ইসলাম মানুষের জীবনকে ভারসাম্যপূর্ণ ও সুন্দর করার জন্য এসেছে। ইবাদত, কাজ, বিশ্রাম এবং বিনোদন—সবকিছুরই একটি বৈধ ও পরিমিত ব্যবস্থা ইসলামে রয়েছে। খেলাধুলা মানুষের শরীরকে সুস্থ, মনকে প্রফুল্ল এবং কর্মক্ষম রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই ইসলামে খেলাধুলা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ নয়; বরং কিছু খেলাকে উৎসাহিত করা হয়েছে এবং কিছু খেলাকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তোমরা নিজেদের ধ্বংসের দিকে নিক্ষেপ করো না এবং সৎকর্ম করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ সৎকর্মশীলদের ভালোবাসেন।’ (সুরা আল-বাকারা : ১৯৫)
এই আয়াত থেকে বোঝা যায় যে মানুষের শারীরিক সুস্থতা ও শক্তি অর্জনের জন্য বৈধ উপায় অবলম্বন করা শরিয়তসম্মত।
ইসলামে বৈধ ও প্রশংসনীয় খেলাধুলা
১. ঘোড়দৌড় ও অশ্বারোহণ
রাসুলুল্লাহ (সা.) ঘোড়দৌড়ের প্রতিযোগিতা আয়োজন করেছেন এবং সাহাবিদের এতে উৎসাহিত করেছেন। ইবনু উমর (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) ঘোড়ার দৌড় প্রতিযোগিতার ব্যবস্থা করতেন। (বুখারি : ২৮৭০) অশ্বারোহণ মুসলিমদের শারীরিক দক্ষতা ও যুদ্ধ প্রস্তুতির অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।
২. তিরন্দাজি
তিরন্দাজি ইসলামে অত্যন্ত প্রশংসিত একটি খেলা। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা তির নিক্ষেপ করো এবং অশ্বারোহণ করো। (তিরমিজি : ১৬৩৭) অন্য হাদিসে এসেছে—‘শক্তি বলতে তিরন্দাজিকেই বোঝায়।’ (মুসলিম : ১৯১৭)
৩. দৌড় প্রতিযোগিতা
দৌড় একটি সুন্নাহসম্মত খেলা। আয়েশা (রা.) বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সঙ্গে দৌড়ে প্রতিযোগিতা করেছিলাম এবং আমি তাঁকে হারিয়ে দিয়েছিলাম। (আবু দাউদ : ২৫৭৮)
৪. সাঁতার
যদিও সাঁতার বিষয়ে সহিহ হাদিসে সরাসরি নির্দেশনা সীমিত, তবে এটি শরীরচর্চার অন্যতম উত্তম মাধ্যম হিসেবে ইসলামি আলেমরা গ্রহণ করেছেন। এটি স্বাস্থ্য রক্ষায় সহায়ক এবং শরিয়তের সাধারণ নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
৫. কুস্তি ও শরীরচর্চা
রাসুলুল্লাহ (সা.) বিখ্যাত কুস্তিগির রুকানাহর সঙ্গে কুস্তি করে তাকে পরাজিত করেছিলেন। (আবু দাউদ : ৪০৭৮) এ থেকে শক্তি বৃদ্ধি ও শরীরচর্চার বৈধতা প্রমাণিত হয়।
আধুনিক খেলাধুলার বিধান
ফুটবল, ক্রিকেট, ভলিবল, ব্যাডমিন্টন, হকি, টেবিল টেনিস ও দাবা (এ বিষয়ে আলেমদের মধ্যে মতভেদ আছে), দৌড়, মার্শাল আর্টসহ আধুনিক অনেক খেলাই মূলত বৈধ; তবে কয়েকটি শর্ত মানতে হবে—
১. ফরজ নামাজ নষ্ট করা যাবে না।
২. জুয়া বা বাজি ধরা যাবে না।
৩. অশ্লীলতা বা শরিয়তবিরোধী পোশাক থাকবে না।
৪. গালাগাল, ঝগড়া বা হিংসাত্মক আচরণ করা যাবে না।
৫. খেলাই জীবনের একমাত্র লক্ষ্য হয়ে উঠবে না।
যদি এসব শর্ত লঙ্ঘিত হয়, তবে বৈধ খেলাও গুনাহের কারণ হতে পারে।
কোন খেলা বা বিনোদন হারাম?
১. জুয়াভিত্তিক সব খেলা
যে খেলায় অর্থ, সম্পদ বা পুরস্কারের জন্য বাজি ধরা হয়, তা হারাম। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘হে মুমিনরা! মদ, জুয়া, মূর্তি এবং ভাগ্য নির্ধারণকারী শর এসব শয়তানের অপবিত্র কাজ। অতএব তোমরা তা থেকে দূরে থাকো।’ (সুরা আল-মায়িদাহ : ৯০) তাই তাস, ক্রিকেট, ফুটবল বা অন্য যেকোনো খেলায় বাজি ধরা হারাম।
২. নামাজ ও ইবাদত থেকে গাফেল করে এমন খেলা
আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনরা! তোমাদের সম্পদ ও সন্তান যেন তোমাদের আল্লাহর স্মরণ থেকে গাফেল না করে।’ (সুরা আল-মুনাফিকুন : ৯) যে খেলা মানুষকে নামাজ, কোরআন তিলাওয়াত ও দ্বীনি দায়িত্ব থেকে দূরে সরিয়ে দেয়, তা গুনাহের কারণ।
৩. অশ্লীলতা ও নগ্নতাযুক্ত খেলা
যে খেলায় সতর খোলা থাকে, নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা হয় বা অশ্লীলতা ছড়ায়, তা শরিয়তসম্মত নয়। এসব খেলা থেকে অবশ্যই বেঁচে থাকতে হবে।
৪. ক্ষতিকর ও প্রাণঘাতী খেলা
যে খেলায় নিজের বা অন্যের জীবনের বড় ক্ষতির আশঙ্কা থাকে, তা ইসলামের দৃষ্টিতে বৈধ নয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘নিজে ক্ষতিগ্রস্ত হবে না এবং অন্যকেও ক্ষতিগ্রস্ত করবে না।’ (ইবন মাজাহ : ২৩৪০)
খেলাধুলা সম্পর্কে ইসলামের ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘শক্তিশালী মুমিন দুর্বল মুমিনের চেয়ে উত্তম ও আল্লাহর কাছে অধিক প্রিয়।’ (মুসলিম : ২৬৬৪)
এই শক্তির মধ্যে ঈমানি শক্তির পাশাপাশি শারীরিক শক্তিও অন্তর্ভুক্ত। তাই একজন মুসলিমের উচিত এমন খেলাধুলা নির্বাচন করা, যা শরীরকে সুস্থ রাখে, চরিত্র গঠন করে, সময়ের অপচয় করে না এবং আল্লাহর আনুগত্যে সহায়ক হয়।
খেলাধুলা তখনই ইবাদতের মর্যাদা পেতে পারে, যখন তা সুস্বাস্থ্য অর্জন, দ্বীনের খেদমত, কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির নিয়তে করা হয়। পক্ষান্তরে, যে খেলাধুলা জুয়া, অশ্লীলতা, নামাজ অবহেলা বা পাপাচারের কারণ হয়, তা হারাম বা ন্যূনতম মাকরুহ হয়ে যায়। সুতরাং মুসলিমদের উচিত খেলাধুলার ক্ষেত্রেও কোরআন ও সুন্নাহর নির্দেশনা অনুসরণ করে হালাল ও উপকারী বিনোদন বেছে নেওয়া।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

