ব্রাজিল ‘ঘাতক’ নিলান্ডের রূপকথার উত্থান

নজরুল ইসলাম

ব্রাজিল ‘ঘাতক’ নিলান্ডের রূপকথার উত্থান

পেশাদার ফুটবলারদের জীবন পুরোপুরি চুক্তিনির্ভর। চুক্তি ফুরিয়ে গেলে মাঠের তারকাও রাতারাতি রূপ নেন সাধারণ বেকার মানুষে। ঠিক এই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েই যাচ্ছিলেন ওরিয়ান নিলান্ড। ৩০ জুন স্প্যানিশ ক্লাব সেভিয়ার সঙ্গে চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর ৩৫ বছর বয়সি এই গোলকিপার হয়ে পড়েছিলেন সম্পূর্ণ দলছুট। কিন্তু পেশাদার ফুটবলের এই নিষ্ঠুর সত্যকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে মাত্র ছয় দিনের ব্যবধানে তিনি এখন বিশ্বমঞ্চের মহানায়ক। বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর লড়াইয়ে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলকে বিদায় করে দেওয়ার পেছনে আর্লিং হ্যালান্ডের জোড়া গোল বড় ভূমিকা রাখলেও ম্যাচের আসল সুরটি বেঁধে দিয়েছিলেন এই গ্লাভসধারী ‘বেকার’ সৈনিক।
নিউ জার্সির মাঠে ম্যাচের বয়স তখন মাত্র ১৪ মিনিট, তখন ভিএআরের নাটকীয়তায় পেনাল্টি পেয়ে যায় ব্রাজিল। স্পটকিকে ব্রাজিলের মিডফিল্ডার ব্রুনো গিমারাইস যখন তার রানআপের গতি কমিয়ে গোলরক্ষককে বোকা বানানোর চতুর চেষ্টা করছিলেন, নিলান্ড তখন নিজের অভিজ্ঞতার পুরোটা ঢেলে দেন। নিখুঁত অনুমানে বাঁদিকে শরীর ছুঁড়ে দিয়ে রুখে দেন ব্রুনোর শট। ম্যাচের এত শুরুর দিকে পেনাল্টি বাঁচানো কেবল নরওয়েকে রক্ষা করেনি, বরং পুরো দলের ভেতর বিশ্বাস বুনে দিয়েছিল যে, এই ব্রাজিলকে হারানো সম্ভব। ম্যাচ শেষে নিলান্ড নিজেই সেই স্বস্তির কথা জানিয়ে বলেন, ‘শুরুতেই পেনাল্টি সেভ করলে প্রতিপক্ষের মনস্তত্ত্বে চাপ সৃষ্টি করা যায়। এটি আমাদের দলকে একটু নিঃশ্বাস নেওয়ার সুযোগ করে দিয়েছিল।’
পেনাল্টি ঠেকালেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায়নি। হ্যালান্ড দৃশ্যপটে আসার আগে ব্রাজিলিয়ান ফরোয়ার্ডদের একের পর এক আক্রমণ একাই সামলেছেন নিলান্ড। ৩১ মিনিটে গ্যাব্রিয়েল মার্তিনেল্লি একক গতিতে বক্সে ঢুকে যে দারুণ শটটি নিয়েছিলেন, তা দারুণ রিফ্লেক্সে নিচে নেমে প্রতিহত করেন। এরপর ৪১ মিনিটে হতাশ করেন রিয়াল মাদ্রিদ তারকা ভিনিসিয়ুস জুনিয়রকে। মার্তিনেল্লির পাস থেকে ভিনির নেওয়া দারুণ এক কোনাকুনি শট লম্বা পা বাড়িয়ে চমৎকারভাবে আটকে দেন এই অভিজ্ঞ গোলকিপার।
তবে নাটকের চূড়ান্ত অঙ্ক তখনো বাকি ছিল। ৮৬ মিনিটে নরওয়ে যখন ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে, তখন ব্রাজিলের একটি আক্রমণ প্রতিহত করতে গিয়ে নরওয়ের ডিফেন্ডার ক্রিস্টোফার আয়েরের গায়ে লেগে বল অদ্ভুতভাবে দিক পরিবর্তন করে। ভারসাম্য হারিয়ে পেছনের দিকে পড়ে যাওয়ার মুহূর্তেও নিলান্ড এক হাতের জাদুতে বলটি ছুঁয়ে পোস্টের গায়ে লাগিয়ে বাইরে পাঠিয়ে দেন। নিশ্চিত আত্মঘাতী গোলের হাত থেকে দলকে বাঁচানো এই সেভটি নিঃসন্দেহে চলতি বিশ্বকাপের অন্যতম সেরা। ফরোয়ার্ড অস্কার বব তাই ম্যাচ শেষে দলের সেরা তারকার চেয়েও গোলরক্ষককে এগিয়ে রেখে বলেন, ‘আমাদের দলে হ্যালান্ড থাকতে পারে; কিন্তু গোলকিপারই আজ আমাদের ম্যাচটি বাঁচিয়ে দিয়েছে।’
অথচ এ বিশ্বকাপে নরওয়ের পোস্টের নিচে নিলান্ডের থাকারই কথা ছিল না। বোদো/গ্লিমটের হয়ে আলো ছড়ানো নিকিতা হাইকিন নরওয়ের নাগরিকত্ব পাওয়ায় ভাবা হচ্ছিল তিনিই হবেন দলেরি এক নম্বর পছন্দ। সেভিয়ায় পুরো মৌসুমে মাত্র পাঁচ ম্যাচ খেলা নিলান্ড নিজেও হয়তো আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ দেখে ফেলেছিলেন। কিন্তু ফিফার এক নাটকীয় সিদ্ধান্ত রাতারাতি বদলে দেয় সব সমীকরণ। ইসরাইলের নিকিতা হাইকিনকে নরওয়ের হয়ে খেলার অনুমতি দেয়নি বিশ্বফুটবলের অভিভাবক সংস্থাটি। আর সে সুযোগেই ফুটবল বিশ্ব দেখল কীভাবে একজন ক্লাবহীন, বেকার গোলরক্ষক গ্লাভস হাতে ব্রাজিলের মতো পরাশক্তিকে বিদায় করে রূপকথার নায়ক হয়ে উঠতে পারেন।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন