ইয়ামাল জানিয়ে দিলেন—আমি এসে গেছি

Picsart_26-06-04_12-40-53-266
এম. এম. কায়সার

ইয়ামাল জানিয়ে দিলেন—আমি এসে গেছি

আটলান্টার স্টেডিয়ামে এটি শুধু একটি ম্যাচ ছিল না; ছিল এক নতুন যুগের আগমনের অপেক্ষা। গ্যালারিতে হাজারো দর্শকের গায়ে স্পেনের লাল জার্সি। কিন্তু অনেকের পিঠে কোনো নম্বর নেই, নেই কোনো পুরোনো নায়কের নামও। সেখানে লেখা একটাই শব্দ- ‘ইয়ামাল’।
বড়পর্দায় যখন ১৮ বছরের সেই ছেলেটির মুখ ভেসে উঠল, পুরো স্টেডিয়াম যেন একসঙ্গে দাঁড়িয়ে তাকে স্বাগত জানাল। সে মুহূর্তে মনে হচ্ছিল মানুষ একটি ফুটবল ম্যাচ দেখতে আসেনি; তারা এসেছে ভবিষ্যৎকে চোখের সামনে দেখতে।
আর মাঠে নেমে লামিনে ইয়ামালও যেন বললেন—‘আমি এসে গেছি।’
কেপ ভার্দের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে খেলেছিলেন মাত্র ১৯ মিনিট। হ্যামস্ট্রিং চোট থেকে ফিরছিলেন বলে কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে কোনো ঝুঁকি নেননি। কিন্তু সৌদি আরবের বিপক্ষে দ্বিতীয় ম্যাচে প্রথম একাদশে সুযোগ মিলতেই বদলে গেল পুরো ছবিটা।
মাত্র ১০ মিনিট। একটি দৌড়। বাড়ানো পাসে একটি নিখুঁত স্লাইড। বিশ্বকাপ মঞ্চে প্রথম গোল। লামিনি ইয়ামালের প্রথম গোলের ছবি এটি। তবে নিশ্চিত জেনে রাখুন- প্রথম, তবে শেষ নয়। শুরু মাত্র। গুনতে শুরু করুন, শীর্ষে পৌঁছানোর আগে থামছেন না তিনি!
বিশ্বকাপে তার প্রথম গোলের গল্পে ফিরি আরেকবার।
মিকেল ওয়ারজাবালের ক্রস যখন বক্সের শেষ প্রান্তে পৌঁছাল, সবাই তখন বলের গতি হিসাব করছিল। ইয়ামাল হিসাব করছিলেন গোলের। বল জালে জড়াতেই আটলান্টা বিস্ফোরিত হলো।
এটা নেহাৎ কোনো একটি গোল ছিল না। এটা ছিল ঘোষণা। শুরুর ঘোষণা। আগমনের ঘোষণা। ১৯ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই বিশ্বকাপে গোল করা ফুটবলারের তালিকায় যুক্ত হলো আরেকটি নাম। ব্রাজিলের পেলে, ইংল্যান্ডের মাইকেল ওয়েন ও ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপ্পের পাশে এবার সেই এলিট তালিকায় লেখা হলো আরেকটি নাম- স্পেনের লামিনে ইয়ামাল।
ফুটবলকে নিজস্ব একটা খেলার ভাষা দিয়েছে ইয়ামালের দুই পা। ফুটবল দুনিয়ায় অনেক দ্রুতগতির উইঙ্গার আছেন। ড্রিবলিং জাদুতে মোহিত করার মতোও আছেন অনেকে। কিন্তু ইয়ামালের বিশেষত্ব অন্য জায়গায়। তিনি শুধু একজন ড্রিবলার নন, ম্যাচ বা খেলা তৈরির নায়কও।
বল পায়ে নিলে ইয়ামাল প্রথমে প্রতিপক্ষকে নিজের দিকে টেনে আনেন। তারপর এক স্পর্শে পুরো রক্ষণভাগের ভারসাম্য ভাঙেন। যে জায়গায় পাঁচ সেকেন্ড আগে কোনো ফাঁকা জায়গা ছিল না, সেখানে মুহূর্তের মধ্যে সতীর্থদের জন্য করিডোর খুলে যায়। এ কারণেই তাকে শুধু উইঙ্গার বললে ভুল হবে। পুরো মাঠে খেলার জায়গা কীভাবে তৈরি করতে হয়, সেটাই তাকে বাকিদের চেয়ে আলাদা করেছে। সৌদি ম্যাচে প্রথমার্ধ পর্যন্ত খেলেছেন। বল স্পর্শ করেছেন ৫২ বার। গোল একটি; কিন্তু যখনই বল পায়ে গেছে, তখনই মনে হয়েছে এই বিজয়ীকে কেউ হারাতে পারবে না।
ফুটবলে এই গুণ শেখানো যায় না। স্পেনের সাবেক অধিনায়ক সেসার আজপিলিকুয়েতা এ প্রসঙ্গে যা বলেছেন, সেটা সত্যিই মনে রাখার মতোই- ‘মাঠে ইয়ামাল এমন কিছু করে, যা অনুশীলনে শেখানো সম্ভব নয়।’
সৌদি আরবের বিরুদ্ধে ম্যাচ শেষে বিশ্লেষণে ইংল্যান্ডের সাবেক তারকা ওয়েন রুনি লিখেছিলেন- ‘মেসি যখন বার্সেলোনায় এসেছিলেন, তখন রোনালদিনহো, ডেকো, জাভিদের মতো কিংবদন্তিরা তার পাশে ছিলেন। কিন্তু ইয়ামাল এমন এক সময় বার্সায় এসেছেন, যখন পুরো দলটিই তাকে কেন্দ্র করে খেলছে।’
১৮ বছর বয়সে একটি দেশের আক্রমণের কেন্দ্রবিন্দু হওয়া—এটি খুব কম ফুটবলারের ভাগ্যেই জোটে। মেসি, রোনালদো কিংবা এমবাপ্পেও এত দ্রুত সে দায়িত্ব পাননি। সৌদির বিরুদ্ধে ম্যাচে ইয়ামালের পারফরম্যান্স দেখে মুগ্ধ সুইডেনের সাবেক সুপারস্টার জ্লাতান ইব্রাহিমোভিচকে বলতে শুনলাম, ‘ইয়ামাল এমন কিছু সৃষ্টি করে, যা অন্য কেউ পারে না।’
আসলে তার খেলা দেখলে মনে হয়, বলটি যেন পায়ের সঙ্গে সুতোয় বাঁধা। প্রতিটি টাচের উদ্দেশ্য আছে। প্রতিটি কাটব্যাকের পেছনে পরিকল্পনা আছে। প্রতিটি ড্রিবল যেন ম্যাচ জেতার জন্য।
সবচেয়ে বড় কথা, এ বয়সেও তার মধ্যে অদ্ভুত পরিণতিবোধ বিদ্যমান।
সৌদি আরবের বিপক্ষে স্পেন যখন ৩-০ গোলে এগিয়ে, তখন ম্যাচে নিজেই নিজেই গতি কমিয়ে দেয়। এ প্রসঙ্গে ম্যাচ শেষে ইয়ামাল বলছিলেন, ‘এটা যদি ফাইনাল হতো, তাহলে শতভাগ দিতাম। কিন্তু ৩-০ গোলে এগিয়ে থেকে শরীরের সব শক্তি খরচ করার দরকার নেই।’
১৮ বছরের একজন ফুটবলারের মুখে এমন কথা খুব একটা শোনা যায় না। বাকিদের সঙ্গে এখানেই ইয়ামালের পার্থক্য। প্রতিভা অনেকেরই থাকে; কিন্তু প্রতিভাকে কীভাবে ব্যবহার করতে হয়, সেটা খুব কম মানুষই জানেন।
তিন বছর আগে এই ছেলেটি ক্লাসরুমে বসে কাতার বিশ্বকাপ দেখেছিলেন। আজ তিনিই বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ। লা লিগা, চ্যাম্পিয়ন্স লিগা, ইউরো—যেখানেই নেমেছেন, ভেঙেছেন বয়সভিত্তিক রেকর্ড। প্রথম ১০০ ম্যাচে মেসি, রোনালদো কিংবা এমবাপ্পের চেয়েও বেশি গোল ও অ্যাসিস্টে জড়িত থেকেছেন।
এবার সেই ধারাবাহিকতা বিশ্বকাপেও।
স্পেনের কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে জানেন, তার দলে অভিজ্ঞ ফুটবলার আছেন, সংগঠিত মিডফিল্ড আছে, শক্তিশালী রক্ষণও আছে। কিন্তু এ দলের শিরোপা জয়ের স্বপ্নের কেন্দ্রবিন্দু এখন একজনই- লামিনে ইয়ামাল। কারণ, বড় টুর্নামেন্টে শেষ পর্যন্ত ট্রফি জেতে সেই দল, যার একজন খেলোয়াড় কোনো এক ম্যাজিক মুহূর্তে ম্যাচের গল্প বদলে দিতে পারে।
স্পেনের জন্য সেই গল্পকারের নাম এখন ইয়ামাল। বিশ্বকাপের ফাইনাল হবে তার উনিশতম জন্মদিনের মাত্র কয়েক দিন আগে। ফুটবল কখনো কখনো অদ্ভুত সুন্দর চিত্রনাট্য লেখে। হয়তো সেটি ইতোমধ্যেই লেখা শুরু হয়ে গেছে। আর সে গল্পের প্রথম লাইনটি আটলান্টাতেই লেখা হয়েছে, যে অধ্যায়ের নাম ‘আমি এসে গেছি’।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন