ফুটবল ম্যাচের ১২০ মিনিট শেষে ভাগ্য নির্ধারণের পালা গড়ায় টাইব্রেকারে, তখন সবচেয়ে বড় প্রশ্নগুলোর একটি হয়ে দাঁড়ায়—কোন দল আগে শট নেবে? ফুটবলে বহু বছর ধরে প্রচলিত বিশ্বাস ছিল, আগে শট নেওয়া দল মানসিকভাবে এগিয়ে থাকে। প্রথম গোল করেই প্রতিপক্ষের ওপর চাপ তৈরি করা যায়, আর সেই চাপই শেষ পর্যন্ত ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করে। কিন্তু চলতি বিশ্বকাপ যেন সেই ধারণাকেই চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে।
পরিসংখ্যান বিশ্লেষণভিত্তিক ওয়েবসাইট অপ্টা অ্যানালিস্টের মতে, এবারের বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত অনুষ্ঠিত চারটি টাইব্রেকারের প্রতিটিতেই জয় পেয়েছে দ্বিতীয় শট নেওয়া দল। শুধু তাই নয়, সর্বশেষ ১৫টি বিশ্বকাপ টাইব্রেকারের ম্যাচের মধ্যে ১৩টিতেই জিতেছে পরে শট নেওয়া দল। অর্থাৎ সাফল্যের হার দাঁড়িয়েছে প্রায় ৮৭ শতাংশ। যে পরিসংখ্যান ফুটবল বিশ্লেষকদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে। ব্যতিক্রম ছিল কেবল ২০২২ বিশ্বকাপের দুটি ম্যাচ—যেখানে মরক্কো স্পেনকে এবং ক্রোয়েশিয়া ব্রাজিলকে হারিয়েছিল আগে পেনাল্টি নিয়েই।
বিশ্বকাপের ইতিহাস অবশ্য এতটা একপেশে নয়। ২০২৬ বিশ্বকাপের আগে বিশ্বকাপ ইতিহাসে মোট ৩৫টি টাইব্রেকার হয়েছিল। এর মধ্যে ১৮টিতে (৫১.৪ শতাংশ) জয় পেয়েছিল দ্বিতীয় পেনাল্টি নেওয়া দল। অর্থাৎ ব্যবধান প্রায় সমান। চলতি আসরের চারটি টাইব্রেকার যোগ হলে সেই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩৯টির মধ্যে ২২টি (৫৬.৪ শতাংশ)। অর্থাৎ ৩৯টি টাইব্রেকারের ৫৬.৪ শতাংশই দ্বিতীয় শট নিয়ে জিতেছে। তাই সামগ্রিক চিত্র এখনো খুব বেশি একপেশে নয়, তবে সাম্প্রতিক সময়ে জয়ের হার স্পষ্টভাবেই দ্বিতীয় শট নেওয়া দলের দিকেই ঝুঁকছে।
মজার বিষয় হলো, এক সময় ঠিক উল্টো চিত্রই দেখা গিয়েছিল। প্রথম ২৪টি বিশ্বকাপ টাইব্রেকারের মাত্র ৯টিতে (৩৭.৫ শতাংশ) জিতেছিল দ্বিতীয় শট নেওয়া দল। সেই সময় থেকেই মূলত ধারণা জন্ম নেয় যে, আগে শট নেওয়াই বেশি সুবিধাজনক। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই হিসাব পাল্টে গেছে।
শুধু বিশ্বকাপ নয়, ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপের পরিসংখ্যানও বলছে, আগে বা পরে শট নেওয়ার মধ্যে তেমন বড় কোনো পার্থক্য নেই। ইউরোর ইতিহাসে ২৫টি টাইব্রেকারের মধ্যে ১২টিতে জিতেছে দ্বিতীয় শট নেওয়া দল। অর্থাৎ প্রায় সমান সমান ফলাফল।
ক্লাব ফুটবলেও হিসাবটা মিশ্র ভগ্নাংশই। ইউরোপিয়ান কাপ বা চ্যাম্পিয়নস লিগের ইতিহাসে ৪২টি টাইব্রেকারের মধ্যে মাত্র ১৬টিতে জিতেছে দ্বিতীয় শট নেওয়া দল। সেখানে আগে শট নেওয়া দলের সাফল্য তুলনামূলক বেশি। তবে ইংল্যান্ডের এফএ কাপে ২০১৩-১৪ মৌসুমের পর অনুষ্ঠিত ৭৫টি টাইব্রেকারের মধ্যে ৪৩টিতেই জিতেছে দ্বিতীয় শট নেওয়া দল। গত মৌসুমে ১৭টি টাইব্রেকারের ১২টিতেই জয় এসেছে দ্বিতীয় শট নেওয়া দলের।
অন্যদিকে, একই সময়ের মধ্যে লিগ কাপে হয়েছে ২১১টি টাইব্রেকার। এর মধ্যে চারটি হয়েছিল পরীক্ষামূলক এবিবিএ পদ্ধতিতে, যেখানে শট নেওয়ার ক্রম ছিল ভিন্ন। সেই চারটি বাদ দিলে বাকি ২০৭টি টাইব্রেকারের মধ্যে ১০৪টিতে জয় পেয়েছে দ্বিতীয় দল—অর্থাৎ ৫০.২ শতাংশ। সবচেয়ে বড় নমুনার এই পরিসংখ্যানই দেখাচ্ছে, বাস্তবে দুই দলের সুযোগ প্রায় সমান।
বিশ্লেষকদের মতে, আগে শট নেওয়ার সুবিধা যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে ঝুঁকিও। শুরুতেই গোল করতে পারলে চাপ তৈরি হয় ঠিকই, কিন্তু প্রথম শটটি যদি মিস হয়, তখন পুরো মানসিক চাপ উল্টো নিজের দলের ওপর চলে আসে। সর্বশেষ ১৫টি বিশ্বকাপ টাইব্রেকারের সাতটিতে প্রথম শট নেওয়া দল শুরুতেই ব্যর্থ হয়েছে এবং সাতবারই শেষ পর্যন্ত হেরেছে। বিশ্বকাপ ইতিহাসে প্রথম শট মিস করার পর মাত্র দুটি দল ঘুরে দাঁড়িয়ে টাইব্রেকার জিততে পেরেছে—১৯৯৪ সালে সুইডেন এবং ২০০৬ সালে ইউক্রেন।
চলতি বিশ্বকাপেও একটি কৌতূহলী ও মজার তথ্য সামনে এসেছে। চারটি টাইব্রেকারের মধ্যে কেবল একবার টসে জেতা দল দ্বিতীয় পেনাল্টি নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে মিসরের জয়ে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন মোহাম্মদ সালাহ। বাকি তিন অধিনায়ক আগে শট নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, আর তিনজনই শেষ পর্যন্ত হেরে যান। অর্থাৎ অধিকাংশ অধিনায়ক এখনো প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী আগে শট নিতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছেন। কিন্তু ফলাফল বলছে, সেই সিদ্ধান্ত সব সময় সঠিক হচ্ছে না। আরেকটি ব্যাখ্যা হলো, এখানে ‘কনফারমেশন বায়াস’ ও কাজ করতে পারে। যদি কোনো দল বিশ্বাস করে যে দ্বিতীয় শট নেওয়া তাদের জন্য সুবিধাজনক, তাহলে সেই আত্মবিশ্বাসই চাপের মুহূর্তে তাদের আরো স্থির থাকতে সাহায্য করতে পারে। আবার উল্টোভাবে, আগে শট নেওয়া দল শুরুতেই অতিরিক্ত চাপ অনুভব করতে পারে।
তবে দীর্ঘ সময়ের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে ফুটবল পরিসংখ্যানবিদদের সিদ্ধান্ত একটাই—আগে বা পরে শট নেওয়ার চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো দক্ষ পেনাল্টি শুটার, গোলরক্ষকের মানসিক দৃঢ়তা এবং চাপের মুহূর্তে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা। কারণ শেষ পর্যন্ত টাইব্রেকারের সবচেয়ে বড় সত্যটি এখনো একই রয়ে গেছে—কে আগে শট নিল, তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ কে বেশি গোল করল।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

