আপনাদের আজ আমেরিকার সান ফ্রান্সিসকো শহরের এমন এক গল্প শোনাব, যা আমার নিজের কাছেই এখনো এক সুন্দর স্বপ্ন বলে মনে হচ্ছে। কিছু শহর থাকে, যা শুধু চোখের দেখা নয়, মনের গভীরে দোলা দেয়। প্রশান্ত মহাসাগরের কোল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা সান ফ্রান্সিসকো তেমনি এক মায়াবী শহর। পাহাড়ি আঁকাবাঁকা, উঁচু-নিচু খাড়া রাস্তা, ঐতিহাসিক ট্রাম আর ভিক্টোরিয়ান স্থাপত্যের এই শহরে যখন পা রাখলাম, তখন শহরটি রুপালি কুয়াশায় ঢাকা। কিন্তু আমাদের এই শহর দর্শন সাধারণ উপায়ে ছিল না। আমাদের সঙ্গী ছিল এক জাদুকরী বাহন। মানুষ ছাড়া নিজেই চলা এক চালকবিহীন গাড়ি। ভবিষ্যতের পৃথিবী কেমন হবে—এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে এখন আর কল্পবিজ্ঞান পড়ার প্রয়োজন নেই। গাড়ির পেছনের সিটে আরাম করে বসে যখন জানালার বাইরে তাকালাম, তখন শহরটিকে কল্পবিজ্ঞানের সিনেমা বলেই মনে হচ্ছিল। চালকের আসনে কেউ নেই, অথচ স্টিয়ারিং হুইলটি কোনো অদৃশ্য জাদুকরের ইশারায় নিখুঁতভাবে ঘুরে চলেছে। গাড়িটি আমাদের নিয়ে চলল সান ফ্রান্সিসকোর বিখ্যাত সব পর্যটন স্পটে। অবাক হয়ে দেখছি, যা আমার কল্পনার সীমানাকেও ছাড়িয়ে গেছে।
আমরা চড়েছিলাম এ শহরের সবচেয়ে আধুনিক প্রযুক্তির চালকবিহীন গাড়ি ‘ওয়েমো ওয়ান’ (Waymo One)-এ। স্মার্টফোন অ্যাপের মাধ্যমে গাড়ি বুক করতেই চোখের সামনে এসে হাজির হলো একটি ঝকঝকে আধুনিক গাড়ি। এক অদ্ভুত রোমাঞ্চ আর হালকা উৎকণ্ঠা নিয়ে আমরা চালকবিহীন এই গাড়িতে চড়ে বসলাম।
গাড়ির দরজা আনলক করে ভেতরে বসার পর সামনের সিটের পেছনে থাকা স্ক্রিন সচল হয়ে উঠল। স্ক্রিনে প্রথমেই ভেসে ওঠে আমার নাম। একটি মিষ্টি নারী কণ্ঠে (অডিও) স্বাগত জানিয়ে ইংরেজিতে বলা হলো, যা বাংলা করলে দাঁড়ায়, ‘হ্যালো আপনাকে ওয়েমো রাইডে স্বাগতম। যাত্রা শুরু করার আগে অনুগ্রহ করে আপনাদের সিটবেল্ট বেঁধে নিন’। এরপর স্ক্রিনের অ্যানিমেশন বদলে যায়। সেখানে লেখা ওঠে ‘রেডি টু গো’। স্ক্রিনের বাটনে চাপ দিতেই লেখা ভেসে ওঠে আমাদের গন্তব্য, যে জায়গাগুলোয় যেতে আমরা অ্যাপে লিখে দিয়েছিলাম তার নাম।
গাড়িটিতে চারজনের বেশি যাত্রী ওঠা যায় না। গাড়ির ভেতরে কোনো চালক নেই। চালকের আসনটি সম্পূর্ণ ফাঁকা। চালকের পাশের আসনটিতে একজন যাত্রী বসা যায়। পেছনে তিনটি আসন। কোনো মানুষের ছোঁয়া ছাড়াই, সম্পূর্ণ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আর সেন্সরের ওপর ভরসা করে যখন আমাদের স্বপ্নের সওয়ারি ‘ওয়েমো’ এগিয়ে চলে, তখন মনে হচ্ছিল, কোনো দক্ষ পেশাদার চালক যেন গাড়ি চালাচ্ছেন। এ সময় জানালার বাইরে তাকিয়ে আমাদের মনে হচ্ছিল, আমরা কোনো কল্পবিজ্ঞানের সিনেমা দেখছি কিংবা টাইম মেশিনে চড়ে ভবিষ্যতের পৃথিবীতে চলে এসেছি। আমাদের ‘ওয়েমো ওয়ান’ গাড়িটি অত্যন্ত দক্ষ এবং ভদ্র একজন চালকের মতো শহরের আঁকাবাঁকা ও ব্যস্ত রাস্তাগুলো পেরিয়ে যাচ্ছিল। ট্রাফিক সিগন্যাল মানা, পথচারীদের জায়গা দেওয়া কিংবা নিখুঁতভাবে লেন পরিবর্তন করা—সবকিছুই ঘটছিল স্বয়ংক্রিয়ভাবে। গাড়ির ভেতরের পরিবেশ ছিল অত্যন্ত শান্ত ও আরামদায়ক। এ সময় সান ফ্রান্সিসকো শহরটিকে জাদুকরী মনে হচ্ছিল। লক্ষ করলাম, এক অদৃশ্য জাদুকরের মতো গাড়ির স্টিয়ারিং হুইলটি নিজে নিজেই ঘুরছে। যেহেতু কোনো চালক নেই, তাই যাত্রীদের মানসিক প্রশান্তি দিতে গাড়িটি চলার সময় স্ক্রিনের ওপরের অংশে একটি স্থায়ী মেসেজ লেখা—‘ড্রাইভিংয়ের ভবিষ্যৎ অভিজ্ঞতা নিচ্ছেন’। এর পাশাপাশি স্ক্রিনে চারপাশের থ্রি ডি লাইভে দেখাচ্ছে—রাস্তায় কোনো পথচারী, সাইকেল বা অন্য গাড়ি যাচ্ছে, তা কার্টুন বা থ্রিডি অবজেক্ট হিসেবে। নড়াচড়া দেখে যাত্রীরা বোঝেন, গাড়িটি সবকিছু দেখতে পাচ্ছে। আমাদের প্রথম গন্তব্য ছিল ক্যান্ডলস্টিক পার্কের পাশে। ওয়েমো নির্ধারিত জায়গায় এসে থামে। ঘোষণা আসে—‘আমরা আপনার প্রথম গন্তব্যে পৌঁছে গেছি। গাড়ি থেকে নামার আগে অনুগ্রহ করে চারপাশ দেখে নিন।’
আমাদের দ্বিতীয় গন্তব্য ছিল সান ফ্রান্সিসকোর বিখ্যাত ‘গোল্ডেন গেট ব্রিজ’। কুয়াশার চাদর ফুঁড়ে যখন গাঢ় লালচে কমলা রঙের সেই বিশাল সেতুটি চোখের সামনে ভেসে উঠল, বুকের ভেতরটা এক অদ্ভুত রোমাঞ্চে শিউরে উঠল। ১৯৩৭ সালে উদ্বোধনের পর থেকে মানুষের প্রকৌশল বিদ্যার এক অমর কীর্তি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে সান ফ্রান্সিসকোর এই গোল্ডেন ব্রিজ। রুপালি কুয়াশার বুক চিড়ে যখন গাড়িটি সেতুর উপর দিয়ে মসৃণ গতিতে এগিয়ে যাচ্ছিল, নিচে প্রশান্ত মহাসাগরের নীল জলরাশি আর উপরের মেঘের আনাগোনা এক স্বর্গীয় পরিবেশ তৈরি করেছিল। মানুষের তৈরি এই সেতু এবং মানুষের তৈরি চালকবিহীন গাড়ি দুই যুগের দুই শ্রেষ্ঠ প্রযুক্তির এক অদ্ভুত মিলন ঘটল এখানে। ‘ওয়েমো ওয়ান’ শহরের মানুষের কাছে পরিচিত ‘রোবোট্যাক্সি’ নামে, যেন এক শান্ত পথপ্রদর্শকের মতো আমাদের সেই সৌন্দর্য উপভোগ করার সুযোগ করে দিচ্ছিল।

সেতু দেখার পর গাড়িটি আমাদের নিয়ে গেল শহরের আরো কিছু আকর্ষণীয় জায়গায়। আঁকাবাঁকা এবং পৃথিবীর সবচেয়ে খাড়া রাস্তা হিসেবে পরিচিত ‘লম্বার্ড স্ট্রিট’-এর দুই পাশের রঙিন ফুলের বাগান দেখতে দেখতে যখন গাড়িটি নিচে নামছিল, মনে হচ্ছিল আমরা কোনো রোলার কোস্টারে চড়েছি, তবে অত্যন্ত নিরাপদে। এরপর গাড়িটি আমাদের নিয়ে গেল ‘ফিশারম্যান ওয়ার্ক’-এ, যেখানে সমুদ্রের হাওয়া আর সি-লায়নদের ডাক আমাদের মুগ্ধ করেছে। একসময়ের ব্যস্ত এই মাছ ধরার বন্দরটি এখন ইতিহাস আর বিনোদনকেন্দ্র। ডকের উপর রোদ পোহানো অসংখ্য সি-লায়ন বা সামুদ্রিক সিংহ দেখতে সারা বিশ্বের পর্যটকরা এখানে ভিড় করেন।
রোবোট্যাক্সি ওয়েমোতে করে ঘুরতে ঘুরতে আমরা সান ফ্রান্সিসকো শহরের ঐতিহাসিক ক্যাবল কার, আলকাট্রাজ দ্বীপ, ভিক্টোরিয়ান স্থাপত্য ও পেইন্টেড লেডিস, চায়না টাউন সম্পর্কে জানলাম। ১৮৭৩ সাল থেকে সচল থাকা ক্যাবল কারগুলো বিশ্বের একমাত্র হাতে চালিত ঐতিহাসিক ট্রাম সিস্টেম। শহরের খাড়া পাহাড়ি রাস্তায় এই কারে চড়ে ঘুরে বেড়ানো যেন সরাসরি উনিশ শতকে ফিরে যাওয়ার মতো এক রোমাঞ্চকর অনুভূতি।
সান ফ্রান্সিসকো উপসাগরের বুকে অবস্থিত ‘অ্যালকাট্রাজ দ্বীপ’টি একসময় ছিল আমেরিকার সবচেয়ে সুরক্ষিত সামরিক ও ফেডারেল কারাগার। আল ক্যাপোনের মতো কুখ্যাত অপরাধীরা এখানে বন্দি ছিল। মাফিয়া ডন আল ক্যাপোন ১৯২০-এর দশকে শিকাগো শহরের অপরাধজগৎ নিয়ন্ত্রণ করত। সেই দ্বীপ কারাগারটি আজ এক রহস্যময় ও আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্র।
ওয়েমো থেকে দেখলাম আলালমো স্কয়ার পার্কের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা উনিশ শতকের রঙিন ভিক্টোরিয়ান বাড়িগুলো শহরের আভিজাত্যের প্রতীক। স্থানীয়রা ভালোবেসে একে ডাকে ‘পেইন্টেড লেডিস’। সান ফ্রান্সিসকোর চায়না টাউনটিও চমৎকার। এটি এশিয়ার বাইরে বিশ্বের সবচেয়ে প্রাচীন চায়না টাউন। ১৮৪০-এর দশকে গড়ে ওঠা এই পাড়ায় ঢুকলেই মনে হবে যেন আমেরিকার বুক থেকে প্রাচীন চীনের কোনো ঐতিহ্যবাহী বাজারে চলে এসেছি।
সান ফ্রান্সিসকো শহরে প্রযুক্তির চরম উৎকর্ষ উপভোগ করতে আমাদের পকেট থেকে দু-দফায় ৩০ ডলার করে ৬০ ডলার খরচ হলো ট্যাক্সসহ। পুরো ভ্রমণ শেষে রোবোট্যাক্সি ওয়েমো আমাদের নামিয়ে দিল একটি শান্ত, সবুজ পার্কের পাশে। স্বয়ংক্রিয়ভাবে দরজা খুলে গেল। স্ক্রিনে ভেসে উঠল লেখা এবং নারী কণ্ঠে ঘোষণা—‘চার পাশ দেখে নামুন। আপনার সব জিনিসপত্র সঙ্গে নিয়েছেন কি না, তা নিশ্চিত করুন। ওয়েমোর সঙ্গে ভ্রমণ করার জন্য আপনাদের ধন্যবাদ।’
হলিউডের বিখ্যাত সায়েন্সফিকশন চলচ্চিত্র ‘টোটাল রিকল’ কিংবা ‘ব্লেড রানার’-এ মানুষ ছাড়া গাড়ি একা একা চলার দৃশ্য দেখানো হয়েছিল। রুপালি পর্দার দর্শকরা একে শুধুই অবাস্তব কল্পনা বলে ধরে নিয়েছিলেন। কিন্তু ২০২৬ সালে সান ফ্রান্সিসকোর ব্যস্ত রাজপথে সেই কল্পবিজ্ঞানই এখন নিত্যদিনের চিত্র। ওয়েমো গাড়ির চালকের আসনে কেউ নেই, ফাঁকা স্টিয়ারিং হুইলটি যখন নিজে নিজেই ডানে-বামে ঘোরে, সেই দৃশ্য কল্পকাহিনির চেয়েও বেশি রোমাঞ্চকর বলে আমাদের মনে হয়েছে।
প্রযুক্তির অপূর্ব শহর
সান ফ্রান্সিসকো আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের এক অনন্য এবং ঐতিহাসিক শহর। চমৎকার ভৌগোলিক অবস্থান, বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি আর প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের জন্য শহরটি বিশ্বজুড়ে পরিচিত। এটি সিলিকন ভ্যালির প্রবেশদ্বার। বিশ্বপ্রযুক্তির রাজধানী। অ্যাপল, গুগল, মেটা এবং এনভিডিয়ার মতো টেক জায়ান্টদের কেন্দ্রবিন্দু। নতুন প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন এবং এআই স্টার্টঅ্যাপের জন্য এ শহরটি সারা বিশ্বের তরুণ উদ্যোক্তাদের এখন প্রধান আকর্ষণ।
সান ফ্রান্সিসকোর ইতিহাস যেমন নাটকীয়, তেমনি এর ঐতিহ্যও বর্ণিল। ১৭৭৬ সালে স্প্যানিশদের হাত ধরে এ শহরের পত্তন হয়। ১৮৪৮ সালে ‘ক্যালিফোর্নিয়া গোল্ডরাশ’ বা সোনা খোঁজার হিড়িক এই শহরের ভাগ্য রাতারাতি বদলে দেয়। শহরটি পরিণত হয় বিশ্বের অন্যতম বন্দরে। ১৯০৬ সালে বিধ্বংসী ভূমিকম্পে শহরটি ধ্বংস হয়ে গেলেও ফিনিক্স পাখির মতো আবার জেগে ওঠে।
শহরটি তার খাড়া এবং আঁকাবাঁকা রাস্তার জন্য পরিচিত। বিশেষ করে, শহরের ‘লম্বার্ড স্ট্রিট’, বিশ্বের সবচেয়ে আঁকাবাঁকা রাস্তা হিসেবে বিখ্যাত। রাস্তাটির দুই পাশের রঙিন ফুলের বাগানের সৌন্দর্যে চোখ জুড়িয়ে যায়। পাহাড়ি রাস্তায় যাতায়াতের জন্য শহরটিতে এখনো ঐতিহ্যবাহী ক্যাবল কার ব্যবহৃত হয়, যা পর্যটকদের জন্য এক দারুণ অভিজ্ঞতা। এখানকার আবহাওয়ার বড় বৈশিষ্ট্য হলো গ্রীষ্মকালেও হঠাৎ চলে আসা ঘন কুয়াশা, স্থানীয়রা যাকে ভালোবেসে ‘কার্ল দ্য ফগ’ নামে ডাকেন। গোল্ডেন গেট ব্রিজ এই শহরের বড় প্রতীক। গাঢ় লালচে কমলা রঙের ঝুলন্ত সেতুটি পৃথিবীর অন্যতম সুন্দর এবং জনপ্রিয় দর্শনীয় স্থান। ‘আলকাট্রাজ দ্বীপে’র একসময়ের কুখ্যাত কারাগারটি এখন পর্যটনকেন্দ্র। এশিয়ার বাইরে সান ফ্রান্সিসকোর চায়না টাউনটি বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন এবং বৃহত্তম চীনা বসতি। লাল লণ্ঠন আর ঐতিহ্যবাহী খিলানগুলো দেখে মনে হলো যেন আমরা প্রাচীন চীনে চলে এসেছি। শহরটিতে বিশ্বমানের রেস্তোরাঁ রয়েছে। সামুদ্রিক মাছের নানা পদের খাবার এবং বিখ্যাত ‘সাউরডো’ রুটির জন্য রেস্তোরাঁগুলো বিখ্যাত। শহরের আলালসো স্কয়ার পার্কের পাশে দাঁড়িয়ে আছে উনিশ শতকের রঙিন ভিক্টোরিয়ান বাড়িগুলো, স্থানীয়দের ভাষায় ‘পেইন্টেড লেডিস’। শহরের সাগর সৈকতে রোদ পোহাতে যে ‘সি লায়ন’ দেখা যায়, এগুলো মূলত ক্যালিফোর্নিয়া সি-লায়ন। সান ফ্রান্সিসকো ছাড়াও মন্টেরে, সান্তা ক্রুজ এবং লস অ্যাঞ্জেলেস সৈকতেও এদের দেখা যায়। খুব কোলাহলপ্রিয় এই ‘সি লায়ন’ ডকের ওপর একে অন্যকে ধাক্কাধাক্কি করে, সাগরে ঝাঁপ দিয়ে সাঁতার কাটে, ডুব দেয় এবং অনবরত উচ্চ শব্দে ডাকাডাকি করে। সি-লায়নগুলো রোদ পোহাতেই বেশি পছন্দ করে, জীববিজ্ঞানের ভাষায় একে ‘হলিং আউট’ বলা হয়। গ্রীষ্মের শুরুতে এরা ক্যালিফোর্নিয়ার চ্যানেল আইল্যান্ডসে বংশবৃদ্ধির জন্য চলে যায়।

একনজরে চালকবিহীন গাড়ি
এমন চমৎকার সান ফ্রান্সিসকো শহরটি বর্তমানে বিশ্বের চালকবিহীন গাড়ির বড় কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) মেশিন লার্নিং এবং একঝাঁক উচ্চ প্রযুক্তির সেন্সরের সাহায্যে গাড়িগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে শহরের ব্যস্ততম রাস্তায় বুক ফুলিয়ে চলাচল করছে। এই গাড়ির ছাদে ও চারপাশে অসংখ্য ক্যামেরা, লেজারভিত্তিক লিডার এবং রাডার বসানো থাকে। এগুলো চার পাশের রাস্তা, পথচারী, ট্রাফিক সিগন্যাল এবং অন্যান্য যানবাহনের একটি নিখুঁত ত্রিমাত্রিক (থ্রি-ডি) মানচিত্র তৈরি করে। ট্রাফিক লাইটের রঙ পরিবর্তন, ট্রাফিক আইন এবং পথচারীদের গতিবিধি নিখুঁতভাবে নজরদারি করে। গাড়ির ভেতরের মূল কম্পিউটারটি প্রতি সেকেন্ডে অসংখ্য ডেটা প্রসেস করে সিদ্ধান্ত নেয় কখন ব্রেক চাপতে হবে, কখন ইউটার্ন নিতে হবে বা গতি বাড়াতে হবে। উবার বা পাঠাওয়ের মতো অ্যাপের মাধ্যমে এই গাড়ি বুক করা যায়। গাড়ির ভেতরে যাত্রীরা স্ক্রিন ছুঁয়ে পছন্দমতো গান শোনা এবং তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন।
চালকবিহীন গাড়িগুলোর মধ্যে গুগলের মূল প্রতিষ্ঠান অ্যালফাবেটের মালিকানাধীন ওয়েমো বর্তমানে শহরের সবচেয়ে জনপ্রিয় রোবোট্যাক্সি। এগুলো হচ্ছে সাদা রঙের প্রিমিয়াম অল ইলেকট্রিক জাগুয়ার আই-পেস গাড়ি। সাধারণ উবারের মতোই যাত্রীরা ওয়েমো ওয়ানঅ্যাপ নামিয়ে ২৪ ঘণ্টাই এই ট্যাক্সি বুক করতে পারে। একইভাবে জেনারেল মোটরসের চালকবিহীন গাড়ির নাম ক্রুজ, আমাজনের জুক্স এবং টেসলারও এ ধরনের গাড়ি রয়েছে।
একজন যাত্রী যখন এই গাড়িতে ওঠেন, তার অভিজ্ঞতা হয় রূপকথার মতো, যেমনটি সান ফ্রান্সিসকো ভ্রমণে গিয়ে আমাদের হয়েছে। অ্যাপ দিয়ে গাড়ির লক খোলার পর পেছনে বসে যখন দেখা যায় ড্রাইভিং আসনের স্টিয়ারিং হুইলটি নিজে নিজেই ঘুরছে, গাড়িটি নিখুঁতভাবে লাল বাতি দেখে থামছে এবং ট্রাফিক আইন মেনে মোড় নিচ্ছে, তখন পুরো বিষয়টিকে কোনো সায়েন্স ফিকশন সিনেমা মনে হয়। গাড়িগুলোর রাইডার সাপোর্ট টিম ব্যাক-অ্যান্ড থেকে সবসময় যাত্রীদের নিরাপত্তার ওপর নজর রাখা হয়।
তবে চমৎকার মনে হলেও চালকবিহীন গাড়িতে ভ্রমণ করতে গিয়ে যাত্রীরা কিছু সমস্যারও মুখোমুখি হন। ওয়েমোর দাবি মানুষের চালিত গাড়ির তুলনায় তাদের রোবোট্যাক্সিগুলোর প্রায় ৮৫ শতাংশ কম দুর্ঘটনার শিকার হয় এবং এগুলো বেশি নিরাপদ। যদিও ট্রাফিক জ্যাম বা ভুল জায়গায় পার্কিংয়ের জন্য ওয়েমো গাড়িগুলোকেও জরিমানা গুনতে হয়েছে। সম্প্রতি হাইওয়ের নির্মাণাধীন এলাকা চিনতে না পারার সফটওয়্যার ত্রুটির কারণে কোম্পানি তাদের প্রায় চার হাজার গাড়ি রাস্তা থেকে প্রত্যাহার করেছে সফটওয়্যার আপডেট করে, আবার তা হাইওয়েতে চলবে। অবশ্য শহরের রাস্তায় শত শত রোবোটেক্সি অনায়াসেই চলছে। তরুণরা দেখলেই গাড়ির দিকে তাকিয়ে বলছে—হাই, ওয়েমো!
লেখক : বর্তমান সরকারের প্রধান তথ্য কর্মকর্তা ও সাবেক সাধারণ সম্পাদক, জাতীয় প্রেস ক্লাব
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন



তারেক রহমানকে উষ্ণ অভ্যর্থনা আনোয়ারের