ব্রিটেনের প্রভাবশালী ট্যাবলয়েড দ্য সানের (The Sun) সম্পাদক ছিলেন রেবেকা ওয়েড (বর্তমানে রেবেকা ব্রুকস)। সংবাদপত্রটি গার্হস্থ্য সহিংসতাসহ বিভিন্ন সামাজিক সমস্যা নিয়ে প্রচার চালিয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত। কাগজটির সম্পাদক মিস রেবেকা ডমেস্টিক ভায়োলেন্স প্রতিরোধে দেশের সেরা কণ্ঠ হয়ে পড়েছিলেন।
ঘটনাটি ২০০৫ সালের! ঘটনার দিন রাত ৩টা-৪টার দিকে পুলিশ তার নিজের বাসভবন থেকেই একটা ফোন কল পায়। রেবেকার স্বামী অভিনেতা রস কেম্প পুলিশের জরুরি নম্বরে ফোন করে সহায়তা চান। হন্তদন্ত হয়ে তিনি পুলিশকে জানান, তার স্ত্রী তাকে সম্ভবত একটি ছুরি হাতে নিয়ে তাড়া করছেন! সদাশয় পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে রেবেকাকে আটক করে। যদিও পরে তদন্তের পর তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ আনা হয়নি এবং সম্ভবত তার সামাজিক মর্যাদার কথা বিবেচনা করে তাকে মুক্তি দেওয়া হয়।
সম্প্রতি আমাদের দেশেও অনলাইনে একটি ঘটনা ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। একজন ডাক্তার দম্পতি দীর্ঘদিন ধরে দাম্পত্য সমস্যার সমাধান নিয়ে পরামর্শ দিতেন। তাদের ভিডিও ও আলোচনা বহু মানুষের কাছে জনপ্রিয় হয়েছিল। অনেকেই বিশ্বাস করতেন, তাদের পরামর্শে অসংখ্য ভাঙনের মুখে দাঁড়ানো সংসার টিকে গেছে। কিন্তু সেই পরামর্শদাতা দম্পতিই যখন নিজেদের বিয়েবিচ্ছেদের ঘোষণা দিলেন, তখন অনেক অনুসারী বিস্মিত হয়েছেন।
যারা অন্যকে পথ দেখান, তারা সবসময় নিজেদের জীবনেও সেই আদর্শ পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হন—এমন নিশ্চয়তা নেই। মানুষ উপদেশ দিতে পারেন; কিন্তু সেই উপদেশ অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করা অনেক কঠিন।
আমাদের রাজনৈতিক এবং বুদ্ধিবৃত্তিক জগৎটি এ রকম দ্বিচারিতা বা হিপোক্রেসিতে ভরে গেছে! বাপে খেদানো মায়ে তাড়ানো বাউন্ডুলে গোছের অনেকেই সাংস্কৃতিক জগতে এসে বিখ্যাত হয়েছেন। আর এর বদৌলতেই দেশের বিরাট বুদ্ধিজীবী সেজে গেছেন। তাদের বুদ্ধি ছাড়া জাতি যেন অচল! তারা আবার স্বাধীনতার চেতনাকে আঁকড়ে ধরে বুদ্ধিবৃত্তিক সন্ত্রাস কায়েম করে রেখেছেন। তারাই এখন আবার পতিত ফ্যাসিবাদকে প্রাসঙ্গিক করার প্রাথমিক কাজ শুরু করে দিয়েছেন!
আমাদের মোরাল ব্রিগেডে সাংস্কৃতিক এবং বিনোদন জগতের সদস্যরা একটা বড় জায়গা করে নিয়েছেন। এ জগতের অনেক মাকাল ফলকে আমরা জাতির বিবেকের আসনে বসিয়ে রেখেছি! ফলে মানুষের মৌলিক গুণাবলির ধারণাটাও আমাদের এখানে এসে বদলে গেছে! যে যত চাপাবাজি এবং গলাবাজি করতে পারেন, তিনি তত বড় নেতা হন! এদেশে মুক্তিযুদ্ধের বুলি আওড়িয়ে আপনি বিলিয়ন ডলার চুরি করলেও আপনার সম্মানের হানি হবে না!
