গত ১৭ জুন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ফ্রান্সের ভার্সাই প্রাসাদে ইরানের সঙ্গে একটি প্রাথমিক চুক্তি করেন। এই চুক্তির আগে তিনি ও তার সহযোগীরা বলেছিলেন, হরমুজ প্রণালি আবার জাহাজ চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হবে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে আবার তেল বিক্রি করার সুযোগ দেবে, যাতে ইরান শত শত কোটি ডলার উপার্জন করতে পারে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ধারণা ছিল, বহু বছর ধরে নিষেধাজ্ঞায় থাকা ইরান যখন আবার তেল বিক্রি করে বিপুল অর্থ পাবে, তখন তারা নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার এই সুবিধা হারাতে চাইবে না এবং শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখবে।
ট্রাম্পের ধারণা ছিল, বহু বছর ধরে নিষেধাজ্ঞায় থাকা ইরান যখন আবার তেল বিক্রি করে বিপুল অর্থ পাবে, তখন তারা নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার এই সুবিধা হারাতে চাইবে না এবং শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখবে।
তিনি বলেছিলেন, ‘এটা ইরানের জন্য খুব ভালো চুক্তি। তারা বারবার হামলার শিকার হয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে।’
কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি।
চুক্তির এক মাসও পার হয়নি, এর মধ্যেই হরমুজ প্রণালির কাছে তিনটি জাহাজে হামলা হয়েছে। এরপর ট্রাম্প ইরানকে তেল বিক্রির যে অনুমতি দিয়েছিলেন, তা বাতিল করে দেন। যুক্তরাষ্ট্র দুই রাত ধরে ইরানের ১৭০টিরও বেশি সামরিক স্থাপনায় বোমা হামলা চালায়।
এখন দুই দেশের মধ্যে নতুন আলোচনা হওয়ারও কোনো সময়সূচি ঠিক করা নেই।
অর্থাৎ, ট্রাম্পের আগের দুটি পরিকল্পনা—বোমা হামলা ও চুক্তি—দুটিই ব্যর্থ হয়েছে। এখন তার নতুন কোনো পরিকল্পনা আছে কি না, সেটিও পরিষ্কার নয়।
এখন যুক্তরাষ্ট্র আবার আগের মতো অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও সামরিক হামলার পথেই ফিরছে।
মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বলেছেন, ‘যদি তারা জাহাজে হামলা করে, তাহলে আমরা তাদের ওপর কঠোর হামলা চালাব।’
কিন্তু অনেক বিশেষজ্ঞ প্রশ্ন তুলছেন—আগেও যখন নিষেধাজ্ঞা ও হামলা কাজ করেনি, এবার কেন করবে?
সাবেক মার্কিন কূটনীতিক রিচার্ড হাস বলেন, ‘আমরা এখন এমন এক অবস্থায় আছি, যেখানে কোনো ভালো কৌশল দেখা যাচ্ছে না।’
তিনি আরো বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যত বেশি ইরানে হামলা করছে, ইরান তত বেশি উপসাগরের তেল ও জ্বালানি স্থাপনায় হামলা করছে। আর যুক্তরাষ্ট্র এখন এসব স্থাপনা পুরোপুরি রক্ষা করতে পারছে না।
তিনি বলেন, ট্রাম্প প্রথমে ভেবেছিলেন বোমা মেরে ইরানের সরকার বদলে ফেলবেন। পরে ভেবেছিলেন, বোমা মেরে ইরানকে আত্মসমর্পণ করানো যাবে। কিন্তু কোনোটাই সফল হয়নি।
এরপর ট্রাম্প ইরানকে তেল বিক্রির সুযোগ দিয়ে সম্পর্ক ভালো করার চেষ্টা করেন। কিন্তু সেটিও ব্যর্থ হয়েছে।
ইরানের ভেতরেও এখন বড় ধরনের রাজনৈতিক বিভক্তি রয়েছে।
সাম্প্রতিক হামলায় সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হওয়ার পর তার জানাজায় অনেক মানুষ সরকারের ওপর ক্ষুব্ধ ছিল।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির দিকে পাথর ছোড়া হয় এবং তাকে ‘সমঝোতাকারী’ বলে গালি দেওয়া হয়। এমনকি তার মৃত্যু কামনা স্লোগানও দেওয়া হয়।
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানকেও বিক্ষুব্ধ জনতার হাত থেকে নিরাপত্তারক্ষীরা সরিয়ে নিতে বাধ্য হন।
তবে ট্রাম্প সাধারণত এসব অভ্যন্তরীণ বিভক্তির কথা বলেন না। তিনি এমনভাবে কথা বলেন যেন ইরানের সব সিদ্ধান্ত একদল নেতা সহজেই নিয়ে থাকে।
এখনো যুক্তরাষ্ট্র বলছে, তারা শান্তিপূর্ণ সমাধান চায় এবং ভবিষ্যতে আবার আলোচনা হতে পারে।
কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সমস্যাগুলো শুধু প্রযুক্তিগত নয়; এগুলো পুরোপুরি রাজনৈতিক। তাই প্রশাসনের নিচের দিকের কর্মকর্তারা এগুলোর সমাধান করতে পারবেন না।
সবচেয়ে বড় বিরোধের একটি হলো ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি। ইরান তাদের পারমাণবিক জ্বালানি রেখে দিতে পারবে, নাকি তা অন্য কোথাও পাঠাতে হবে- নতুন চুক্তিতে তা পরিষ্কারভাবে বলা হয়নি।
২০১৫ সালের ওবামা সরকারের চুক্তিতে ইরান তাদের পারমাণবিক জ্বালানির ৯৭ শতাংশ ছেড়ে দিয়েছিল।
ট্রাম্প চান না এমন কোনো চুক্তি করতে, যাতে তিনি ওবামার চেয়ে কম কিছু পান।
আরেকটি বড় সমস্যা হলো হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ। চুক্তিতে লেখা ছিল, ইরান সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে যাতে জাহাজ নিরাপদে চলতে পারে।
কিন্তু দুই দেশ এই কথার অর্থ আলাদাভাবে বুঝেছে। যুক্তরাষ্ট্র ভেবেছিল, ইরান শুধু নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। ইরান ভেবেছে, তারা ঠিক করবে কোন পথে জাহাজ চলবে এবং ভবিষ্যতে সেই পথ ব্যবহার করতে অর্থও নেবে।
এরপর মার্কিন নৌবাহিনী ওমানের কাছের অন্য একটি পথ দিয়ে জাহাজ চলাচল করাতে শুরু করলে ইরান কিছু জাহাজে গুলি চালায়।
ফলে এখন বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই সমুদ্রপথে জাহাজ চলাচল অনেক কমে গেছে।
এতে ট্রাম্প ক্ষুব্ধ হয়ে ঘোষণা করেন যে এই চুক্তি এখন আর কার্যকর নয়।
তবে ট্রাম্প প্রশাসন বলছে, চুক্তি ভঙ্গ করেছে ইরান, যুক্তরাষ্ট্র নয়। কারণ তাদের মতে, চুক্তি কার্যকর থাকবে কি না, তা ইরানের আচরণের ওপর নির্ভর করছিল।
সব মিলিয়ে পরিস্থিতি আবার আগের জায়গায় ফিরে এসেছে।
ট্রাম্প বুঝতে পারছেন, শুধু সামরিক শক্তি দিয়ে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। অন্যদিকে, ইরানিও বিশ্বাস করেন যে কূটনৈতিক আলোচনা শুধু সময়ক্ষেপণের একটি উপায়; পরে আবার যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরাইল হামলা চালাতে পারে।
আরএ
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন



ইরানের কাছ থেকে হরমুজে হামলা বন্ধের অঙ্গীকার চায় যুক্তরাষ্ট্র
ইরানের দিকে তাক করা আছে ১০০০ ক্ষেপণাস্ত্র: ট্রাম্প