একটি কল্যাণকামী রাষ্ট্রের মূল চালিকাশক্তি হলো তার বাজেট ও অর্থনৈতিক পরিকল্পনা। প্রতি বছর বাজেট ঘোষণার সময় সাধারণ মানুষের মনে একধরনের উদ্বেগ কাজ করে—নতুন করে কোন জিনিসের দাম বাড়ছে, করের বোঝা কতটা ভারী হচ্ছে। প্রচলিত পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থায় বাজেট মানেই যেন করের পরিধি বাড়ানো এবং সাধারণ মানুষের ওপর পরোক্ষ করের বোঝা চাপানো। কিন্তু ১ হাজার ৪০০ বছর আগে রাসুলুল্লাহ (সা.) যে বৈপ্লবিক অর্থনৈতিক নীতি প্রবর্তন করেছিলেন, তা বর্তমান দেউলিয়া ও বৈষম্যমূলক অর্থব্যবস্থার এক চমৎকার ও টেকসই বিকল্প পেশ করে।
রাসুলুল্লাহর (সা.) বাজেটনীতি ও ইসলামের চাওয়া
ইসলাম এমন একটি বাজেট ব্যবস্থা চায়, যা কেবল সংখ্যার খতিয়ান নয়, বরং একটি ইনসাফভিত্তিক ও মানবিক দলিল। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বাজেটনীতির মূল ভিত্তি ছিল সম্পদের সুষম বণ্টন এবং দারিদ্র্য বিমোচন। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তায়ালা স্পষ্ট ঘোষণা করেছেন—‘যাতে সম্পদ কেবল তোমাদের ধনীদের মধ্যেই আবর্তিত না হয়।’ (সুরা হাশর : ৭)
মদিনা রাষ্ট্রে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কোনো ঘাটতি বাজেট বা বৈদেশিক ঋণনির্ভর বাজেট ছিল না। তার নীতি ছিল উৎপাদনমুখী, অপচয়হীন এবং সম্পূর্ণ আত্মনির্ভরশীল। রাষ্ট্রের আয়-ব্যয়ের ক্ষেত্রে তিনি সামর্থ্যবানদের কাছ থেকে বাধ্যতামূলক ও ঐচ্ছিক কর (জাকাত, ওশর) সংগ্রহ করে তা সরাসরি সুবিধাবঞ্চিতদের মাঝে বণ্টন করতেন, যা সমাজে তারল্য সংকট দূর করত এবং অভ্যন্তরীণ চাহিদা বাড়াত।
ইসলামি অর্থনীতিতে বাজেটের প্রকারভেদ
প্রচলিত অর্থনীতিতে বাজেটকে উদ্বৃত্ত, সুষম ও ঘাটতি—এই তিন ভাগে ভাগ করা হলেও ইসলামি অর্থনীতিতে বাজেটের দর্শন কিছুটা ভিন্ন। উৎস ও ব্যয়ের খাত বিবেচনায় ইসলামি রাষ্ট্রব্যবস্থার বাজেটকে মূলত তিনটি প্রধান তহবিলে বিন্যস্ত করা হয়—
১. জাকাত ও ওশর তহবিল (কল্যাণ বাজেট) : এটি নির্দিষ্ট খাত ছাড়া অন্য কোথাও ব্যয় করা যায় না। এটি মূলত দারিদ্র্য বিমোচন ও সামাজিক নিরাপত্তার জন্য সংরক্ষিত।
২. গণ-মালিকানাধীন খাত (সাধারণ বাজেট) : খনিজ সম্পদ, রাষ্ট্রীয় ভূমি বা উম্মাহর সাধারণ সম্পদ থেকে অর্জিত আয়, যা শিক্ষা, চিকিৎসা ও অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যয় হয়।
৩. জরুরি বা আপৎকালীন তহবিল : যুদ্ধ, মহামারি বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় সামর্থ্যবানদের ওপর সাময়িক কর ধার্য করে এই বাজেট পরিচালিত হয়।
প্রচলিত বাজেটের সমস্যা : বর্তমান প্রচলিত সামষ্টিক অর্থনৈতিক বাজেটে বেশ কিছু কাঠামোগত সংকট রয়েছে, যা সমাজে চরম অর্থনৈতিক বৈষম্য তৈরি করছে। ইসলামের দৃষ্টিতে প্রধান সমস্যাগুলো হলো—
ঋণ ও সুদের ফাঁদ : আধুনিক বাজেটগুলোর সিংহভাগই দেশি-বিদেশি ঋণ এবং তার সুদ পরিশোধে ব্যয় হয়। ইসলামে সুদ সম্পূর্ণ হারাম। সুদি ব্যবস্থার কারণে সাধারণ মানুষের ট্যাক্সের টাকা উন্নয়নের কাজে না লেগে সুদখোর মহাজনদের পকেটে চলে যায়।
ঘাটতি বাজেটের সংস্কৃতি : আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি দেখিয়ে প্রতি বছর ঘাটতি বাজেট দেওয়া হয়, যা মেটাতে টাকা ছাপানো হয় বা ঋণ নেওয়া হয়। এর ফলে মুদ্রাস্ফীতি ঘটে এবং টাকার মান কমে যায়।