তাদের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবন অত্যন্ত কলুষিত! নারী-পুরুষ নির্বিশেষে তাদের অনেকেই এমন কাজে নিয়োজিত, যা আমাদের ধর্মের দৃষ্টিতে সর্বোচ্চ শাস্তিযোগ্য অপরাধ। যে ধর্ম তাদের এ রকম অপরাধী সাব্যস্ত করেÑসেই ধর্মের প্রতি সংগত কারণেই তারা খড়গহস্ত থাকবেন! আমাদের বোধ বিশ্বাসের বিরোধিতা করতে গিয়ে তারা আমাদের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশটিরও বিরোধী বনে গেছেন! বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় তাদের কেউ কেউ রাষ্ট্রের জন্য রীতিমতো সিকিউরিটি থ্রেট হয়ে পড়ছেন!
মেহের আফরোজ শাওন July CDI লিখে জাতির কলিজায় আঘাত দিয়েছেন। তারপরও রাষ্ট্র তার বিরুদ্ধে কোনো অ্যাকশন নিতে পারছে না। কারণ শাওন দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় লেখক হুমায়ূন আহমেদের বিধবা! শাওন একজন সুশীল ঘরানার রমণী! যে সুশীলরা শরীফ ওসমান হাদির একটি উচ্চারণ নিয়ে বলতেন, আমাদের ছেলেমেয়েরা এই শব্দটি সম্পর্কে জানতে চাইলে আমরা কী জবাব দেব? এখন সেই মতলববাজদের কাছে বাচ্চারা আর জানতে চাইবে নাÑCDI মানে কী? এই হলো মতলববাজ সুশীল নৈতিকতা!
লেখক হুমায়ূন আহমেদ উপন্যাস ও নাটকে মধ্যবিত্ত মানুষের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না এবং মানসিক টানাপোড়েন এমনভাবে ফুটিয়ে তুলতেন যে পাঠক ও দর্শক নিজেদের জীবনকেই সেখানে খুঁজে পেতেন। তার সৃষ্ট চরিত্রগুলো সাধারণ মানুষের প্রতিনিধি হয়ে ওঠে এবং সমাজের নানা অসংগতি, মূল্যবোধ ও মানবিক দিক সম্পর্কে নতুনভাবে ভাবতে উদ্বুদ্ধ করে।
এভাবেই হুমায়ূন আহমেদ তার সাহিত্য ও নাট্যকর্মের মাধ্যমে বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত সমাজকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছেন এবং বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে এক অনন্য স্থান অধিকার করেছেন।
অল্পবয়স্ক কিশোরী থেকে মধ্যবয়স্ক গৃহিণীÑসবাই তার গল্প পড়তে পড়তে বালিশ ভিজিয়ে ফেলতেন! তিনি একবার তার কোনো এক গল্পের নায়কের মুখ দিয়ে ঠাট্টার ছলে বলান, মেয়েদের মগজের ওজন পাঙাশ মাছের ওজনের কাছাকাছি। তিনি নারী সমাজের কাছে এতটাই প্রিয় ছিলেন যে এ রকম ভয়ংকর কথা লেখার পরও দেশের সচেতন নারী সমাজ এটি নিয়ে মাইন্ড করেননি! হুমায়ূন আহমেদ ছাড়া অন্য দ্বিতীয় কোনো পুরুষ এ কথাটি বললে খবর হয়ে যেত।
হুমায়ূন আহমেদ তার বিভিন্ন লেখার ফাঁকে ফাঁকে নিজের স্ত্রী গুলতেকিন এবং নিজের সন্তানদের কথা তুলে ধরতেন। এতে তার লেখা বোরিং না হয়ে আরো হৃদয়গ্রাহী হয়ে পড়ত। প্রিন্সিপাল ইব্রাহীম খাঁর নাতনি গুলতেকিনকেও দেশের মানুষ অত্যন্ত আপন করে নেয়। হুমায়ূন-গুলতেকিন দম্পতি একটি চিরন্তন আদর্শ দম্পতি হিসেবে এবং হুমায়ূন পরিবারটি একটি ছিমছাম আদর্শ পরিবার হিসেবে আপামর জনগণের মনে স্থান করে নেয়! হুমায়ূন আহমেদের অনেকগুলো গল্পের নায়িকার বাস্তব ছবি বলে ধরে নিত এই গুলতেকিনকে। হুমায়ুন আহমেদের নারীচরিত্র সৃজনে গুলতেকিনের একটা ভূমিকা ও প্রচ্ছন্ন প্রভাব রয়েছে বলে অনেক পাঠকই ধারণা করতেন।
সেই হুমায়ূন আহমেদ যখন সেই ত্রিশ বছরের সংসারকে তছনছ করে তার ছোট মেয়ের বান্ধবীকে বিয়ে করার ঘোষণা দিলেনÑতা শুনে পুরো দেশ স্তব্ধ হয়ে পড়ে!
যেদিন এই সংবাদটি ব্রডকাস্ট হয়, সেদিন আমি ছিলাম আমার মেরিন একাডেমির এক ব্যাচমেটের বাসায়। আমার সেই ব্যাচমেটের স্ত্রী ‘সাগর-রুনি’ ট্র্যাজেডির রুনির আপন খালা। সেই ভাবির প্রতিক্রিয়া দেখলে মনে হচ্ছিল ঘটনাটি তার নিজের জীবনে ঘটে গেছে। সেই ভাবি হুমায়ূন আহমেদের ওপর রাগটি তার সামনে উপস্থিত বেচারা দুই পুরুষের ওপর ঝাড়লেন। বন্ধু-স্ত্রী অত্যন্ত কাতর কণ্ঠে বললেন, ‘ভাই আজ থেকে আমি দুনিয়ার কোনো পুরুষকেই বিশ্বাস করি না।’ ভাবি পুরুষ শব্দটির সঙ্গে ‘ই’ প্রত্যয়টি এমন শক্তভাবে উচ্চারণ করছিলেন যে তাতে মনে হলো রুমে উপস্থিত আমার ছোট ছেলেটিকেও এই পুরুষকুল থেকে বাদ দেননি! কোনো দোষ না করেও দোষের ভাগী হতে হবেÑএকমাত্র পুরুষ হওয়ার কারণে! হায় রে কপাল!
চরিত্র যে মানুষের জীবনে একটা বড় সম্পদÑএটি আমরা অনেকেই স্বীকার করতে চাই না। অথচ এর মিষ্টি ফল আমরা সবাই আস্বাদন করতে চাই!
কারণ হুমায়ুন আহমেদের মতো লেখকরা তাদের কলমে কিংবা সৃষ্টিতে ভালোবাসাকে যেভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন, তার লাখো ভাগের একভাগও এই অধমরা—কলমে কিংবা বাস্তবে ডিসপ্লে করতে পারি না। পাটিগণিতের হিসাব অনুযায়ী আমাদের পদস্খলন আরো আগেই হওয়া উচিত। কিন্তু মানব রসায়নের এই হিসাবটি পাটিগণিতের নিয়মে হয় না। হয় জ্যামিতির নিয়ম অনুসারে! সেখানেই বোধ হয় আমরা বেঁচে গেছি!
আমাদের সামাজিক জীবনে হোক বা রাজনৈতিক জীবনে হোকÑসব মন্দকাজের শুরু হয়েছে এই আওয়ামী লীগের হাত ধরে! আমাদের সমাজে উঁচু ক্লাস এবং নিচু ক্লাসে পারিবারিক ডিসিপ্লিন মাঝেমধ্যে একটু শিথিল হলেও মধ্যবিত্ত শ্রেণি এটি শক্তভাবে ধরে রাখেন! নিজের মেয়ের বান্ধবীকে নিজের মেয়ে হিসেবে দেখার মতো আমাদের মধ্যবিত্তের এই মূল্যবোধটিকে চরমভাবে এখানে ধাক্কা দেওয়া হয়েছে! ইঁচড়ে পাকা শাওন নিজের বান্ধবীর বাবার সঙ্গে এ রকম সাহস ও উৎসাহটি আসলে কোত্থেকে পেল?
শাওনের মা হলেন আওয়ামী লীগের নেত্রী, মহিলা কোটায় সাংসদও হয়েছিলেন। আর সেই বিয়ের উকিল বাপ হয়েছিলেন আরেক ঠান্ডা মাথার খুনি আসাদুজ্জামান নূর। ওই সময়টিতে হুমায়ূন আহমেদের নাটকের সব গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে এই নূর অভিনয় করতেন। কাজেই নন্দিত নরকের স্রষ্টার শিথিল নফসকে কাবু করতে মানুষরূপী এই শয়তানের ওয়াসওয়াসা যে কাজ করেছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই!
সম্ভবত হুমায়ূন আহমেদের বিশাল সম্পত্তি হাতিয়ে নেওয়ার একটা লোভ যেমন মা-মেয়ের মনে কাজ করেছিল, তেমনি জনগণের আবেগের ওপর অবিশ্বাস্য নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠাকারী একজন ট্যালেন্টের রাজনৈতিক ব্যবহারও নূরদের পরিকল্পনায় আগেভাগে থাকলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।
১৯৬৭ সালের আরব ইসরাইল যুদ্ধের আগে মোসাদের গোয়েন্দা তৎপরতা দেখে সারা বিশ্ব চমকে ওঠে। চল্লিশ ও পঞ্চাশের দশকে বিভিন্ন আরব দেশ থেকে তরুণ মিলিটারি অফিসারদের ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ট্রেনিংয়ে পাঠানো হতো। আর এদেরই টার্গেট করে মোসাদ! নজরকাড়া ইসরাইলি সুন্দরীদের বা মেডিটারনিয়ান বিউটিদের এসব তরুণ অফিসারের পেছনে লাগিয়ে দেওয়া হয়। এই মেয়েদের কেউ কেউ বিয়ে-সাদি করে সেই অফিসারদের সঙ্গে ঘর-সংসার করেছিলেন। অনেকের সন্তান-সন্ততিও হয়ে যায়। কোনো কোনো আরব জেনারেলের স্ত্রী যুদ্ধের পর সন্তান-সন্ততি এবং স্বামীকে রেখে পালিয়ে যায়। তখন মোটা মাথার আরবরা টের পায় যেÑতারা ছিলেন মূলত মোসাদের নিয়োগকৃত স্পাই!
হুমায়ুন আহমেদের জীবনে বসন্তের কোকিল হয়ে আসা এই মেহের আফরোজ শাওনকে আওয়ামী ইকোসিস্টেম এক সন্ন্যাসিনী রূপে হাজির করার চেষ্টা করছে। অত্যন্ত সংবেদনশীল মন ও তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ ক্ষমতাসম্পন্ন হুমায়ূন আহমেদ যদি আমেরিকা থেকে সুস্থ হয়ে ফিরতে পারতেন, তবে এই শাওনের কীর্তি-কাহিনি নিয়ে তার জীবনের শ্রেষ্ঠ উপন্যাসটি লিখতে পারতেন! আমার মনে হয় এই কাজটি তিনি অবশ্যই করতেন। কারণ নিজের সহোদর যখন মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বেশি লাফালাফি শুরু করেছিলেন, তখন তা কমাতে ৭১-এ জাফর ইকবালের গর্তবাসের কাহিনি লিক করে দিয়েছিলেন।
শাওনের বর্তমান কার্যক্রম বিশ্লেষণ করলে আমরা মোসাদের সেই স্পাইদের সঙ্গে মেলাতে পারব । গৌরবের জুলাই যার মাধ্যমে জাতি ইতিহাসের জঘন্যতম স্বৈরশাসক এবং একটি সাইকোর হাত থেকে মুক্তি পেয়েছে, সেই জুলাইকে জঘন্যতম ভাষায় অপমান করেছে এই পাষণ্ড মহিলা! তার জীবনের ঘটনা প্রবাহ নিয়ে বিষদ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।
লেখক : কলামিস্ট
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


