সাহাবায়ে কিরাম হেদায়াতের নক্ষত্র, তাকওয়া ও ঈমানের দীপ্তিমান তারকা, সুদীপ্ত পূর্ণিমা। রাসুল (সা.)-এর পর তারাই বহন করেছেন ইসলামের ঝান্ডা এবং উড্ডীন করেছেন পৃথিবীর প্রান্তে প্রান্তে। তাদের মাধ্যমে ইসলাম আমাদের কাছে পৌঁছেছে। এ কারণেই আমরা চিরকাল তাদের কাছে ঋণী। তারাই যুগশ্রেষ্ঠ ও সর্বোত্তম প্রজন্ম। আল্লাহতায়ালা তাদের নবীজির সহচর হিসেবে নির্বাচন করেছেন। আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী করিম (সা.) ইরশাদ করেন, ‘আমার যুগের লোকরাই সর্বোত্তম ব্যক্তি, অতঃপর যারা তাদের নিকটবর্তী। অতঃপর যারা তাদের নিকটবর্তী। এরপর এমন সব ব্যক্তি আসবে, যারা কসম করার আগেই সাক্ষ্য দেবে, আবার সাক্ষ্য দেওয়ার আগে কসম করে বসবে।’ (বুখারি : ২৬৫২)
আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-এর উক্তিটি এখানে প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেন, ‘তোমাদের মধ্যে কেউ যদি অনুসরণ করতে চায় তবে সে যেন মুহাম্মদ (সা.)-এর সাহাবায়ে কিরামের অনুসরণ করে। কারণ, তারাই ছিলেন এ উম্মতের মধ্যে আত্মার দিক থেকে সবচেয়ে বেশি নেককার, ইলমের দিক থেকে গভীরতর, লৌকিকতার দিক থেকে স্বল্পতম, আদর্শের দিক থেকে সঠিকতম, অবস্থার দিক থেকে শুদ্ধতম। তারা এমন সম্প্রদায় আল্লাহ যাদের আপন নবী (সা.)-এর সংস্পর্শধন্য হওয়ার জন্য এবং তাঁর দ্বীন কায়েমের উদ্দেশ্যে বাছাই করে নিয়েছেন। অতএব তোমরা তাদের মর্যাদা অনুধাবন করো এবং তাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করো। কারণ, তারা ছিলেন সিরাতে মুস্তাকিমের ওপর প্রতিষ্ঠিত। (মিশকাত : ১৯৩)
ইবনে মাসউদ (রা.)-এর উক্তির মর্ম হলো, নবীজি (সা.)-এর পর পৃথিবীতে অনুসরণযোগ্য কেউ থাকলে তারা হলেন সাহাবায়ে কিরাম। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্টির ঘোষণা করেছেন। আর তারাও আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট।
সমগ্র দুনিয়ার সব মানুষের নেক আমল এক করলেও সাহাবায়ে কিরাম (রা.) এক মুহূর্তের আমলের সমান হবে না। আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) বলেন, ‘তোমরা মুহাম্মদ (সা.)-এর সাহাবিদের গালমন্দ করো না। কেননা তাদের এক মুহূর্ত আমলের মর্যাদা তোমাদের সারাজীবনের আমলের চেয়ে শ্রেষ্ঠ।’ (ইবনে মাজাহ : ১৬২)
আব্দুল্লাহ ইবনে মুগাফফাল (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) ইরশাদ করেন, ‘আমার সাহাবাদের ব্যাপারে তোমরা আল্লাহকে ভয় করো, আল্লাহকে ভয় করো। আমার পরে তোমরা তাদের সমালোচনার নিশানায় পরিণত করো না। কারণ, যে তাদের ভালোবাসবে, সে আমার মুহাব্বতেই তাদের ভালোবাসবে। আর যে তাদের অপছন্দ করবে, সে আমাকে অপছন্দ করার ফলেই তাদের অপছন্দ করবে। আর যে তাদের কষ্ট দেবে, সে আমাকেই কষ্ট দেবে। আর যে আমাকে কষ্ট দিল, সে আল্লাহকেই কষ্ট দিল। আর যে আল্লাহকে কষ্ট দেবে, অচিরেই আল্লাহ তাকে পাকড়াও করবেন।’ (তিরমিজি : ৩৮৬২)
মুসলমান দাবি করে যদি কেউ তাদের গালমন্দ করে, তাদের প্রতি বিদ্বেষ রাখে, তার এই আচরণ কাফের-মুশরিকদের সঙ্গে মিলে যায়। পবিত্র কোরআনের ভাষ্যমতে, একমাত্র কাফিররাই সাহাবাদের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করে। মুসলিম হয়েও যারা সাহাবায়ে কিরামের সমালোচনা করে, তাদের বিরুদ্ধে অপবাদ দেয়, নিশ্চিত বলা যায়, তারা কাফের মুশরিকদের সাথি-সঙ্গী। আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনে সাহাবাদের ঈমানের মতো ঈমান আনতে বলেছেন। এখন যারা সাড়ে চৌদ্দশ বছর পরে এসে তাদের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, তাদের মুসলমান বলার সুযোগ আছে কি!?
