এই ফ্রান্সকে থামাবে কে?

এমবাপ্পে-দেম্বেলের গোলে সেমিফাইনালে লেস ব্লুস, মরক্কো আউট

এম. এম. কায়সার

এমবাপ্পে-দেম্বেলের গোলে সেমিফাইনালে লেস ব্লুস, মরক্কো আউট
ছবি : সংগৃহীত

এই ফ্রান্সকে থামাবে কে? কিলিয়ান এমবাপ্পেকে কীভাবে থামাবেন? যদি তাঁকে কোনোভাবে আটকালেও, সামনে অপেক্ষা করছেন দেজিরে দুয়ে, মাইকেল অলিসে কিংবা ওসমান দেম্বেলে। একজনকে থামানো যায়, দুজনকেও হয়তো। কিন্তু চার দিক থেকে একসঙ্গে ছুটে আসা এই নীল ঝড়কে?

বোস্টনের রাত আবারও সেই প্রশ্নই তুলে দিল।

বিজ্ঞাপন

প্রথমার্ধে পেনাল্টি মিস করেছিলেন কিলিয়ান এমবাপ্পে। মনে হচ্ছিল, হয়তো আজ ভাগ্য তাঁর পাশে নেই। কিন্তু বড় খেলোয়াড়দের গল্প তো এখানেই আলাদা। বিরতির পর ওপেন প্লে থেকে এমন এক অনবদ্য গোল করলেন, যা মুহূর্তেই মুছে দিল পেনাল্টি মিসের সব হতাশা। ছয় মিনিটেরও কম সময় পরে বক্সের বাইরে থেকে ওসমান দেম্বেলের আরেকটি দুর্দান্ত শট মরক্কোর শেষ আশাটুকুও নিভিয়ে দিল।

ম্যাচের ফল-ফ্রান্স ২, মরক্কো ০।

ফ্রান্স উঠে গেল সেমিফাইনালে। আর মরক্কোর বিশ্বকাপ-স্বপ্ন থামল ঠিক চার বছর আগের সেই পরিচিত প্রতিপক্ষের সামনেই। কাতার বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ফ্রান্সের কাছেই ২-০ গোলে হেরেছিল আটলাস লায়ন্সরা। এবার বিদায়টা এল আরও এক ধাপ আগে—কোয়ার্টার ফাইনালে।

প্রথমার্ধে স্কোরলাইন গোলশূন্য হলেও মাঠের চিত্র ছিল একমুখী। বল দখল, গতি আর আক্রমণের ধার—সবকিছুতেই এগিয়ে ছিল ফ্রান্স। শুরু থেকেই মরক্কোর রক্ষণকে চাপে রেখেছিল দিদিয়ে দেশমের দল। উপামেকানোর কাছ থেকে হেড, এমবাপ্পের দূরপাল্লার শট—একটির পর একটি সুযোগ তৈরি হচ্ছিল। কিন্তু প্রতিবারই সামনে দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছেন ইয়াসিন বুনো।

২৬ মিনিটে আসে ম্যাচের সবচেয়ে আলোচিত মুহূর্ত। দুরন্ত গতিতে বক্সে ঢুকে নুসাইর মাজরাউইকে কাটিয়ে যাওয়ার সময় ফাউলের শিকার হন এমবাপ্পে। রেফারি সঙ্গে সঙ্গে পেনাল্টির বাঁশি বাজান।

এরপর শুরু হয় দীর্ঘ অপেক্ষা। পেনাল্টি হয়েছে কিনা সেটা নিশ্চিত হতে ভিএআর লম্বা সময় নেয়। প্রায় তিন মিনিট ১২ সেকেন্ড বল নিয়ে পেনাল্টি স্পটে দাঁড়িয়েছিলেন এমবাপ্পে। সম্ভবত তাতেই তার মনোযোগটা নষ্ট হয়। স্পট-কিক নিতে এসে যেন নিজের স্বাভাবিক ছন্দটাই হারিয়ে ফেলেন ফরাসি অধিনায়ক। তাঁর দুর্বল শট সহজেই ঠেকিয়ে দেন বুনো। এই অর্ধে লুকাস দিঞ্জের দুর্দান্ত শট আবারও হতাশ করে ফ্রান্সকে। বল আঘাত হানে ক্রসবারে। প্রথমার্ধ শেষ হয় গোলশূন্য, কিন্তু ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ তখনও পুরোপুরি ফ্রান্সের হাতেই।

