে ধরনের আশা তৈরি হয়েছিল, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ক্ষেত্রে তেমন কোনো পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে না। সম্পর্কটা এখনো কমবেশি সেই জায়গায় থমকে আছে, অন্তর্বর্তী সরকারের কঠিন দিনগুলোয় যেমনটা ছিল।
কথা নয়, চাই কাজ
তারেক রহমান বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আগে ভারত দুবার তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেছিল। প্রথম উদ্যোগটি নিয়েছিলেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। তিনি ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর ঢাকা সফরে আসেন। উদ্দেশ্য ছিল রহমানের মা, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করা। দ্বিতীয় উদ্যোগটি নেওয়া হয় পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিশ্রির মাধ্যমে। তিনি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির একটি আমন্ত্রণপত্র নিয়ে এসেছিলেন। এরপর ১৭ ফেব্রুয়ারি লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা তারেক রহমানের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে যোগ দেন।
কিন্তু ক্ষমতার দল বিএনপির ভেতরের সূত্রগুলো বলছে, শুধু এ ধরনের সৌজন্যমূলক আচরণই যথেষ্ট নয়। বিএনপির একটি প্রভাবশালী অংশ মনে করছে, নতুন সরকারের প্রতি আন্তরিকতা দেখানোর জন্য ভারতের উচিত ছিল আগে নেওয়া কিছু শাস্তিমূলক ব্যবস্থা প্রত্যাহার করা। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ভারত এই পদক্ষেপগুলো নিয়েছিল। এর মধ্যে ছিল বাংলাদেশ থেকে পণ্য পরিবহনের ট্রানশিপমেন্ট আবার চালু করা, ব্যবসা, চিকিৎসার ভিসাসহ সব ধরনের ভিসা সুবিধা পুরোপুরি স্বাভাবিক করা এবং বাংলাদেশি পণ্যের বাজারে প্রবেশের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া। ঢাকার দাবি, এখন পর্যন্ত এর কোনোটিই বাস্তবায়ন করা হয়নি। তাদের যুক্তি হলো, এই সিদ্ধান্তগুলো পরিবর্তন না করে ভারত আসলে তারেক রহমানকে আগাম কোনো সুবিধা দেয়নি। অথচ ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার আগে তারেক রহমানকে জামায়াতে ইসলামী এবং ভারতবিরোধী বেশ কিছু ছাত্র সংগঠনের মুখোমুখি হতে হবে।
এদিকে, বিএনপির বর্ষীয়ান নেতারা সম্পর্কটা সহজ করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তারা জনমনে এই ধারণা তৈরি করতে চাইছেন যে, ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান দুদেশের সম্পর্কে দেয়াল হয়ে দাঁড়াবে না। অন্তর্বর্তী সরকার যে কড়া অবস্থান নিয়েছিল, এটি ছিল তা থেকে অনেকটাই সরে আসা। কিন্তু ঢাকা মনে করছে, তাদের এই আন্তরিক চেষ্টাকে ভারত ঠিকভাবে মূল্যায়ন করেনি।
প্রমাণ হিসেবে তারা পশ্চিমবঙ্গ ও আসামে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) বিজয়ের পর দিল্লির অফিশিয়াল বিবৃতিতে ‘অবৈধ অভিবাসন’ শব্দটির আগ্রাসী ব্যবহারের কথা বলছে। বাংলাদেশের কূটনীতিকদের মতে, ঢাকা আশা করেছিল যে অবৈধ অভিবাসনের মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে দিল্লি একটু কম কথা বলবে। তার চেয়ে বেশি জোর দেবে ভিসা চালু এবং ১৯৯৬ সালের গঙ্গা পানি চুক্তি নবায়নের মতো জরুরি বিষয়ে।
পরিস্থিতি পরখ করতে ঢাকা গত ৭-৮ এপ্রিল পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানকে সংক্ষিপ্ত সফরে দিল্লিতে পাঠিয়েছিল। সেখানে তিনি জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল এবং এস জয়শঙ্করের সঙ্গে বৈঠক করেন। তবে আসাম ও পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন প্রচারণায় বাংলাদেশ প্রসঙ্গ টেনে আনা এবং নির্বাসিত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একের পর এক সাক্ষাৎকার ইঙ্গিত দিচ্ছে ভিন্নকথা। বাংলাদেশে বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জয়ী হওয়ার পরও তারেক রহমানের বিএনপি ভারতকে তেমন একটা প্রভাবিত করতে পারেনি। ঢাকার এক সিনিয়র কূটনীতিক অবশ্য জানিয়েছেন, রাজ্য নির্বাচনের সময় ব্যবহৃত ভাষা নতুন দিল্লির পররাষ্ট্র নীতিতে প্রভাব ফেলবে না—এমন আশ্বাস বাংলাদেশকে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ‘অবৈধ অভিবাসন’ নিয়ে কঠোর অবস্থান ঢাকার সচিবালয়ে এক ধরনের ‘বিশ্বাসভঙ্গ’-এর অনুভূতি তৈরি করেছে।
বিভিন্ন খবর অনুযায়ী, তারেক রহমান বুঝতে পারছেন যে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক জোড়া লাগানোর সুযোগগুলো আশানুরূপভাবে খুলছে না। আর তাই তিনি জুন মাসের শেষ সপ্তাহে মালয়েশিয়া ও চীন সফরের চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
বাংলাদেশের দ্বিধা
চীনের দিকে এই ঝুঁকে পড়া অবশ্য একটা সত্যকে আড়াল করতে পারে না। সেটা হলো, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক মেরামতের দায়িত্ব ভারতের যতখানি, বাংলাদেশেরও ঠিক ততখানিই। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান এবং পরবর্তী অন্তর্বর্তী শাসনের কারণে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কটা ভেঙে পড়েছিল। অথচ ২০২৪ সালের আগস্টের পর থেকে চীন, যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্যান্য দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক বেশ উন্নত হয়েছে। তবে বাস্তবসম্মতভাবে চিন্তা করলে, প্রধান নদী পদ্মা (গঙ্গা) নিয়ে ভারতের কাছ থেকে স্পষ্ট আশ্বাস না পেলে ২০২৬ সালের পর বাংলাদেশের অন্য পরিকল্পনাগুলো সহজে এগোবে না। নদীবিশেষজ্ঞ আইনুন নিশাত জানিয়েছেন, ৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গা চুক্তির নবায়নে দেরি হলে গঙ্গা-কপোতাক্ষ সেচ প্রকল্প বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। এর প্রভাব পড়বে পশ্চিম ও মধ্য বাংলাদেশের এক বিশাল অংশে। পানির এই অনিশ্চয়তা সামনে চাষাবাদের ওপর প্রভাব ফেলবে। ফলে মার্কিন-ইসরায়েল ও ইরান যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট জ্বালানি সংকটে যে অর্থনীতি এমনিতেই ধুঁকছে, তা আরো বড় ধাক্কা খাবে।
চারপাশের এই নেতিবাচক পরিস্থিতি স্বাভাবিকভাবেই তারেক রহমান সরকারের ওপর চাপ বাড়িয়ে দেবে। দেশের সবচেয়ে ভয়াবহ হামের প্রাদুর্ভাব সামলাতে না পারার কারণে সরকার এরই মধ্যে সমালোচনার মুখে পড়েছে। এই রোগে ইতোমধ্যে অন্তত ৬০০ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। সমালোচকরা স্বাস্থ্যসংকট মোকাবিলায় সরকারের দুর্বলতা এবং ক্রমবর্ধমান যৌন সহিংসতার সমালোচনা করছেন। ২০২৪ সালের আগস্টের আন্দোলনের পর থেকে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যে ভেঙে পড়েছে, এগুলো তারই লক্ষণ। শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ দলগতভাবে নিষিদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও মাঠে নামার চেষ্টা করছে। তারেক রহমান যদি ২০২৬ সালের ৩১ ডিসেম্বরের নির্দিষ্ট সময়ের আগে দিল্লির সঙ্গে গঙ্গা চুক্তি নবায়ন করতে না পারেন, তবে তার প্রতিপক্ষরা আরো শক্তিশালী হয়ে উঠবে।
বাস্তবতার এই কঠিন সমীকরণ দুদেশের শীর্ষ নেতৃত্বকেই বাস্তববাদী হওয়ার তাগিদ দিচ্ছে। কারণ সমস্যাগুলো খুব দ্রুত বাংলাদেশকে গ্রাস করতে পারে, যা দেশটিকে আবার এক অস্থিরতার দিকে ঠেলে দেবে। আর সেটি ভারতের বর্তমান বা দীর্ঘমেয়াদি—কোনো স্বার্থেরই অনুকূলে যাবে না।
দ্য হিন্দু অবলম্বনে জুলফিকার হায়দার
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


রাজনৈতিক মতবিরোধ থেকে ইসলামবিদ্বেষ