মুসলমান তো তারা যারা বলে, ‘হে আমাদের রব, আমাদের ও আমাদের ভাই যারা ঈমান নিয়ে আমাদের আগে অতিক্রান্ত হয়েছে, তাদের ক্ষমা করুন এবং যারা ঈমান এনেছে তাদের জন্য আমাদের অন্তরে কোনো বিদ্বেষ রাখবেন না; হে আমাদের রব, নিশ্চয় আপনি দয়াবান, পরম দয়ালু।’ (সুরা হাশর : ১০)
সুরা ফাতাহ ২৯ আয়াতে ‘লি ইয়াগিজা বিহিমুল কুফফার’। অর্থ— ‘কাফেরদের অন্তর্দাহ সৃষ্টি হয়’ এর ব্যাখ্যায় ইমাম মালেক (রহ.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি সাহাবায়ে কিরাম (রা.)-এর প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করবে, সেও এই হুকুমের আওতায় পড়বে।’
ইমাম আবু জুর‘আ আর রাজি (রহ.) বলেন, ‘যখন আপনি কোনো ব্যক্তিকে সাহাবাদের কোনো একজনের মর্যাদাহানি করতে দেখবেন, তখন বুঝে নেবেন যে, ধর্মদ্রোহী নাস্তিক। কারণ হলো, রাসুল (সা.) সত্য, কোরআনও সত্য। আর কোরআন ও সুন্নাহ আমাদের কাছে পৌঁছিয়েছেন সাহাবায়ে কিরাম। নিশ্চয় তারা চায় আমাদের প্রমাণগুলোয় আঘাত করতে। যাতে তারা কোরআন-সুন্নাহকে বাতিল করতে পারে। এরাই ধর্মদ্রোহী-নাস্তিক। এদের খতম করে দেওয়া শ্রেয়।’ (মিনহাজুস সুন্নাহ : ১/১৮)
সাহাবাবিদ্বেষী শ্রেণি সম্পর্কে নবীজি ভবিষ্যদ্বাণী করে গেছেন, ‘শিগগিরই একদল বের হবে, যারা আমার সাহাবাদের দোষারোপ করবে, অভিযুক্ত করবে এবং গালি দেবে। সাবধান! সাবধান! তোমরা তাদের মজলিসে বসবে না, তাদের সঙ্গে পানাহার করবে না, তাদের সঙ্গে নামাজ পড়বে না এবং তাদের জন্য দোয়াও করবে না।’ (আল জামে’ লি আখলাকির রাবি ওয়া আদাবিস সামে : ১৩৫৩)
আনাস ইবনে মালেক (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) ইরশাদ করেন, ‘যে আমার সাহাবিকে গালি দেবে, তার ওপর আল্লাহ, ফেরেশতা সব মানুষের অভিশাপ। আল্লাহ তার নফল বা ফরজ কিছুই কবুল করবেন না।’ (তাবারানি : ২১০৮)
লেখক : শিক্ষক, বাইতুল আকরাম মসজিদ ও মাদরাসা কমপ্লেক্স টঙ্গী, গাজীপুর
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


গণহত্যার কুশীলব ৮০ পুলিশ কর্মকর্তার বিদায় চূড়ান্ত