দ্বিতীয়ার্ধে কিছুটা সাহস নিয়ে খেলতে শুরু করেছিল মরক্কো। মনে হচ্ছিল, ম্যাচটা হয়তো সমানে সমান লড়াইয়েই এগোবে। কিন্তু ৬০ মিনিটে সব হিসাব পাল্টে দেন এমবাপ্পে।

বক্সের প্রান্তে বল পেয়ে এক মুহূর্তে দিওপকে কাটিয়ে বাঁকানো শটে বল পাঠিয়ে দেন জালের ওপরের কোণায়। বুনো ঝাঁপিয়েছিলেন, কিন্তু সেই শট ছিল গোলরক্ষকের নাগালের অনেক বাইরে।

এটাই খেলার মাঠে সুপারস্টারদের আসল পরিচয়। পেনাল্টি মিসের হতাশা তাঁরা বেশিক্ষণ বহন করেন না। পরের সুযোগেই ম্যাচের চিত্র বদলে দেন। এই গোলের মাধ্যমে চলতি বিশ্বকাপে এমবাপ্পের গোলসংখ্যা দাঁড়ায় ২০। গোল্ডেন বুটের লড়াইয়ে আবারও লিওনেল মেসির পাশে নিজের নাম তুলে আনেন তিনি। দুজনের গোল এই বিশ্বকাপে এখন আটটি করে।

আর কি অবাক করা কাণ্ড! আগের ম্যাচে মেসি পেনাল্টি মিস করে ওপেন ফিল্ড থেকে গোল করে তার দলের জয়ে বড় ভূমিকা রাখেন। ঠিক একই ঘটনা ঘটালেন এমবাপ্পে এই ম্যাচেও।

মরক্কো সেই ধাক্কা সামলে ওঠার আগেই আসে দ্বিতীয় আঘাত। ৬৬ মিনিটে ডান দিক দিয়ে এগিয়ে এসে বক্সের বাইরে থেকেই জোরালো শট নেন ওসমান দেম্বেলে। নিখুঁত সেই শট বুনোর প্রসারিত হাত ছুঁয়েও জালে জড়িয়ে যায়।

ছয় মিনিটে দুই গোল। ম্যাচের ভাগ্যও সেখানেই নির্ধারিত হয়ে যায়।

এই গোলের মাধ্যমে আরেকটি বিরল কীর্তিও গড়ে ফ্রান্স। ২০০২ বিশ্বকাপে ব্রাজিলের রোনালদো ও রিভালদোর পর প্রথমবারের মতো একই বিশ্বকাপে একটি দলের দুই ফুটবলার পাঁচ বা তার বেশি গোলের দেখা পেলেন। এমবাপ্পের ২০ গোলের পাশে দেম্বেলের নামেও এখন পাঁচ গোল।

৭৮ মিনিটে সামান্য চোটের ইঙ্গিত নিয়ে মাঠ ছাড়েন এমবাপ্পে। তাঁর জায়গায় নামেন জঁ-ফিলিপ মাতেতা। এরপর আরও সরাসরি ফুটবলে চলে যায় ফ্রান্স। মরক্কো শেষদিকে আক্রমণে ওঠার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু ফরাসি রক্ষণ তাদের খুব বেশি সুযোগ দেয়নি। ম্যাচ যত শেষের দিকে এগিয়েছে, ততই পরিষ্কার হয়েছে—আজকের রাতটি ফ্রান্সের।

শেষ বাঁশি বাজতেই আবারও একই স্কোরলাইন। ফ্রান্স ২, মরক্কো ০।

ইতিহাস যেন নিজেরই প্রতিচ্ছবি আঁকল। চার বছর আগে সেমিফাইনালে যে প্রতিপক্ষ মরক্কোর স্বপ্ন ভেঙেছিল, এবার সেই ফ্রান্সই বিদায় লিখে দিল কোয়ার্টার ফাইনালে।

আর বিশ্বকাপ পেল নতুন এক প্রশ্ন— এই ফ্রান্সকে থামাবে কে?

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন