হৃদয়ের আলো তাহাজ্জুদ

মুফতি ফয়েজ হাবীব

হৃদয়ের আলো তাহাজ্জুদ

তাহাজ্জুদ শব্দটি গভীর রাতের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক রাখে। রাত গভীর হলেই তাহাজ্জুদের ওয়াক্ত হয়। হৃদয়ের আবেগ ঢেলে প্রেমপেয়ালা পরিপূর্ণ করার সময় হলো তাহাজ্জুদ। সেজদায় রবের কাছে গিয়ে প্রেমালাপের উত্তম তরিকা তাহাজ্জুদ। মনের ভাষাগুলো চোখ দিয়ে বের করে হাতে ও মুখে শান্তি মাখানোর নাম-ই তাহাজ্জুদ।

তাহাজ্জুদের ওয়াক্তে রব বান্দার খুব কাছাকাছি চলে আসেন। বান্দারও সুযোগ থাকে রবকে কাছে পেয়ে সব হাজত তুলে ধরার। দুনিয়াবাসী এ সময় ঘুমের কোলে পরম আরামে থাকে। আরশ থেকে নামা রবের বিশেষ রহমত পেতে বান্দার আরাম বিসর্জন দেওয়া জরুরি। ইবাদত যত ত্যাগ ও মেহনতময় হবে, তত লাভজনক হবে এর ফল। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘ফরজ নামাজের পর সবচেয়ে ফজিলতপূর্ণ নামাজ হলো রাতের নামাজ।’ (মুসলিম : ১১৬৩)

বিজ্ঞাপন

গোনাহ মাফ, নৈকট্যলাভ ও মন ভালো রেখে মন্দ থেকে দূরে থাকার অন্যতম পথ হলো রাতের নামাজ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের কিয়ামুল লাইল বা রাতের নামাজ আদায় করা উচিত। কারণ, রাতে ইবাদত করা তোমাদের পূর্ববর্তী নেক লোকদের রীতি। এটি তোমাদের প্রতিপালকের নৈকট্য লাভের পথ, গোনাহ মাফের উপায় এবং অপরাধ-অশ্লীলতা থেকে দূরে থাকার মাধ্যম।’ (সহিহ ইবনে খুজাইমা : ১১৩৫)

পৃথিবীর প্রাসাদ মাটির ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। আর মাটিও ইসরাফিল (আ.)-এর ফুঁতকারের অপেক্ষায়। আকাশ-মাটি সব ধ্বংস হবে। দুনিয়ার প্রাসাদ তো দুনিয়ার চোখে নামমাত্র সুন্দর, কিন্তু রাতজাগা ইবাদতকারীদের জন্য রয়েছে, অবর্ণনীয় সুন্দরের জান্নাতি চিরস্থায়ী প্রাসাদ। আলী (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘জান্নাতের মধ্যে প্রাসাদগুলো এমন হবে যে, এর ভেতর থেকে বাইরের সবকিছু দেখা যাবে এবং এর বাইরে থেকে ভেতরের সবকিছু দেখা যাবে।’ এক বেদুইন দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করল, হে আল্লাহর রাসুল! এসব কাদের জন্য? তিনি বললেন, ‘যারা মানুষের সঙ্গে নরম কথা বলে, ক্ষুধার্তকে খাবার দেয়, সিয়াম পালন করে এবং রাতে মানুষ যখন ঘুমিয়ে থাকে, তখন নামাজ আদায় করে ।’ (তিরমিজি : ২৫২৭)

আমরা মানুষ। আল্লাহর বান্দা। তিনি জানেন আমরা অপরাধ করতে পারি! তাই তো, তিনিই ক্ষমার অপার সুযোগ রেখে তাহাজ্জুদের সময় নিকটবর্তী আসমানে অবতরণ করে আমাদের ডাকতে থাকেন। সাহাবি আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘প্রতি রাতের শেষ তৃতীয়াংশ অবশিষ্ট থাকতে আমাদের পরওয়ারদিগার আমাদের নিকটবর্তী আসমানে অবতরণ করে ঘোষণা করতে থাকেনÑকেউ আছে কি! যে আমাকে ডাকবে, আমি তার ডাকে সাড়া দেব। কেউ আছে কি! যে আমার কাছে কিছু চাইবে, আমি তাকে তা দিয়ে দেব। কেউ আছে কি! যে আমার কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা করবে, আমি তাকে ক্ষমা করে দেব।’ (বুখারি : ৬৩২১)

বিশ্বজুড়ে এখন ফুটবল বিশ্বকাপের উত্তেজনা। ব্রাজিল-আর্জেন্টিনাপ্রেমিকরা শেষরাতে প্রিয় দলের লড়াই দেখার জন্য জেগে ওঠে। (কপালপোড়া সেই মুসলিমরা আল্লাহর সব নিয়ামত ভোগ করেও তাঁর হুকুমে একটু পর ফজর পড়তে পারে না।) তেমনি প্রকৃত মুমিনরা শেষ রাতে আল্লাহর সান্নিধ্যের টানে ঘুমিয়ে থাকতে পারে না। তাহাজ্জুদকে সেতু বানিয়ে সেজদার বাহনে চড়ে চলে যায় মহান রবের দরবারে। আল্লাহর দরবারের চেয়ে উত্তম গন্তব্য মুমিমের আর কী হতে পারে! রব আমাদের সবাইকে কবুল করুন।

লেখক : মুদাররিস, জামিয়া রিয়াজুল উলুম, ত্রিশাল, ময়মনসিংহ

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন