আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক অবনমনে ভারতের দায়

সাইফুল খান

বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক অবনমনে ভারতের দায়

ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক শুধু কূটনৈতিক নথি বা শীর্ষ বৈঠকের হাসিমুখে সীমাবদ্ধ কোনো বিষয় নয়। এই সম্পর্কের প্রকৃত তাপমাত্রা নির্ধারিত হয় জনগণের অভিজ্ঞতা, স্মৃতি ও ন্যায়ের অনুভূতি দিয়ে। সেই জায়গা থেকেই আজ বাংলাদেশের বড় একটি অংশ মনে করে ভারত দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের দাগি অপরাধী, রাজনৈতিকভাবে বিতর্কিত ব্যক্তি, ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি, সন্ত্রাসবাদে অভিযুক্ত কিংবা খুনের মামলার পলাতকদের আশ্রয় দিয়ে এসেছে, যা দ্বিপক্ষীয় আস্থাকে শুধুই ক্ষয় করেছে। এই ধারণা এক দিনে তৈরি হয়নি; এর পেছনে রয়েছে ধারাবাহিক অভিজ্ঞতা ও ইতিহাসের স্তর।

ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, স্বাধীনতার পরপরই বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক সহযোগিতার (যদিও ভারতের একক পলিসিতে) ভিত্তিতে শুরু হলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নিরাপত্তা ও অভ্যন্তরীণ রাজনীতির প্রশ্নে পারস্পরিক সন্দেহ জমেছে। আশির দশক থেকে সীমান্তবর্তী অঞ্চলে ভারতীয় ও ভারত সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী এবং রাজনৈতিক পলাতকদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ের অভিযোগের প্রমাণ পাওয়া যায়, যা বাংলাদেশি গণমাধ্যম ও সংসদীয় আলোচনায় নিয়মিত এসেছে। নব্বই ও দুই হাজারের দশকে একাধিক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে ঢাকা আনুষ্ঠানিকভাবে পলাতক অপরাধীদের প্রত্যর্পণের প্রসঙ্গ তোলে, কিন্তু কার্যকর প্রত্যর্পণ চুক্তির সীমাবদ্ধতা এবং রাজনৈতিক অনিচ্ছা এই ইস্যুকে ঝুলিয়ে রাখে (Bangladesh-India Joint Communiqué, 2010)। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোও দক্ষিণ এশিয়ায় আন্তঃরাষ্ট্রীয় অপরাধ ও পলাতকদের আশ্রয়কে আঞ্চলিক আস্থাহীনতার বড় কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশের জনমনে ক্ষোভের আরেকটি উৎস হলো এই উপলব্ধি যে, ভারত সম্পর্ক রক্ষায় সমতার বদলে ক্ষমতার ভাষা ব্যবহার করতে অভ্যস্ত। রাষ্ট্র ও জনগণকে একপাশে রেখে নির্দিষ্ট দলের সঙ্গে সম্পর্ক, গণতন্ত্র হত্যা, পানিবণ্টন, সীমান্ত হত্যা বা বাণিজ্য ঘাটতির মতো ইস্যুতে যখন ন্যায্যতার প্রশ্ন ওঠে, তখনই ভারত নানা ধরনের ‘চাপের রাজনীতি’ নিয়ে হাজির হয়। রাজনৈতিক সমাজবিজ্ঞানীরা বলেন, যখন কোনো রাষ্ট্র প্রতিবেশীর সার্বভৌম উদ্বেগকে গুরুত্ব না দিয়ে কৌশলগত সুবিধাকে অগ্রাধিকার দেয়, তখন সেই রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে জনমত দ্রুত নেতিবাচক হয় (Barry Buzan, Regional Security Complex Theory, 2003)।

এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি, বাংলাদেশের জনগণ ভারতবিরোধিতা চর্চা করতে আগ্রহী নয়; বরং তারা ন্যায্যতা ও পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে সম্পর্ক চায়। আজ যে ভারতবিরোধী মনোভাব দৃশ্যমান, তা কোনো আকস্মিক আবেগ নয়; এটি একটি প্রতিক্রিয়া। এই দায় এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ ভারতের নেই। যদি তারা সত্যিই দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীল সম্পর্ক চায়, তবে পলাতক অপরাধীদের প্রশ্নে স্বচ্ছতা, প্রত্যর্পণে আন্তরিকতা এবং বাংলাদেশের জনগণের ন্যায়বোধকে সম্মান করাই হবে বাস্তবসম্মত পথ। অন্যথায় শাসনের রাজদণ্ড দিয়ে সম্পর্ক ধরে রাখার যে কৌশল, তা কাগজে-কলমে টিকলেও মানুষের মনে কখনোই উষ্ণতা তৈরি করতে পারবে না।

এই বাস্তবতার সঙ্গে আরো কয়েকটি গুরুতর ইস্যু যুক্ত না করলে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের সংকটের পূর্ণ চিত্র ধরা পড়ে না। সীমান্ত হত্যা, একতরফা নদীশাসন এবং সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের অভিযোগ। এই তিনটি বিষয় বাংলাদেশের জনগণের মানসিকতায় ভারত সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণাকে আরো গভীর করেছে এবং আগের অভিযোগগুলোর সঙ্গে মিলিয়ে একটি সামগ্রিক অনাস্থার কাঠামো তৈরি করেছে।

বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে হত্যাকাণ্ড এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়, বরং এটি দীর্ঘদিনের একটি সংকট। দুই দেশের মধ্যে প্রায় চার হাজার কিলোমিটারের বেশি সীমান্তে বছরের পর বছর বাংলাদেশি নাগরিক নিহত হয়েছে। কখনো গরু ব্যবসার অভিযোগে, কখনো অবৈধ অনুপ্রবেশের অজুহাতে, আবার কখনো নিছক সন্দেহের বশে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো একে ‘বিশ্বের সবচেয়ে প্রাণঘাতী সীমান্তগুলোর একটি’ বলে আখ্যায়িত করেছে (Human Rights Watch, ‘Trigger Happy’, 2010)। বাংলাদেশের দৃষ্টিতে সমস্যা শুধু প্রাণহানির নয়; সমস্যা হলো বিচারহীনতা এবং রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে এই সহিংসতার নৈতিক স্বীকৃতি না পাওয়া। যখন একের পর এক হত্যাকাণ্ডের পরও কার্যকর জবাবদিহি দেখা যায় না, তখন তা জনগণের মনে এ ধারণাই শক্ত করে যে, ভারত বাংলাদেশকে সমান সার্বভৌম প্রতিবেশী হিসেবে দেখে না। পিলখানা ম্যাসাকার নিয়ে তদন্ত কমিশন ভারতের সংশ্লিষ্টতার যে তথ্য দিয়েছে, তা আরো ভয়াবহ। এই একটা ঘটনাই দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক চিরবৈরী করতে যথেষ্ট।

একই ধরনের বৈষম্যের অনুভূতি জন্ম নেয় দীর্ঘদিনের নদী ও পানিবণ্টন প্রশ্নে। বাংলাদেশ একটি নদীমাতৃক দেশ, যার অধিকাংশ প্রধান নদীর উজান ভারতের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত। তিস্তা, ফেনী কিংবা গঙ্গা একটির পর একটি নদীতে একতরফাভাবে বাঁধ ও ব্যারাজ নির্মাণ করে পানিপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ বহু পুরোনো। এর ফল ভাটিতে কৃষি, জীবিকা ও পরিবেশ বিপর্যয়। তিস্তা চুক্তি আজও ঝুলে আছে, যদিও দুই দেশের মধ্যে নীতিগত ঐকমত্যের কথা বহুবার বলা হয়েছে (India-Bangladesh Water Talks, 2011)।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের প্রশ্ন, যা অনেকের কাছে হয়তো অদৃশ্য মনে হলেও জনমনে এর প্রভাব গভীর। ভারতীয় টেলিভিশন চ্যানেল, বিনোদন শিল্প ও সাংস্কৃতিক পণ্যের একচেটিয়া প্রবাহ বাংলাদেশের নিজস্ব সংস্কৃতি ও ভাষাগত আত্মপরিচয়ের ওপর চাপ তৈরি করছে—এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের। মিডিয়া গবেষকরা একে ‘অসম সাংস্কৃতিক প্রবাহ’ হিসেবে ব্যাখ্যা করেন, যেখানে শক্তিশালী রাষ্ট্র তার সংস্কৃতিকে স্বাভাবিক ও প্রাধান্যশীল করে তোলে, আর অপেক্ষাকৃত দুর্বল রাষ্ট্রের সংস্কৃতি ধীরে ধীরে প্রান্তিক হয় (Herbert Schiller, Cultural Imperialism Theory)। বাংলাদেশের জনগণের বড় অংশ মনে করে, এই আগ্রাসন কোনো আনুষ্ঠানিক দখল না হলেও মানসিক ও সাংস্কৃতিক পরিসরে ঔপনিবেশিক পরাধীনতা।

এই সবকিছু মিলিয়ে একটি স্পষ্ট ছবি তৈরি হয়। দাগি অপরাধীদের আশ্রয়, সীমান্ত হত্যা, পানিবণ্টনে বৈষম্য এবং সাংস্কৃতিক চাপ—সবই একই নীতির ভিন্ন ভিন্ন প্রকাশ। এই নীতি সমতা নয়, প্রভাব বিস্তারকে অগ্রাধিকার দেয়। ফলে বাংলাদেশে ভারতবিরোধী মনোভাব কোনো রাজনৈতিক দলের কৌশল নয়; এটি সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতা ও বঞ্চনার প্রতিক্রিয়া।

এখানেই ভারতের সামনে ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তের প্রশ্ন দাঁড়িয়ে আছে। তারা কি প্রতিবেশীর ওপর ক্ষমতার ভাষা চাপিয়ে দিয়ে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে চায়, নাকি ন্যায়, সম্মান ও জনগণের অনুভূতিকে ভিত্তি করে নতুন সম্পর্ক নির্মাণ করবে? বাংলাদেশের জনগণ স্পষ্টভাবে দ্বিতীয় পথটাই প্রত্যাশা করে। এই প্রত্যাশা উপেক্ষা করলে কূটনৈতিক ঘোষণায় সম্পর্ক যতই ‘বন্ধুত্বপূর্ণ’ বলা হোক না কেন, বাস্তবে তা কখনোই উষ্ণ ও টেকসই হয়ে উঠবে না।

India-Bangladesh

ভারতকে আজ বুঝতেই হবে বাংলাদেশের মানুষের ক্ষোভ কোনো হঠাৎ আবেগ নয়, এটি দীর্ঘদিনের জমে থাকা অভিজ্ঞতার ফল। এই বাস্তবতার ভেতরেই আধিপত্যবাদবিরোধী মহান বীর শহীদ ওসমান হাদির জানাজা এক নীরব কিন্তু বজ্রকণ্ঠ বার্তা হয়ে উঠেছে। দলমত-নির্বিশেষে লাখো মানুষের চোখের জল, মানুষের ঢলে শুধু শোকের সমাবেশ নয়; এটি একটি জাতির আত্মসম্মানবোধের প্রকাশ, যা উপেক্ষা করার মূল্য ইতিহাসে চুকাতে হয়।

ভারত যদি মনে করে সীমান্তে সেনাঘাঁটি বাড়িয়ে, শক্তি প্রদর্শনের ভাষায় বাংলাদেশকে শাঁসানো যাবে। তবে তারা দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক মনস্তত্ত্ব ভুলভাবে পড়ছে। ভয়ের কূটনীতি ক্ষণস্থায়ী; তা বিশ্বাস গড়ে না, বরং বিকল্পের দরজা খুলে দেয়। সামরিক কূটনীতির মৌলিক পাঠ ভারত নিশ্চয়ই জানে। শক্তির ভারসাম্য কখনো শূন্যে থাকে না। যেখানে চাপ, সেখানেই প্রতিসম চাপের খোঁজ। এই বাস্তবতায় ‘চীন-পাকিস্তান’ বাংলাদেশের দিকে হাত বাড়িয়ে ইতোমধ্যেই বসে আছে। এটি কোনো গুজব নয়, এটি খোলা বাস্তবতা। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তুরস্কের মতো উদীয়মান শক্তি, যারা প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি, সামরিক প্রশিক্ষণ ও কৌশলগত সহযোগিতায় সক্রিয় ভূমিকা নিতে প্রস্তুত। বাংলাদেশকে এখানে জটিল কোনো কূটকৌশল দেখাতে হবে না; শুধু শক্ত করে হাত বাড়ানোই যথেষ্ট।

বাংলাদেশের অবস্থান ঐতিহাসিকভাবে পরিষ্কার। আমরা কারো উপনিবেশ নই, কারো উপগ্রহও নই। স্বাধীনতা শুধু পতাকার রঙে সীমাবদ্ধ নয়; স্বাধীনতা মানে সিদ্ধান্তের স্বাধীনতা। ভারত যদি এই বাস্তবতাকে স্বীকার করে, তবে দুই দেশের সম্পর্ক জনগণ থেকে জনগণের নতুন ভিত্তিতে পুনর্নির্মাণ সম্ভব। সেই পথে রয়েছে সীমান্তে মানবিক আচরণ, ন্যায্য পানিবণ্টন, পারস্পরিক সম্মান, বন্দি প্রত্যর্পণ ও সার্বভৌমত্বের প্রতি স্পষ্ট সম্মান। এই পথ কঠিন নয়, যদি সদিচ্ছা থাকে।

কিন্তু যদি সেই সদিচ্ছার জায়গায় ভয় দেখানোর কৌশল বেছে নেওয়া হয়, তবে ইতিহাসের স্বাভাবিক গতিই কাজ করবে। রাষ্ট্র কৌশলগতভাবে বাঁচতে চায়। এটি কোনো অপরাধ নয়। বাংলাদেশ যদি কৌশলগত সামরিক এলাই গড়তে বাধ্য হয়, তার দায় চাপানো যাবে না বাংলাদেশের কাঁধে। দায় যাবে ভারতের দিকেই, যারা প্রতিবেশীকে অংশীদার না ভেবে অধস্তন ভাবতে চেয়েছে। রাষ্ট্রের সম্পর্ক টেকে ন্যায়বোধে, ভয়ের শাসনে নয়। আজ সেই ন্যায়বোধের পরীক্ষার সময়।

বল এখন ভারতের কোর্টে। সিদ্ধান্ত ভারতের। তারা কি আধিপত্যের পুরোনো ছক আঁকড়ে ধরে দক্ষিণ এশিয়াকে আরো অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দেবে, নাকি বাস্তবতা মেনে নিয়ে সমতার ভিত্তিতে সম্পর্কের নতুন অধ্যায় লিখবে? বাংলাদেশ তার পথ জানে। ইতিহাসও জানে, যে জাতি শোককে বার্তায় রূপ দিতে পারে, তাকে চেপে রাখা যায় না। শহীদ শরীফ ওসমান হাদি জীবন দিয়ে প্রমাণ রেখে গেছে আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে বীরের মতো দাঁড়াতে হয়। শহীদ শরীফ ওসমান হাদিই আগামীর বাংলাদেশ।

লেখক : ইতিহাস, রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক বিষয় বিশ্লেষক

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন