সাম্বা নাকি সামুরাই উৎসব আজ

ব্রাজিল বনাম জাপান, কে টিকছে

Picsart_26-06-04_12-40-53-266
এম. এম. কায়সার

ব্রাজিল বনাম জাপান, কে টিকছে

ইতিহাসের ভার এক পাশে; স্বপ্নের সাহস অন্য পাশে।
একদিকে পাঁচটি বিশ্বকাপ; অন্যদিকে একটিও নকআউট জয়ের ইতিহাস নেই। এক পাশে ব্রাজিল; অন্য পাশে জাপান। বিশ্বকাপে কে টিকছে- সাম্বার উৎসব, নাকি সামুরাইর ঝলকানি? হিউস্টনে আজকের রাত তাই শুধু একটি ফুটবল ম্যাচ নয়, লড়াইটা ঐতিহ্য বনাম সাহসের। সাম্বার ছন্দের সঙ্গে সামুরাইদের শৃঙ্খলা। একটি দল নিজেদের সাম্রাজ্য ধরে রাখতে চায়, অন্যটি ইতিহাস নতুন করে লিখতে চায়।
কাগজে-কলমে ব্রাজিল এগিয়ে। মাঠে? উত্তর মিলবে আজ রাতের ম্যাচে।
গ্রুপ পর্বে ব্রাজিলের শুরুটা ব্রাজিলিয়ানার মতো ব্লকবাস্টার ধরনের কিছু হয়নি। মরক্কোর সঙ্গে ১-১ গোলের ড্রয়ের পর প্রশ্ন উঠেছিল কার্লো আনচেলত্তির দলকে নিয়ে। তবে সে প্রশ্নের উত্তর পরের দুই ম্যাচেই দিয়েছে ব্রাজিল। হাইতি ও স্কটল্যান্ডকে টানা ৩-০ গোলে উড়িয়ে দিয়ে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়ে উঠেছে সেলেসাও। প্রথম ম্যাচে গোল খাওয়ার পর টানা সাত গোল করেছে তারা, হজম করেনি একটিও।
ব্রাজিলের এই পুনর্জাগরণের কেন্দ্রে একজনই আর তিনি ভিনিসিউস জুনিয়র। তিন ম্যাচে তার চার গোল। প্রতি ম্যাচেই গোল করেছেন। এবারের বিশ্বকাপ গোলে রাঙিয়ে নিচ্ছেন ব্রাজিলের এই সুপারস্টার। ইতিহাস বলছে, ব্রাজিলের এমন গোলের ধারাবাহিকতা দেখা গেছে কেবল সেসব বিশ্বকাপে, যেগুলোর শেষে ট্রফি উঠেছে হলুদ জার্সিধারীদের হাতেই।
কী বুঝলেন? ভিনির এমন গোলের মধ্যে থাকা কি কোনো কাকতালীয় বিষয়? নাকি নতুন কোনো ইঙ্গিত? গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে দলে ফিরেছেন নেইমারও। ৯৮১ দিন পর আবার ব্রাজিলের জার্সি গায়ে নামলেন। যদিও এ বিশ্বকাপের পুরো আলো ভিনিসিউসের ওপর।
এতক্ষণ ব্রাজিলে থাকলাম। এবার ফিরি জাপানের জয়গানে। এই পুরো দলটির জন্য একটি ট্যাগলাইনই সবচেয়ে বেশি মানানসই-‘নেভার সে ডাই’! গ্রুপ পর্বে জাপানের তিন ম্যাচের বিশ্লেষণ জানাচ্ছে. তারা শুধু পরিশ্রমী নয়, আত্মবিশ্বাসীও। বিশ্বকাপের নতুন ইতিহাস লিখতে চায় জাপানের এবারের দারুণ ডিসিপ্লিনড দল।
গ্রুপ পর্বে নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে পিছিয়ে পড়েও ড্র করেছে জাপান। তিউনিসিয়াকে উড়িয়ে দিয়েছে। সুইডেনের বিপক্ষেও হারেনি। সাত গোল করে নিজেদের বিশ্বকাপ ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি গোলের রেকর্ড গড়েছে তারা। সবচেয়ে বড় কথা, এ দলের আক্রমণ একক কারো ওপর নির্ভরশীল নয়। ১০ জন ভিন্ন খেলোয়াড় গোল কিংবা অ্যাসিস্টে অবদান রেখেছেন। এ দল একে নয়, দশে বিশ্বাসী। দলীয় শক্তিটাই জাপানের সেরা অস্ত্র।
ব্রাজিলকে যে এই জাপান হারাতে পারে- সে উদাহরণও বেশি দূরের নয়। গত অক্টোবরে টোকিওতে প্রীতি ম্যাচে ব্রাজিলকে ৩-২ গোলে হারিয়েছিল জাপান। সবচেয়ে বড় কথা হলো, সে ম্যাচে দুই গোলে পিছিয়ে থেকেও শেষমেশ ম্যাচ জিতেছিল জাপান। জয়সূচক গোল করেছিলেন আয়াসে উয়েদা। ইতিহাসে ব্রাজিলের বিপক্ষে সেটিই জাপানের প্রথম জয়। ব্রাজিলের বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত সেটাই জাপানের একমাত্র জয়। আর সে জয়ের নায়ক আয়াসে উয়েদা আজকের জাপান একাদশেও থাকছেন।
ব্রাজিল কোচ কার্লো আনচেলত্তিকে সেই দুঃস্মৃতি মনে করিয়ে দিতে তিনি হাত নেড়ে জানালেন, ওটা ছিল অসম্পূর্ণ এক ব্রাজিল দল। এবারের দল পূর্ণ শক্তির। আর দলটিও তারই গড়া।
বিশ্বকাপে দুদলের একবার মাত্র দেখা হয়েছে। তাও আবার ২০ বছর আগে, ২০০৬ সালে। জাপান আগে গোল করেও সে ম্যাচে হেরেছিল ৪-১-এ। সে ম্যাচেই রোনালদো স্পর্শ করেছিলেন গার্ড মুলারের ১৪ বিশ্বকাপ গোলের রেকর্ড। দুই দশক পর আবার মুখোমুখি দুদেশ। তবে সময় বদলেছে, বদলেছে জাপানের সাহসও।
রাফিনহার চোটের দুশ্চিন্তা নিয়েই ব্রাজিল রয়েছে এই ম্যাচে। একাদশে তার জায়গায় তরুণ রায়ানকে খেলানোর পরিকল্পনা করছে ব্রাজিল। অন্যদিকে জাপানের সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা তাকেফুসা কুবোকে ঘিরে। তার না থাকা আক্রমণে বড় ধাক্কা হতে পারে।
এ ম্যাচের আসল লড়াইটা অবশ্য মাঝমাঠে। ব্রাজিল চাইবে গতি বাড়াতে, জাপান চাইবে ছন্দ ভাঙতে। একদিকে ভিনিসিউসের বিস্ফোরণ, অন্যদিকে জাপানি গোলকিপার জিওন সুজুকির শেষ প্রহরা। একদিকে সাম্বার স্বকীয়তা, স্বাধীনতা; অন্যদিকে সামুরাইদের শৃঙ্খলা।
বিশ্বকাপের নকআউট পর্ব এমনই। এখানে অতীত সম্মান এনে দেয়, জয় এনে দেয় না। জেতায় কিন্তু স্রেফ ওইদিনের পারফরম্যান্স। আজকের ম্যাচ তাই সংশয় নিয়ে প্রশ্ন করছে, আজ পাঁচ তারকার আকাশ কি আরো উজ্জ্বল হবে, নাকি সামুরাইদের ধারালো তলোয়ার বিশ্বকাপ ইতিহাস লিখবে?

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন