একাধিক ফ্রন্টে টানা ১ হাজার দিন ধরে লড়াই করেও একটিও চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করতে পারেনি ইসরাইল।
ইসরাইলের প্রভাবশালী গণমাধ্যম চ্যানেল ১৩ এই তথ্য স্বীকার করেছে।
চ্যানেলটির মূল্যায়ন অনুযায়ী, এই যুদ্ধ থেকে ইরান আরো শক্তিশালী অবস্থান নিয়ে বের হয়ে এসেছে। তেহরান এক ধরনের আন্তর্জাতিক বৈধতা অর্জন করেছে এবং তাদের অর্থনীতিও ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে। যুদ্ধ কেবল ইসরাইলের মানবসম্পদ, অর্থনীতি ও মনস্তাত্ত্বিক ক্ষতিই করেনি, বরং দেশটির আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক অবস্থানকেও দুর্বল করে দিয়েছে।
মার্কিন-ইসরাইল সম্পর্কে ফাটল
চ্যানেল ১৩ আরো জানিয়েছে, ইরানের সঙ্গে এই যুদ্ধ যেভাবে পরিচালনা করা হয়েছে, তা ইসরাইলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সম্পদ তথা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কে বড় ধরনের ফাটল ধরিয়েছে।
এদিকে ইসরাইলের চ্যানেল ১২ জানিয়েছে, ৭ অক্টোবর ২০২৩-এর পর থেকে ১ হাজার দিন পেরিয়ে গেছে। যারা এই ব্যর্থতার জন্য দায়ী, তারা শুরুতে 'পূর্ণাঙ্গ বিজয়ের' প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। অথচ এখন প্রতিটি ফ্রন্টেই ইসরাইল চরম ব্যর্থতার সম্মুখীন হচ্ছে।
চ্যানেলটি উল্লেখ করেছে, ইরানে বর্তমান ব্যবস্থার পতন ঘটানো যায়নি, দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস করা সম্ভব হয়নি এবং তাদের ক্ষেপণাস্ত্রের হুমকিও শেষ করা যায়নি। অন্যদিকে, লেবাননের ফ্রন্টেও ইসরাইলকে চড়া মূল্য দিতে হচ্ছে।
ইসরাইলি চ্যানেল 'কান' মনে করে, গাজা থেকে শুরু হওয়া এই ব্যর্থতা এখন লেবানন, সিরিয়া, ইয়েমেন, পশ্চিম তীর এবং অবশ্যই ইরানের যুদ্ধক্ষেত্রেও ছড়িয়ে পড়েছে।
নেতানিয়াহুর ওপর দায়
ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই এই সব ব্যর্থতার জন্য ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ওপর তীব্র সমালোচনা ধেয়ে আসছে।
ইসরাইলি ওয়েবসাইট 'জমান ইসরাইল' স্বীকার করেছে, দেশটির ইতিহাসে এত বড় ব্যর্থতা আর কখনো দেখা যায়নি। নেতানিয়াহুর বছরের পর বছর ধরে চালানো নিরাপত্তা তত্ত্ব এখন খড়কুটোর মতো উড়ে যাচ্ছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক মহলে ইসরাইলের সমর্থন কমছে। যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহ্যগত সমর্থনপুষ্ট গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট হচ্ছে। ফলে পুরো জায়নবাদী প্রকল্পটি বৈশ্বিক মঞ্চে ক্রমশ একাকী হয়ে পড়ছে। নেতানিয়াহু ইসরাইলের জন্য একটি 'কৌশলগত বিপর্যয়' ডেকে এনেছেন বলে সাইটটি মন্তব্য করেছে।
ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ যোদ্ধাদের বিবৃতি
গাজা উপত্যকায় ইসরাইলি অভিযানের ১ হাজারতম দিনে গত বৃহস্পতিবার ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ দলগুলো একটি যৌথ বিবৃতি দিয়েছে। তারা স্পষ্ট জানিয়েছে, ইসরাইল তাদের সামরিক লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে। ফিলিস্তিনের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে কোনো ধরনের বিদেশি অভিভাবকত্ব বা হস্তক্ষেপ তারা মেনে নেবে না।
বিবৃতিতে বলা হয়, যুদ্ধের শুরুতে ইসরাইল ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদ ও বাস্তুচ্যুত করার যে পরিকল্পনা করেছিল, তা পুরোপুরি ভেস্তে গেছে। গাজায় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ ও মানবিক বিপর্যয় চললেও তা মানুষের মনোবল ভাঙতে পারেনি।
তারা জানায়, আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত জায়নবাদী-আমেরিকান ও পশ্চিমা ঔপনিবেশিক ব্যবস্থার মুখোমুখি দাঁড়িয়েও ফিলিস্তিনিদের প্রতিরোধ স্পৃহা দমে যায়নি। গাজা যে প্রতিরোধের আগুন জ্বালিয়েছে, তা আর নেভানো সম্ভব নয়।
প্রতিরোধ দলগুলো জোর দিয়ে বলেছে, ৭ অক্টোবর ২০২৩-এর 'আল-আকসা ফ্লাড' অভিযানটি হঠাৎ শুরু হওয়া কিছু নয়। এটি ১৯৪৮ সাল থেকে চলে আসা দীর্ঘ সংগ্রামের একটি ধারাবাহিক অংশ। গাজা, অধিকৃত পশ্চিম তীর, আল-কুদসে ইসরাইলের নিরবচ্ছিন্ন অপরাধ, অবরোধ এবং বসতি স্থাপনের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে এটি ছিল একটি স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া। অক্টোবরের অভিযানকে যারা যুদ্ধের শুরুর পয়েন্ট হিসেবে দেখাতে চায়, তাদের সতর্ক করে দলগুলো মনে করিয়ে দেয় যে, শত্রুদের অপরাধ এক দিনের জন্যও বন্ধ ছিল না।
বিদেশি হস্তক্ষেপ প্রত্যাখ্যান ও রাজনৈতিক অংশীদারিত্ব
ফিলিস্তিনের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নিয়ে প্রতিরোধ দলগুলো জানায়, গাজা উপত্যকার প্রশাসন কীভাবে চলবে, তা সম্পূর্ণ ফিলিস্তিনিদের নিজস্ব বিষয়। তারা প্রশাসনিক 'টেকনোক্র্যাট কমিটি'-কে দ্রুত গাজায় প্রবেশ করে দায়িত্ব নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে একটি ব্যাপকভিত্তিক জাতীয় সংলাপ শুরুর তাগিদ দিয়েছে।
তাদের মতে, এই সংলাপের মাধ্যমে প্রকৃত রাজনৈতিক অংশীদারিত্ব তৈরি হবে এবং প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশন (পিএলও) সহ জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলো পুনর্গঠন করা সম্ভব হবে, যাতে সব ফিলিস্তিনির সঠিক প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত হয়।
বিবৃতিতে আরব ও মুসলিম বিশ্বের প্রতি আহ্বান জানানো হয় যেন তারা একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধবিরতি কার্যকরে চাপ প্রয়োগ করে এবং ইসরাইলের সঙ্গে সব ধরনের সম্পর্ক স্বাভাবিককরণের বিরুদ্ধে জনগণকে সংগঠিত করে।
সবশেষে গাজা, পশ্চিম তীর ও অন্যান্য ফ্রন্টে নিহত শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে বিবৃতিটি শেষ করা হয়।
সূত্র: আল মায়াদিনে
এএম
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