পরোক্ষ করের অসমতা : ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সবার ওপর সমান হারে কর চাপানো ইসলামের ইনসাফনীতির পরিপন্থী।
সাধারণের ওপর ট্যাক্স-ভ্যাটের বোঝার ইসলামি বিকল্প : বর্তমানে মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) এবং পরোক্ষ করের কারণে একজন রিকশাচালক বা দিনমজুরকেও একটি দিয়াশলাই বা সাবান কিনতে গিয়ে ধনকুবেরের সমান হারে কর দিতে হচ্ছে। এটি চরম জুলুম। ইসলাম এই পরোক্ষ কর ও ভ্যাটের সংস্কৃতির সম্পূর্ণ বিপরীত। ইসলামের বিকল্প রূপরেখা হলো ‘ডাইরেক্ট ট্যাক্সেশন’ বা প্রত্যক্ষ ও প্রগতিশীল কর ব্যবস্থা এবং নির্দিষ্ট আয়ের ঊর্ধ্বে থাকা ধনীদের ওপর কর আরোপ। এই ব্যবস্থায় ইসলাম বেশ কিছু স্থায়ী ও সাময়িক আয়ের উৎস নির্ধারণ করেছে—
জাকাত ও ওশর ব্যবস্থা : ধনীদের উদ্বৃত্ত সম্পদের ওপর ২ দশমিক ৫ শতাংশ এবং কৃষিজাত পণ্যের ওপর ৫ থেকে ১০ শতাংশ কর ধার্য করা হয়। এটি সাধারণ বা দরিদ্র মানুষের ওপর কোনো চাপ তৈরি করে না, বরং তাদের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ায়।
খারাজ ও জিজিয়া : রাষ্ট্রীয় জমি ও অমুসলিম নাগরিকদের কাছ থেকে নেওয়া নিরাপত্তা কর, যার মাধ্যমে মুসলিম-অমুসলিম সবার নাগরিক অধিকার সংরক্ষিত থাকে এবং দরিদ্ররা করমুক্ত থাকে।
পরোক্ষ কর বা ভ্যাট সম্পূর্ণ বাতিল : ইসলাম নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর সাধারণ ভ্যাট বা কর আরোপ করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করে। এর ফলে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের জীবনযাত্রার ব্যয় এক ধাক্কায় বহুলাংশে কমে যায়।
জরুরি কর বা নাওয়াইব : কেবল রাষ্ট্র চরম সংকটে পড়লে ধনীদের ওপর সাময়িক কর ধরা হয়। সংকট কেটে গেলে এই কর বাতিল হয়ে যায়, ফলে জনগণের ওপর স্থায়ী কোনো বোঝার সৃষ্টি হয় না।
সংকট সমাধানে ইসলামের রোডম্যাপ : বর্তমান অর্থনৈতিক মন্দা ও বাজেটীয় সংকট থেকে উত্তরণে ইসলাম যে কার্যকর সমাধান দেয়, তা সংক্ষেপে নিম্নরূপ—
সুদমুক্ত অর্থায়ন : বাজেট ঘাটতি মেটাতে সুদি ঋণ নেওয়ার পরিবর্তে ‘মুদারাবা’ বা ‘মুশারাকা’ (অংশীদারত্ব) ভিত্তিক ইসলামিক বন্ড (সুকুক) ইস্যু করা যেতে পারে।
অপচয় ও দুর্নীতি রোধ : সরকারি অনুদান ও মেগা প্রজেক্টের নামে অর্থ পাচার এবং অপচয় বন্ধ করা ইসলামের অন্যতম নির্দেশ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বায়তুল মালের প্রতিটি পয়সার হিসাব রাখতেন। অপচয় রোধ করলেই বাজেটের বড় ঘাটতি কমে যায়।
উৎপাদনমুখী অর্থনীতি : ইসলাম অলস অর্থ জমিয়ে রাখার ওপর জরিমানা (জাকাত) আরোপ করে, ফলে ধনীরা বাধ্য হয়ে অর্থ ব্যবসা ও শিল্পে খাটায়। এতে কর্মসংস্থান তৈরি হয় এবং বাজেটে রাজস্ব বাড়ে।
পরোক্ষ কর আর ভ্যাটের জাঁতাকলে পিষ্ট সাধারণ মানুষকে মুক্তি দিতে হলে প্রচলিত শোষণের বাজেট কাঠামো থেকে বের হয়ে আসতে হবে। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর দেখানো বাজেটনীতি কেবল মুসলিমদের জন্য নয়, বরং যেকোনো রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সমতা ও স্থিতিশীলতা আনয়নের জন্য এক শাশ্বত মডেল। একটি কল্যাণমুখী রাষ্ট্র গঠনে ট্যাক্স-ভ্যাটের বোঝা কমিয়ে প্রত্যক্ষ কর ও জাকাতভিত্তিক অর্থনীতি চালুর বিকল্প নেই।
লেখক : প্রিন্সিপাল, আস-সুফফাহ মডেল মাদরাসা, গাজীপুর
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


শরিয়ার দৃষ্টিতে বৈধ-অবৈধ খেলাধুলা