ঘোষক বিতর্ক এবং ইন্দিরা গান্ধী

আমীর খসরু
আমীর খসরু

ঘোষক বিতর্ক এবং ইন্দিরা গান্ধী

৭ মার্চের শেখ মুজিবের ভাষণ, অতঃপর

শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানের ভাষণটি ছিল মোটামুটি দীর্ঘ। এই দীর্ঘ ভাষণে তিনি নানা প্রসঙ্গ উত্থাপন করেন। এই ভাষণকে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিচার-বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মুক্তিযুদ্ধের সুস্পষ্ট কোনো রূপরেখা বা স্বাধীনতার ডাক দিয়ে ওইদিন কোনো বক্তব্য তিনি দেননি। পাকিস্তান পার্লামেন্ট কেন বসতে পারেনি, তার যোগ্য মর্যাদা না পাওয়ার দুঃখ-বেদনা এবং কীভাবে পশ্চিম কর্তৃক পূর্বকে প্রতারিত বা ঠকানো হয়েছে, সে বিষয়গুলোর বিস্তারিত বয়ান রয়েছে। তিনি হরতাল, রেলপথ বন্ধ রাখার মতো গতানুগতিক আন্দোলন-সংগ্রামের কথা বলেছেন। তিনি দীর্ঘ ভাষণ শেষ করেন এই বলে যে, ‘প্রত্যেক গ্রাম, প্রত্যেক মহল্লায় আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সংগ্রাম পরিষদ গড়ে তোলো এবং তোমাদের যা কিছু আছে, তাই নিয়ে প্রস্তুত থাকো। মনে রাখবা, রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরো দেবো। এই দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাল্লাহ! এবারের সংগ্রাম, আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। [পূর্ণ ভাষণটি সংবিধানের পঞ্চম তফসিলে দেওয়া হয়েছে]

বিজ্ঞাপন

ছাত্র-জনতা পূর্ণাঙ্গভাবে প্রস্তুত থাকা সত্ত্বেও মু্ক্তিযুদ্ধের রূপরেখা অনুপস্থিতি বা সুস্পষ্ট ঘোষণা না থাকার কারণে এক বড় ধরনের রাজনৈতিক শূন্যতা, হতাশা এবং প্রশ্নের দেখা দেয়। ৭ মার্চের ভাষণকে স্বাধীনতার ঘোষণা বলে যে দাবির কথা বলা হয়, তা কোনোক্রমেই সুস্পষ্ট না থাকায় ব্যাপক অনিশ্চয়তার সৃষ্টি হয়। বিশেষত, ছাত্রসমাজ এবং ছাত্রলীগের বিশাল এক অংশ এতে হতাশ হয়ে পড়ে।

৭ মার্চের ভাষণের মধ্যে যেসব বিষয় বলা হয়েছে, তাতে ‘সংঘাত এড়ানোর লক্ষ্যে’ যেসব বিষয় ছিল সেগুলো সম্পর্কে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। যেমন : শেখ মুজিবুর রহমান সেনাবাহিনীকে ব্যারাকে ফিরিয়ে নেওয়া, হত্যাকাণ্ডগুলোর তদন্ত, জনপ্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের বিষয়গুলো রয়েছে। সত্যিকার এবং দলনিরপেক্ষ বিশ্লেষণ করলে এ কথা বলতেই হবে-স্বাধীনতার জন্য অতি-উন্মুখ গণমানুষকে নিবৃত্ত করতেই শেখ মুজিবুর রহমান অফিস-আদালতে হরতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধর্মঘট, কালো পতাকা উত্তোলন, বেতার-টেলিভিশনে আন্দোলনকারীদের সংবাদ প্রকাশসহ কিছু বিষয় রয়েছে ওই ভাষণে।

বিশ্লেষণে দেখা যায়, ৭ মার্চের ভাষণে শেখ মুজিবুর রহমান সমগ্র জাতির নেতা হওয়ার বদলে আওয়ামী লীগের নেতা হওয়ার মধ্যেই আবদ্ধ রয়ে গেলেন! উদাহরণ হিসেবে, বক্তব্যের শেষে এসে তিনি গ্রাম, পাড়া-মহল্লায় আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সংগ্রাম পরিষদ গড়ে তোলার আহ্বান জানান। অথচ ওই ভাষণেই পরিস্থিতি পুরো উল্টো হতে পারত; যদি তিনি আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব না বলে সর্বদলীয় সংগ্রাম কমিটি বা এ ধরনের-অর্থাৎ স্বাধীনতাকামী সব দল, মতকে অন্তর্ভুক্তিমূলক যেকোনো ঐক্যবদ্ধ, সমন্বিত বা যৌথ কোনো ব্যবস্থার কথা বলতেন। কিন্তু এর বদলে তিনি পুরো জাতিকে এক কাতারে শামিল না করে বিভাজনের রাজনীতি করলেন প্রথম প্রহরেই। বিভাজনের সেই যে যাত্রা শুরু করিয়ে দেওয়া হয়, তা তৎকালীন রাজনীতিকে তো বিভক্ত ও বিভাজিত করেছেই, এখনো করছে। পরবর্তীকালে মুক্তিযুদ্ধ এবং যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশও এ থেকে রেহাই পায়নি। যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে ১৯৭১-এর ২১ এবং ২৮ ডিসেম্বর জাতীয় সরকার গঠনের যে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দেওয়া হয়, শেখ মুজিবুর রহমান ১০ এপ্রিল দেশে এসে তা সরাসরি নাকচ করার কারণে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বেই সরকার গঠিত হয়। ন্যাপ (মুজাফ্‌ফর) ওই প্রস্তাবটি দিলেও অপরাপর রাজনৈতিক দলগুলোরও এতে সম্মতি ছিল জাতীয় স্বার্থে। জনগণের মধ্যেও এমত আলোচনা ছিল।

কিন্তু একদিকে সমঝোতা, অন্যদিকে ছাত্র-জনতাসহ সমগ্র জনগোষ্ঠীর এগিয়ে যাওয়ার মাধ্যমে এক অনিশ্চয়তার পরিস্থিতির-অর্থাৎ বিভাজিত ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে যে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়, তা ছিল নেতাশূন্য অবস্থায়। অনেকে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পরের এই পরিস্থিতিকে নেতাহীন বিকেন্দ্রায়িত ব্যবস্থা বলে মনে করেন।

পর্দার অন্তরালে সমঝোতা, আলোচনা আর বাইরে স্বাধীনতা-সংগ্রামের কথা বলার এক ধরনের দ্বৈতনীতি এবং লুকোচুরির কৌশলই শেখ মুজিবুর রহমান গ্রহণ করেন বলে জেনারেল ইয়াহিয়ার মন্ত্রী এবং রাজনৈতিক উপদেষ্টা জি ডব্লিউ চৌধুরী তার বই The Last Days of United Pakistan বইয়ে উল্লেখ করেন। জনাব চৌধুরী বলেন, ‘... কিন্তু এ পর্যায়েও ইয়াহিয়া ও মুজিব পরস্পরের সাথে দূরপথের টেলিফোনের মাধ্যমে আলাপ করছিলেন। ৭ মার্চ মুজিবের জনসভার প্রাক্কালেও যখন বহুলোকই ধারণা করেছিল যে, তিনি অবশেষে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করবেন-ইয়াহিয়া মুজিবের সাথে দীর্ঘ আলাপ করেন। মুজিব ৭ মার্চে স্বাধীনতা ঘোষণা করেননি, কিন্তু তিনি জাতীয় পরিষদের বৈঠকে যোগদানের ব্যাপারে বিবেচনা করার পূর্বে চারটি শর্ত পূরণের দাবি জানান। আর ইয়াহিয়া ৬ মার্চ সিদ্ধান্ত নেন কোনো শর্ত ছাড়াই এ বৈঠক ২৫ মার্চ ঢাকায় ডাকতে। কিন্তু মুজিব এখন আর অ্যাসেম্বলিতে যোগদান করবেন না অথচ যার মুলতবির কারণেই পহেলা মার্চ হতে সবচেয়ে বিস্ফোরণোন্মুখ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। মুজিবের চারটি শর্ত ছিল : ১. অনতিবিলম্বে সামরিক আইন প্রত্যাহার করা, ২. সেনাবাহিনীর ব্যারাকে ফিরে যাওয়া, ৩. সেনাবাহিনীর আচরণের কারণে জীবননাশের ব্যাপারে বিচার বিভাগীয় তদন্ত করা এবং ৪. অনতিবিলম্বে ক্ষমতা হস্তান্তর করাÑঅর্থাৎ জাতীয় পরিষদের বৈঠক বসার বা শাসনতন্ত্র প্রণয়নের পূর্বেই।’ (তথ্যসূত্র : জি ডব্লিউ চৌধুরীর বইয়ের বাংলা অনুবাদÑ‘অখণ্ড পাকিস্তানের শেষ দিনগুলি’, হক কথা প্রকাশনী, ১৯৯১, পৃ. ১৫২)

