৩৪ ম্যাচের ‘অবিনাশী’ মরক্কো

c43f2031-a2c6-4b68-9d2e-b872b4482a0e-02-03
আরিফুল হক বিজয়

৩৪ ম্যাচের ‘অবিনাশী’ মরক্কো

বিশ্বকাপ এলেই নতুন কোনো রূপকথা হাজির হয়। অপরিচিত কোনো দেশ হঠাৎ উদয় হয় হ্যালির ধূমকেতুর মতো, কেউ আবার আলোর রেখা ধরে এগিয়ে আসে আরো উজ্জ্বল হয়ে, আর আমরা বলি—‘সিন্ডারেলার গল্প’। মরক্কোর নামও সেই তালিকায় জুড়ে দিতে চান অনেকে। কিন্তু সত্যি বলতে, মরক্কোর এই যাত্রা রূপকথা নয়। আটলাস পর্বতের পাদদেশে সৃষ্ট লড়াই এখন ‘গ্রেটেস্ট শো অন দ্য আর্থ’-এ বিস্ময়কর বাস্তব। বহু বছর ধরে মাটির নিচে শিকড় ছড়িয়ে বেড়ে ওঠা এক বটগাছের গল্প।

বিশ্বকাপের শেষ ষোলোতে কানাডার বিপক্ষে ৩-০ গোলের জয়টি দেখলে অনেকেই বিভ্রান্ত হতে পারেন। মনে হতে পারে, সহজ এক বিকেলের গল্প। অথচ ম্যাচের প্রথম পনেরো মিনিটে বল যেন শুধু কানাডারই ছিল। মরক্কোর রক্ষণ বারবার পরীক্ষায় পড়েছে, ইয়াসিন বোনুকে দু-দুবার জীবন বাঁচানো সেভ করতে হয়েছে। তবে এটা খুব স্বাভাবিক, অন্তত মরক্কোর কাছে। বড় দলের পরিচয়, তারা ঝড়ের দিকে তাকিয়ে ভয় পায় না, ঝড় কেটে যাওয়ার অপেক্ষা করতে জানে। এই মরক্কো সুন্দর ফুটবলের পূজারি নয়। তারা জানে, বিশ্বকাপে সৌন্দর্যের জন্য ট্রফি দেওয়া হয় না; দেওয়া হয় জয়ীদের। তাই কখনো শিল্পী, কখনো সৈনিক—দুই চরিত্রেই সমান স্বাচ্ছন্দ্য আটলাসের সিংহরা।

কানাডাকে হারিয়ে মরক্কো টানা ৩৪ ম্যাচ অপরাজিত রইল। সংখ্যাটি শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়, এটি ধারাবাহিকতার আরেক নাম। ২০২৫ সালের আগস্টে কেনিয়ার কাছে হারের পর থেকে আর কোনো দল তাদের হাঁটু গেড়ে বসাতে পারেনি। বিশ্বকাপ, আফ্রিকান বাছাই, আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচ; সব জায়গাতেই তারা এক অদ্ভুত স্থিরতায় নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছে।

একসময় আফ্রিকার দলগুলো বিশ্বকাপে ‘অতিথি’ ছিল। তারা আসত, কিছু স্মৃতি রেখে চলে যেত। মরক্কো সেই ধারণা বদলে দিয়েছে। ২০২২ সালে প্রথম আফ্রিকান দেশ হিসেবে সেমিফাইনাল খেলে তারা ইতিহাস লিখেছিল। এবার উত্তর আমেরিকার মাটিতে আবার কোয়ার্টার ফাইনালে। এখন আর তাদের সাফল্যকে বিস্ময় বলা যায় না; বরং ব্যর্থ হলে সেটাই হবে বিস্ময়।

মরক্কোর কোচ মোহাম্মদ ওহাবি ম্যাচ শেষে বলেছিলেন, ‘সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আমরা আমাদের পরিচয় বদলাইনি। কঠিন মুহূর্ত এসেছে, কিন্তু আমরা ভুলে যাইনি আমরা কার জন্য খেলছি।’ কথাটি শুধু একটি সংবাদ সম্মেলনের বক্তব্য নয়, পুরো মরক্কোর ফুটবল দর্শনের প্রতিচ্ছবি। কারণ এই দল শুধু এগারো জন ফুটবলারের সমষ্টি নয়। তারা একটি জাতির আত্মবিশ্বাসের প্রতীক।

এই আত্মবিশ্বাস কিন্তু রাতারাতি জন্ম নেয়নি। ২০০৯ সালে যে ফুটবল একাডেমির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়েছিল, ২০১৯ সালে যে আধুনিক প্রশিক্ষণ কমপ্লেক্স তৈরি হয়েছিল, আজকের এই মরক্কো তারই ফল। কোটি কোটি ডলারের বিনিয়োগ, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, ইউরোপে বেড়ে ওঠা মরক্কান বংশোদ্ভূত ফুটবলারদের জাতীয় দলে ফিরিয়ে আনা—সবকিছু মিলিয়ে ধীরে ধীরে তৈরি হয়েছে নতুন শক্তি। আশরাফ হাকিমি, ব্রাহিম দিয়াজদের অনেকে স্পেনে জন্মেছেন, ইউরোপীয় ফুটবলে বড় হয়েছেন। কিন্তু হৃদয়ের টান শেষ পর্যন্ত ফিরিয়ে এনেছে লাল-সবুজ জার্সিতে। তারা শুধু প্রতিভা নয়, দুই সংস্কৃতির সেতুবন্ধও।

কানাডার বিপক্ষে ম্যাচে হাকিমি ছিলেন অধিনায়কের মতোই নেতৃত্বের প্রতীক। ব্রাহিম দিয়াজ করলেন দুই অ্যাসিস্ট। আর আজেদিন উনায়ি দেখালেন, বড় ম্যাচে একজন মিডফিল্ডার কীভাবে পুরো ম্যাচের গতিপথ বদলে দিতে পারেন। সুফিয়ান রাহিমি আবার বদলি নেমে গোল করলেন, যেন বেঞ্চও এই দলের আরেকটি অস্ত্র। মরক্কোর সবচেয়ে বড় শক্তি হয়তো কোনো নির্দিষ্ট খেলোয়াড় নন। তাদের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তারা জানে কখন আক্রমণ করতে হয়, কখন অপেক্ষা করতে হয় আর কখন প্রতিপক্ষের ধৈর্য ভেঙে দিতে হয়।

সামনে ফ্রান্স। আরো কঠিন পরীক্ষা। আরো বড় মঞ্চ। কানাডার বিপক্ষে প্রথমার্ধের খেলাটা খেললে ফ্রান্স ছেড়ে কথা বলবে না। কথাটা সত্যি। কিন্তু এটাও সত্যি, এই মরক্কো প্রতিটি ম্যাচে আরো শক্তিশালী হয়ে উঠছে। চার বছর আগে কাতারে তাদের সাফল্যের দিকে পৃথিবী বিস্ময়ের চোখে তাকিয়েছিল। এবার আর বিস্ময় নেই। আছে প্রত্যাশা। এটাই সবচেয়ে বড় পরিবর্তন।

মরক্কো আর কোনো রূপকথার চরিত্র নয়। তারা এখন এমন এক দল, যাদের সামনে দাঁড়িয়ে বিশ্বচ্যাম্পিয়নরাও হিসাব কষে। আফ্রিকার ফুটবল বহুদিন ধরে সূর্যোদয়ের অপেক্ষায় ছিল। সেই সূর্য হয়তো এখনো পুরোপুরি আকাশে ওঠেনি। কিন্তু দিগন্ত লাল হয়ে গেছে অনেক আগেই। আর সেই লাল আভাটির নাম মরক্কো, ‘দ্য আটলাস লায়ন্স’।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ

এলাকার খবর
Loading...