কেউ কেউ ট্রফি জিতে কিংবদন্তি হন। কেউ কেউ ট্রফি ছাড়াই মানুষের হৃদয়ে চিরকাল বেঁচে থাকেন। নেইমার দ্য সিলভা জুনিয়রের গল্পটা ঠিক দ্বিতীয়টির মতো; তবে বিষাদগ্রস্ত। ফুটবলের সবচেয়ে উজ্জ্বল মঞ্চ ‘গ্রেটেস্ট শো অন দ্য আর্থ’খ্যাত বিশ্বকাপে তিনি ছিলেন ব্রাজিলের আশা, স্বপ্ন, আনন্দ, হতাশা। অথচ শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপের সোনালি আলোর আড়ালে থেকেই বিদায় নিতে হলো অমিত প্রতিভাধর এই তারকাকে। কাঙ্ক্ষিত ট্রফিটি ছুঁয়ে দেখার সৌভাগ্য তার সঙ্গে ছলনা করে গেছে ১৬টি বছর!
এক সময় মনে হয়েছিল পেলের উত্তরসূরি এসে গেছে। সান্তোসে কৈশোরেই জাদু দেখানো ছেলেটি যখন ২০১৪ বিশ্বকাপে নিজের দেশে নামলেন, পুরো ব্রাজিল যেন তাকে ঘিরেই ভবিষ্যৎ লিখতে শুরু করেছিল। ২০১৪ বিশ্বকাপ ছিল নেইমারের বিশ্বমঞ্চে প্রথম বড় পরীক্ষা। গ্রুপ পর্বেই চার গোল করে তিনি বুঝিয়ে দিয়েছিলেন ব্রাজিলের আক্রমণের প্রাণ তিনি। ক্যামেরুনের বিপক্ষে জোড়া গোল, ক্রোয়েশিয়া ও মেক্সিকোর বিপক্ষে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স—সব মিলিয়ে পাঁচ ম্যাচে করেছিলেন চার গোল ও একটি অ্যাসিস্ট।
কিন্তু কোয়ার্টার ফাইনালে কলম্বিয়ার হুয়ান কামিলো জুনিগার হাঁটুর আঘাতে ভেঙে যায় তার কোমরের একটি কশেরুকা। হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে থাকা নেইমারের চোখের পানিই যেন হয়ে উঠেছিল পুরো ব্রাজিলের কান্না। এই ইনজুরিই পিছিয়ে দিয়েছে তার ক্যারিয়ার, ফর্ম আর ঘুরিয়ে দিয়েছে জীবনের মোড়! তার অনুপস্থিতিতেই আসে সেই অবিশ্বাস্য ৭-১। জার্মানির কাছে সেমিফাইনালে ব্রাজিলের লজ্জাজনক হার যেন শুধু একটি ম্যাচের পরাজয় ছিল না; সেটি ছিল একটি প্রজন্মের স্বপ্নভঙ্গও।
চার বছর পর রাশিয়া বিশ্বকাপে ফিরলেন ইনজুরি কাটিয়ে। এর আগে পায়ের চোটে মৌসুমের বড় অংশ মিস করেছিলেন। অনেকেই সন্দেহ করছিলেন, আগের নেইমারকে আর দেখা যাবে কি না। তিনি ফিরেছিলেন। কোস্টারিকার বিপক্ষে কান্নাভেজা গোল, সার্বিয়ার বিপক্ষে আরেকটি গোল—মোট দুই গোল ও দুটি অ্যাসিস্ট করেছিলেন। কিন্তু কোয়ার্টার ফাইনালে বেলজিয়ামের বিপক্ষে আবারও থেমে যায় ব্রাজিল।
২০২২ কাতার বিশ্বকাপ ছিল সম্ভবত নেইমারের সবচেয়ে পরিণত সংস্করণ। দলের জন্য খেলছিলেন, সুযোগ তৈরি করছিলেন, প্রয়োজনে পিছিয়ে এসে বল নিচ্ছিলেন। দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে গোল করেন, এরপর ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে অতিরিক্ত সময়ে এমন এক গোল করেন, যা অনেকেই তার ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা বলে মনে করেন। সেই গোলে তিনি ছুঁয়ে ফেলেন পেলের আন্তর্জাতিক গোলের রেকর্ড। কিন্তু মাত্র কয়েক মিনিটের ব্যবধানে ব্রুনো পেতকোভিচের শটে সমতা ফেরায় ক্রোয়েশিয়া। টাইব্রেকারে বিদায় নেয় ব্রাজিল। হাঁটু গেড়ে বসে থাকা নেইমারের অশ্রুসিক্ত মুখটি হয়ে যায় কাতার বিশ্বকাপের সবচেয়ে বেদনাদায়ক ছবিগুলোর একটি।
অতঃপর এলো ২০২৬। অনেকেই ভাবেননি নেইমার ফিরবেন। দীর্ঘ চোট, বয়স আর ক্যারিয়ারের উত্থান-পতনের মধ্যেও তিনি ফিরেছিলেন। কিন্তু এবার তিনি আর আগের মতো প্রথম একাদশের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিলেন না। নরওয়ের বিপক্ষে শেষ ষোলোতে বেঞ্চ থেকে নেমেছিলেন। ম্যাচের যোগ করা সময়ে পেনাল্টি থেকে একটি গোল করে ব্যবধান কমিয়েছিলেন; কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। ব্রাজিল হেরে বিদায় নেয়। সে ম্যাচের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানান ব্রাজিলের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা।
বিশ্বকাপের চার আসরে তার মোট গোল ৯টিÑ২০১৪ সালে ৪টি, ২০১৮ সালে দুটি, ২০২২ সালে দুটি এবং ২০২৬ সালে একটি। প্রতিটি বিশ্বকাপেই তিনি গোল করেছেন; কিন্তু কোনো বিশ্বকাপেই ট্রফি তুলতে পারেননি।
নেইমারের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ হয়তো প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডাররা ছিলেন না। বারবার ইনজুরি তার গতি কেড়ে নিয়েছে। গোড়ালি, হাঁটু, পায়ের লিগামেন্ট—প্রায় প্রতি মৌসুমেই কোনো না কোনো চোট তাকে থামিয়েছে। তার ওপর ছিল ব্যক্তিগত জীবনের বিতর্ক। পার্টি, জন্মদিন, ছুটি, সামাজিক জীবন—এসব নিয়ে সমালোচনা কখনো তার পিছু ছাড়েনি। অনেকে বলতেন, তিনি নিজের প্রতিভার প্রতি যথেষ্ট কঠোর ছিলেন না। আবার অনেকেই মনে করেন, আধুনিক ফুটবলের সবচেয়ে বেশি ফাউলের শিকার হওয়া ফুটবলারদের একজন হওয়ায় তার ক্যারিয়ার বারবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সত্যিটা হয়তো মাঝামাঝি কোথাও।
পেলে বিশ্বকাপ জিতেছিলেন তিনবার। রোনালদো জিতেছিলেন দুবার। রোমারিও, রিভালদো, রোনালদিনহো, কাকা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ব্রাজিলকে বিশ্বসেরা করেছেন। নেইমার পারেননি। কিন্তু তাই বলে তিনি ব্যর্থ? সম্ভবত না। কারণ, ফুটবলে কিছু নাম থাকে, যারা ট্রফির চেয়েও বড় হয়ে ওঠে। যারা মানুষের স্মৃতিতে থেকে যায় ড্রিবল, হাসি-কান্না আর অসমাপ্ত স্বপ্নের জন্য। নেইমারের বিশ্বকাপ শেষ হয়েছে চোখের জলে। কিন্তু ব্রাজিলের ফুটবল ইতিহাসে তার গল্প শেষ হয়নি। সব ট্রফির হিসাব মিলে যায় না। কিছু গল্প হৃদয়ে থেকে যায়।
আর নেইমারের গল্পটি হয়তো বিশ্বকাপ জয়ের নয়; বরং এক অপূর্ণ নক্ষত্রের, যে আকাশকে বারবার আলোকিত করেছে, কিন্তু নিজের হাতে কখনো বিশ্বকাপের সোনালি আলো ছুঁতে পারেননি।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