সবকিছু জেনেও পরিস্থিতি সম্পর্কে অবগত থেকেও শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দিতে যে গড়িমসি করেন, তার প্রমাণ মেলে মুজিবনগর সরকার বা প্রবাসী সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের মেয়ে শারমিন আহমদের লেখা বইয়ে। শারমিন আহমদ লেখেন, “আব্বুর সে কারণে বিশ্বাস ছিল যে, ইতিহাসের এই যুগসন্ধিক্ষণে মুজিব কাকু কথা রাখবেন। মুজিব কাকু, আব্বুর সাথেই যাবেন। অথচ শেষ মুহূর্তে মুজিব কাকু অনড় রয়ে গেলেন। তিনি আব্বুকে বললেন, ‘বাড়ি গিয়ে নাকে তেল দিয়ে ঘুমিয়ে থাকো, পরশুদিন (২৭ মার্চ) হরতাল ডেকেছি।’ মুজিব কাকুর তাৎক্ষণিক এই উক্তিতে আব্বু বিস্ময় ও বেদনায় বিমূঢ় হয়ে পড়লেন। এদিকে বেগম মুজিব ওই শোবার ঘরেই সুটকেসে মুজিব কাকুর জামা-কাপড় ভাঁজ করে রাখতে শুরু করলেন। ঢোলা পায়জামায় ফিতা ভরলেন। পাকিস্তানি সেনার হাতে মুজিব কাকুর স্বেচ্ছাবন্দি হওয়ার এসব প্রস্তুতি দেখার পরও আব্বু হাল না ছেড়ে প্রায় এক ঘণ্টা ধরে বিভিন্ন ঐতিহাসিক উদাহরণ টেনে মুজিব কাকুকে বোঝাবার চেষ্টা করলেন। তিনি কিংবদন্তি সমতুল্য বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের উদাহরণ তুলে ধরলেন, যারা আত্মগোপন করে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করেছিলেন। কিন্তু মুজিব কাকু তার এই সিদ্ধান্তে অনড় হয়ে রইলেন। পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী আব্বু স্বাধীনতার ঘোষণা লিখে নিয়ে এসেছিলেন এবং টেপ রেকর্ডারও নিয়ে এসেছিলেন। টেপে বিবৃতি দিতে বা স্বাধীনতার ঘোষণায় স্বাক্ষর প্রদানে মুজিব কাকু অস্বীকৃতি জানান। কথা ছিল যে, মুজিব কাকুর স্বাক্ষরকৃত স্বাধীনতার ঘোষণা বিদেশি সাংবাদিকদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হবে এবং তারা আন্ডারগ্রাউন্ডে গিয়ে স্বাধীনতাযুদ্ধ পরিচালনা করবেন।”

শারমিন আহমদ আরো লিখেছেন, ‘তাজউদ্দীন যে ঘোষণা তৈরি করেছিলেন, তা-ই পরের দিন প্রচারিত হয়। আব্বুর লেখা ঐ স্বাধীনতার ঘোষণাই প্রায় হুবহু কপি পরদিন আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় প্রচারিত হয়। ...মুজিব কাকুকে আত্মগোপন বা স্বাধীনতা ঘোষণায় রাজি করাতে না পেরে রাত নয়টার দিকে আব্বু ঘরে ফিরলেন বিক্ষুব্ধ চিত্তে। আম্মাকে সব ঘটনা জানালেন। মুজিব কাকুর সঙ্গে পুরান ঢাকার পূর্বনির্ধারিত গোপন স্থানে আব্বুর আত্মগোপনে থাকার কথা ছিল। মুজিব কাকু না যাওয়াতে পূর্বপরিকল্পনা ভেস্তে যায়।’ (তথ্যসূত্র : শারমিন আহমদ, ‘তাজউদ্দীন আহমদ : নেতা ও পিতা’, ঐতিহ্য প্রকাশনী-২০১৪; পৃ. ৫৯-৬০)

একই বয়ান পাওয়া যায় মঈদুল হাসানের ‘মূলধারা ’৭১’ বইয়েও। মঈদুল হাসান বলেছেন, ‘জানুয়ারি বা সম্ভবত তার আগে থেকেই (পশ্চিম পাকিস্তান) যে সমর প্রস্তুতির শুরু করেছিল, তার অবশিষ্ট আয়োজন সম্পন্ন করার জন্য মার্চের মাঝামাঝি থেকে ইয়াহিয়া-মুজিব আলোচনার ধূম্রজাল বিস্তার করা হয়। এই আলোচনার উদ্দেশ্য সম্পর্কে যুগপৎ সন্দিহান এবং আশাবাদী থাকায় আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের পক্ষে আসন্ন সামরিক হামলার বিরুদ্ধে যথোপযোগী সাংগঠনিক প্রস্তুতি এবং ব্যবস্থা গ্রহণ করা সম্ভব হয়নি। সম্ভবত এ কারণে ২৫-২৬ মার্চের মধ্যরাতে জেনারেল টিক্কা খানের সমর অভিযান শুরু হওয়ার আগে পর্যন্ত আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব স্বাধীনতার সপক্ষে সুস্পষ্ট সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে উঠতে পারেনি। শেষ মুহূর্তে আওয়ামী লীগ নেতা এবং কর্মী যারা তার সঙ্গে দেখা করেছিলেন, তাদের নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েও তাদের সবার অনুরোধ উপেক্ষা করে সম্পূর্ণ নিজের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী শেখ মুজির রয়ে যান নিজ বাসভবনে।’ (তথ্যসূত্র : মঈদুল হাসান, মূলধারা ’৭১, ইউপিএল, সেপ্টেম্বর ২০১৬, পৃষ্ঠা-৪)

আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের পক্ষ থেকে পাকিস্তানিদের নির্মম ও বর্বর হামলার কোনো খবরাখবর না থাকলেও ভারতীয় সেনাবাহিনী ছিল এ ব্যাপারে সজাগ ও সচেতন। তারা প্রতি মুহূর্তের খবরাখবর সম্পর্কে ওয়াকিবহাল হওয়ার চেষ্টা করছিলেন। পাকিস্তানি বাহিনী যখন নিরস্ত্র বাহিনীর ওপর নির্মম হামলা চালায়, ঠিক সে সময়ে আওয়ামী লীগ নেতারা ‘নিরাপদ আশ্রয়ের’ সন্ধানে পলায়নপর ছিলেন। ভারতীয় সেনাবাহিনীর জেনারেল সুখবন্ত সিংয়ের The Liberation of Bangladesh বইয়ে এর বিস্তারিত বিবরণ পাওয়া যায়। তিনি বলছেন, ‘ধ্বংস, নির্মম হত্যালীলা, ধর্ষণ আর নির্বিচার লুটতরাজের বার্তা নিয়ে এলো শরণার্থীরা এবং জানাল এক দুঃস্বপ্নের ভেতর থেকে তারা পালিয় এসেছে।

ইতোমধ্যে চট্টগ্রাম রেডিও একজন বাঙালি অফিসার মেজর জিয়াউর রহমানের কণ্ঠসহ সরব হয়ে ওঠে। তিনি ২৬ মার্চ অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকার গঠনের কথা ঘোষণা করেন। মুক্তিযুদ্ধের সমর্থকদের জন্য এটা অবশ্যই সাদরে গ্রহণ করার সংবাদ। কিন্তু মুজিব এবং আওয়ামী লীগের উচ্চপর্যায়ের নেতাদের ভাগ্য সম্পর্কে কিছুই জানা গেল না।

২৫ থেকে ৩১ মার্চ পর্যন্ত পাকিস্তান সেনাবাহিনীর দমনমূলক কার্যক্রম সম্পর্কে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়। কেননা শরণার্থী এবং সপক্ষত্যাগী সৈন্যদের কাছ থেকে যেসব সংবাদ পাওয়া যায়, তার অধিকাংশ ছিল তাদের চৌহদ্দীর ভেতরকার। যেসব সাংবাদিক ঢাকা থেকে এসেছিলেন, তাদের পরিবেশিত সংবাদ এবং শরণার্থী-যারা কোনো রকমে পথ করে বেরিয়ে আসতে পেরেছিল, তাদের দেওয়া খবর ছাড়া অভ্যন্তর ভাগের ঘটনাবলি সম্পর্কে কিছুই জানা গেল না।’ (তথ্যসূত্র : অনুবাদ মাসুদুল হক, স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়, আনন্দ প্রকাশন, ঢাকা, ১৯৮৮, পৃ. ১৩)

এমন এক পরিস্থিতিতেই মেজর (তৎকালীন) জিয়াউর রহমান স্বাধীনতা বা মুক্তিযুদ্ধের যে ঘোষণা দিয়েছেন ২৭ মার্চ চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে-তা বেসামরিক নেতৃত্বের প্রস্তুতিহীনতা, রাজনৈতিক প্রশ্নে নেতৃত্বের দোদুল্যমানতা এবং মাঠপর্যায়ে তাদের অনুপস্থিতির কারণেই। ২৬ হোক বা ২৭ মার্চ-যাই হোক এই ঘোষণাকে ভিন্নভাবে ছোট করে দেখার বা অপব্যাখ্যার কোনো সুযোগ নেই। কারণ আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব কাউকে কিছু না বলে এবং মুক্তিকামী জনগণকে নেতৃত্ববিহীন অবস্থায় ফেলে চলে গিয়েছিলেন, তা তো সত্য।

এ সম্পর্কে একজন বিদেশি সাংবাদিকের ভাষ্য এ রকম-‘দেখা যাচ্ছে, আইন অমান্য আন্দোলনে আওয়ামী লীগের সাফল্য যতটা হওয়া উচিত ছিল, ততটা হয়নি। সর্বোচ্চ চাপ প্রয়োগ এবং সর্বনিম্ন প্রস্তুতির ত্রুটি ক্ষতিকর। ফলে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট এবং ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলসের মুষ্টিমেয় কিছু অফিসার এবং সৈন্যদের বিস্ময়কর সাহস এবং দৃঢ়তা পশ্চিম পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পুরুষদের অগ্রযাত্রাকে প্রতিহত করেছিল। তারা সেদিন বাংলাদেশকে বাঁচিয়েছিল। প্রতিটি দেশের সাহসী মানুষ তাদের স্যালুট করবে।’ (তথ্য সূত্র : অ্যান্থনি মাসকারেনহাস, রূপান্তর মাহফুজ আলম, পূর্ব পশ্চিম প্রকাশনী, ঢাকা, ২০২২ পৃ. ১২১)

তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ১৯৭১-এর ২৫ মার্চ যখন এমন পরিস্থিতিÑঅর্থাৎ মানুষ দিগবিদিক ছুটছেন, পাকিস্তান সেনাবাহিনীর নির্মম হত্যাযজ্ঞের ঘটনা একের পর এক ঘটছে। কোথায় কোথায় হত্যাযজ্ঞ ঘটেছে, তারও কোনো খবর খোদ ঢাকা শহরে বসেই সঠিকভাবে পাওয়া যাচ্ছিল না। বিশ্বের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম ২৭ মার্চ খবর দেয় পাকিস্তান আর্মি ‘অপারেশন সার্চ লাইট’ নামে নির্মম হত্যাযজ্ঞ শুরু করেছে। ২৭ মার্চ প্রভাবশালী নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনেও বিষয়টি স্পষ্ট ছিল না বলে শিরোনাম দেওয়া হয়-‘Armed Rebellion Reported’ এবং The Times-এর শিরোনাম ছিল-‘Leader of Rebels in East Pakistan Seized.’ বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবরেও একই খবর দেওয়া হয় এবং এসব সংবাদপত্রের সবাই পূর্ব পাকিস্তানে প্রকাশ্যে বিদ্রোহ শুরু হয়েছে বলে খবর প্রচার করে। কয়েকটি শহরে লড়াইয়ের খবর পাওয়া গেছে বলেও খবর ছাপা হয়।

কিন্তু অপারেশন সার্চ লাইট নামে পাকিস্তান সেনারা যে নির্মম হত্যাযজ্ঞ শুরু করেছে, সে খবর দেশবাসী জানতে পারেন অনেক পর। এমনকি ঢাকায় বিদেশি অনেক দূতাবাসেরও ছিল ঠিক একই পরিস্থিতি।

কিন্তু এর বিপরীতে বিস্ময়করভাবে ভারতের অবস্থা ছিল ভিন্নতর। তারা পুরো ঘটনার বিবরণ জানিয়ে দেয়। যার মাধ্যমেই বিশ্ব গণমাধ্যম তো বটেই, বিশ্বের নজরে আসে নৃশংস ঘটনাবলি। ভারতের এই তাৎক্ষণিকতার কথা এভাবে আলোচনা করা প্রয়োজন নানা ঐতিহাসিক কারণে।

মুক্তিযুদ্ধ : ভারতের ঘোষণা : ইন্দিরার আশ্বাস

অথচ বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়েছে বলে ২৭ মার্চ ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ওই দেশের লোকসভায় এক বিস্তারিত বিবৃতিতে বলেন, নতুন একটি ঘটনা পূর্ব পাকিস্তানে ঘটেছে এবং এটি হচ্ছে নতুন একটি গণতান্ত্রিক কার্যক্রম, যাতে পুরো জনগণ ঐক্যবদ্ধভাবে তাদের কণ্ঠ উচ্চারিত করেছে। আমরা একে স্বাগত জানাই। তাই এ কারণে নয় যে, আমরা অন্য দেশের বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতে চাই। কিন্তু এর কারণ হচ্ছে যে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের কথা একজন সংসদ সদস্য বলেছেন, সেই আদর্শের পথে আমরা আছি, আমরা এর সপক্ষে সোচ্চার।

ইন্দিরা গান্ধী বলেন, ভারত আশা করে পাশের দেশে নতুন এক পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে, যা আমাদের পারস্পরিক সম্পর্ককে আরো নিকটবর্তী করবে; যা আমাদের নিজ জনগণকে অধিকতর সাহায্য-সহযোগিতায় সক্ষম হওয়ার একটি সুযোগ তৈরিতে উপমহাদেশে নতুন এক পরিস্থিতির সৃষ্টি করবে। ভারতের পক্ষ থেকে বিবৃতিতে বলা হয়, যে ঘটনা পাকিস্তানে ঘটেছে, তা এমন কোনো বিস্ময়কর সুযোগের ঘটনা ঘটেনি, যা পাকিস্তানকে শক্তিমান করবে। বরং যা হয়েছে, তা মর্মান্তিক ও পীড়াদায়ক। আর আমাদের পক্ষে ‘ভাষায় প্রকাশের অতীত’। আবারও বলছি, এটা দুঃখজনক নতুন পরিস্থিতি। তিনি বলেন, এটা শুধুই যে দমনপীড়ন, এমনটা নয়। সেখানে নিরস্ত্র জনগণ এখন ট্যাংকের আগ্নেয়াস্ত্রের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। ইন্দিরা বলেন, আমরা গভীরভাবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি। পর্যবেক্ষণ করছি এমনভাবে, যাতে এমন পরিস্থিতিতে প্রয়োজনীয়টুকু করা যায়। এছাড়া ভারতের পার্লামেন্টে ৩১ মার্চ গৃহীত প্রস্তাবে বলা হয়, পূর্ব পাকিস্তানে যে ঘটনাবলি ঘটছে, তাতে সংসদ তীব্র উদ্বেগ এবং গভীর বেদনা প্রকাশ করছে। পশ্চিম পাকিস্তানের সেনাসদস্যরা পূর্ব পাকিস্তানের জনআকাঙ্ক্ষা এবং তাদের অভিপ্রায়কে দমন করার জন্য নিয়ন্ত্রণহীনভাবে আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছে। ভারতের সংসদ এই মর্মে জানাচ্ছে যে, পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের সংগ্রাম এবং আত্মত্যাগের প্রতি ভারতীয় জনগণের সন্দেহাতীত ও আন্তরিকভাবে সমবেদনা এবং সমর্থন থাকবে। [তথ্য সূত্র : The years of Endevour : Selected Speeches of Indira Gandhi (August 1969-August 1972); Publication Division Ministry of in formation Delhi, Page-522-525]

দুর্ভাগ্যজনক আন্তর্জাতিকভাবে পূর্ব পাকিস্তানিদের ওপর পশ্চিম পাকিস্তানের নির্মম ও নিষ্ঠুর হত্যাযজ্ঞ ও হামলার ঘটনাটি দুনিয়াজুড়ে খবর হয়ে ওঠে ভারতীয়দের মাধ্যমে। অথচ ঐতিহাসিক ঘটনাবলি বিবেচনায় এ কথা স্পষ্ট যে, ১৯৭১-এর মুক্তির যুদ্ধটি শুরু হয় রাজনৈতিক নেতৃত্বহীন অথচ জনঅংশগ্রহণে স্বতঃস্ফূর্তভাবে।

এ ক্ষেত্রে ছাত্রসমাজ দীর্ঘদিন ধরে যে ভিত্তিভূমি তৈরি ও রচনা করেছিল, তা বিশাল ভূমিকা রেখেছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এই ভিত্তি ভূমির কার্যকারিতাকে কাজে লাগিয়ে ছাত্র-তরুণসহ সাধারণ মানুষ যার নেতৃত্বে ছিলেন, সামরিক বাহিনীর সদস্য ও কয়েকজন কর্মকর্তা, তৎকালীন সীমান্তরক্ষী বাহিনী, পুলিশ ও আনসার। কেন্দ্রীয় নেতৃত্বহীন এবং বিকেন্দ্রায়িত অবস্থায় মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয় এবং এ কথা আগেও বলেছি।

এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন-নির্বাচন এবং ক্ষমতামুখী রাজনৈতিক নেতৃত্ব যখন আপস-রফায় ব্যস্ত ছিল, ঠিক তার উল্টোদিকে মূলত বামপন্থি ছাত্র ও গণসংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে স্বাধীন পূর্ববাংলা বা জনগণতান্ত্রিক পূর্ববাংলার শুধু স্লোগান নয়, সম্ভাব্য মুক্তিযুদ্ধের এবং এটি গণযুদ্ধ হবে কি না-এর রূপরেখাও প্রণীত হচ্ছিল।

এই ছোট সামান্য একটি লেখার মাধ্যমে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতিকালের প্রেক্ষাপট এবং একটি জাতিরাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্যে জনআকাঙ্ক্ষার ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অংশের বিবরণ অথবা এর ভিত্তিভূমি ও পাটাতন নির্মাণ আর তৈরির প্রচেষ্টারও কোনো কূলকিনারা খুঁজে বের করা সম্ভব নয়। বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে যে দীর্ঘমেয়াদি লড়াই, সংগ্রাম আর জনআকাঙ্ক্ষার একটি ‘ক্ষণচিত্র বা স্নাপশট’ দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে মাত্র। এখানে একটি বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, এই লেখায় ইচ্ছাকৃতভাবে পুরো আওয়ামী লীগের ভূমিকা সম্পর্কে আলোচনা করা হয়নি। এর বদলে ওই সময়ের প্রধান দল আওয়ামী লীগ এবং তার নেতৃত্ব কী করলে ভালো হতো, সে বিষয়েই আলোচনা করা হয়েছে। কারণ আলোচনা, সমালোচনা, পর্যালোচনা না করে শুধু দাবিদার কিংবা একমাত্র চেতনার ধারক-বাহক হওয়ার বিপজ্জনক দিকটাই বেশি।

ইতিহাসকে নিজস্ব গতিতে, সত্যিকার পথে, জাল, ভুয়া বয়ানের বিপরীতে সঠিক পথে চলতে না দেওয়ার যেসব বাধাবিঘ্ন সৃষ্টি করা হয়েছে নিরন্তর; আর সে কারণেই বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর ঘোষক এবং ঘোষণা নিয়ে যে দীর্ঘ বিতর্ক এবং একক মালিকানা দাবির রাজনৈতিক সংস্কৃতির যে ভয়াল থাবা ও হিংস্র রূপ দাঁড়িয়েছে, তা দুর্ভাগ্যজনক। এই স্বল্প পরিসরে ছোট নিবন্ধের মাধ্যমে বিকৃত, জাল এবং ভুয়া বয়ান এবং অপইতিহাসের বিপরীতে সত্যিকারের ইতিহাসচর্চার চেষ্টা করা হয়েছে মাত্র।

১৭৬৩-এর পরের প্রায় পৌনে দুইশ বছরের কৃষকদের লড়াই, ১৮৫৭ সালের সিপাহি সংগ্রাম থেকে শুরু করে শ্রমিক, মজুরসহ বিভিন্ন পর্যায়ের এবং ব্যক্তির একক বা যৌথ যেসব আন্দোলন, লড়াই-সংগ্রাম শুরু হয়েছিল, নানা সময়ে সেই প্রেক্ষাপটকে অস্বীকার করা যাবে না। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৪৭ এবং এর পরের অপ্রাপ্তি, বঞ্চনাবিরোধী নানা পর্যায়ের কর্মকাণ্ডের পথ হেঁটেই ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ এবং লাখো লাখো সাধারণ মানুষের জীবনদানের যৌথ, সম্মিলিত ফলই হচ্ছে আজকের বাংলাদেশ। দেশটির ইতিহাস সবার, সম্মিলিত, মিলিত ফসল আর যৌথ খামার।

ইতিহাস কখনোই এক, একক বা স্বল্পসংখ্যকের বিজয় গাথার জন্য রচিত হয় না। ইতিহাস রচিত হয় সংঘবদ্ধ, মিলিত, অবিচ্ছিন্ন, যূথবদ্ধএকত্র প্রচেষ্টার ফলে। ইতিহাসের কোনো একক মালিকানা বা দখলিস্বত্ব নেই। মনে রাখতে হবে, ইতিহাস প্রবহমান নদীর মতো, জঞ্জাল এবং আগাছা, পরগাছা ছুড়ে ফেলে দেয় প্রকৃতির নিয়মেই। যার ব্যত্যয় কখনোই ঘটবে না, ঘটেনি কখনো।

লেখক: গবেষক ও সাংবাদিক

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন