সভ্যতার ইতিহাসে কিছু নাম এমনভাবে লেখা থাকে, যেগুলো শুধু একটি ব্যক্তিকে নয়; পুরো বিশ্বকে কাঠগড়ায় দাঁড় করায়। এপস্টেইন ফাইল ঠিক তেমনই এক আয়না, যেখানে প্রতিফলিত হয় আধুনিক বিশ্বের ক্ষমতা, নৈতিকতা ও মানবিকতার ভাঙা মুখ। এই ফাইল কোনো একক অপরাধীর গল্প নয়; এটি একটি সভ্যতার ব্যর্থতার দলিল, যেখানে রাষ্ট্র, রাজনীতি, অর্থ আর প্রভাব একসঙ্গে মিলে মানুষের শরীর ও জীবনের ওপর অধিকার দাবি করেছে।
এপস্টেইন ফাইল কোনো ষড়যন্ত্রতত্ত্ব নয়, কোনো সোশ্যাল মিডিয়ার গুজবও নয়। এটি আদালত, তদন্ত সংস্থা ও সরকারি নথির সমন্বয়ে তৈরি বাস্তব দলিল। এই নথি দেখিয়ে দেয়, কীভাবে ক্ষমতার শীর্ষে থাকা ব্যক্তিরা দীর্ঘ সময় ধরে এমন এক ব্যক্তির সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেছেন, যার বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ বারবার উঠেছে। শুধু সম্পর্কই বজায় রাখেননি, তার সব অপকর্মে সঙ্গও দিয়েছেন। এখন প্রশ্ন ওঠে, কীভাবে এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি হলো, যেখানে শিশু ও কিশোরীদের কণ্ঠস্বর চাপা পড়ে গেল আর ক্ষমতাবানদের নাম রয়ে গেল নিরাপদে?
এপস্টেইন ফাইলের পাতায় পাতায় যে নামগুলো আসে, সেগুলো শুধু পরিচিত নাম নয়, সেগুলো রাষ্ট্রক্ষমতার প্রতীক, গণতন্ত্রের মুখোশ, নৈতিকতার ভণ্ডামি। যারা বক্তৃতায় মানবাধিকার নিয়ে কথা বলে, গণমাধ্যমের সামনে নৈতিকতার পাঠ দেয়, তারাই ব্যক্তিগত পরিসরে এমন এক জগৎ গড়ে তোলে, যেখানে দুর্বল মানুষের শরীর একটি বিনোদনের বস্তু হয়ে ওঠে। এপস্টেইন ফাইল দেখিয়েছে, ক্ষমতা কীভাবে অপরাধকে ঢেকে দেয়, কীভাবে রাষ্ট্রীয় কাঠামো অপরাধীর ঢাল হয়ে দাঁড়ায়। তদন্ত ধীর হয়, অভিযোগ দুর্বল হয়, সাক্ষ্য হারিয়ে যায়। আর ভুক্তভোগীরা? তারা অপেক্ষা করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়ে, আইনের ওপর নয়; জীবনের ওপর।
গণতন্ত্রের মূল শক্তি হলো জবাবদিহি। কিন্তু এপস্টেইন ফাইল দেখায়, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে জবাবদিহি কতটা সংকীর্ণ। সাধারণ মানুষের জন্য আইন কঠোর অথচ ক্ষমতাবানদের জন্য আইন দীর্ঘ, জটিল এবং প্রায়ই অকার্যকর। এই বৈষম্যই সভ্যতার মুখে কালো দাগ। এই ফাইলগুলো পড়লে বোঝা যায়, ক্ষমতার ভাষা কতটা নির্দয়। বিমানযাত্রার লগ, ইমেইল, ডায়েরি— সবকিছু মিলে এক ভয়ংকর নেটওয়ার্কের ইঙ্গিত দেয়, যেখানে রাষ্ট্রের সীমানা কোনো বাধা নয়। ক্ষমতা এখানে আন্তর্জাতিক, অপরাধও আন্তর্জাতিক। কিন্তু বিচার? বিচার যেন সব সময়ই সীমান্তে আটকে যায়।
এই ফাইল প্রকাশের পর সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে ‘নাম’। কে কার সঙ্গে কোথায় গিয়েছিল, কে কার বিমানে উঠেছিল; এই তালিকা নিয়ে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। কিন্তু এই উত্তেজনার ভিড়ে আমরা প্রায় ভুলে যাচ্ছি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি ‘ভুক্তভোগীরা’। তাদের জীবন, তাদের মানসিক ক্ষতি, তাদের দীর্ঘ নীরব সংগ্রাম সংবাদ শিরোনামের বাইরে থেকেই যাচ্ছে। বিশ্বনেতাদের নাম যত বড় হয়, ভুক্তভোগীদের কণ্ঠ তত ছোট হয়ে আসে, এটাই এই সংকটের নির্মম দিক।
সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো, এই নথিগুলো প্রকাশ পাওয়ার পরও বাস্তব পরিবর্তনের ইঙ্গিত খুব দুর্বল। কিছু বিবৃতি, কিছু অস্বীকার, কিছু আইনি শব্দচয়ন, এই পর্যন্তই। যেন এটি একটি জনসংযোগ সংকট, কোনো মানবিক বিপর্যয় নয়। যেন ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জীবন নয়, বরং ক্ষমতাবানদের সুনামই আসল উদ্বেগ।
এই ঘটনাপ্রবাহ একটি সত্য সামনে আনে ‘বিশ্বব্যবস্থার দ্বিচারিতা’। একদিকে মানবাধিকার নিয়ে বক্তৃতা, নিষেধাজ্ঞা, নীতিকথা; অন্যদিকে নিজের ভেতরের অপরাধকে ধামাচাপা দেওয়ার প্রবণতা। এপস্টিন ফাইল সেই ভণ্ডামির মুখোশ খুলে দিয়েছে। এটি দেখিয়েছে, নৈতিকতা অনেক সময় শুধু কূটনৈতিক ভাষার অংশ হয়ে দাঁড়ায়।
ইতিহাস বলে, সব নথি শেষ পর্যন্ত কথা বলে। এপস্টেইন ফাইল সে কথাই বলছে। এটি বলছে, ক্ষমতা যদি প্রশ্নের ঊর্ধ্বে থাকে, তবে অপরাধ অনিবার্য। এটি বলছে, রাষ্ট্র যদি দুর্বলকে রক্ষা না করে, তবে রাষ্ট্র তার নৈতিক অধিকার হারায়। তাই প্রশ্ন এখন একটাই, এই ফাইল কি সত্যিই বিশ্বনেতাদের মুখোশ খুলবে, নাকি আবার ক্ষমতা সবকিছু ঢেকে দেবে? কারণ বীভৎসতা শুধু তাদের নয়, যারা অপরাধ করে। বীভৎসতা তাদেরও, যারা সব জেনেও চুপ থাকে।
লেখক : শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

