ডেভিড ও অ্যালি (ছদ্মনাম) যখন প্রথম মার্কাসকে দেখেন, তখনই তাকে নিজেদের সন্তান হিসেবে গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেন। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর ইন্দোনেশিয়া থেকে আসা ওই শিশুকে কোলে পেয়ে তারা নতুন জীবন শুরু করেছিলেন। কিন্তু কয়েক বছর পর এখন তারা মার্কাসকে হারানোর ঝুঁকিতে পড়েছেন। কারণ ধারণা করা হচ্ছে, মার্কাসকে অবৈধভাবে পাচার করে সিঙ্গাপুরে আনা হয়েছিল।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সিঙ্গাপুরে দত্তক নেওয়ার জন্য ইন্দোনেশিয়া থেকে অবৈধভাবে কেনা অন্তত ২০টি শিশুর মধ্যে মার্কাস একজন। গত বছর ইন্দোনেশিয়ার পশ্চিম জাভায় মানব পাচারের অভিযোগে ২৪-এর অধিক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং বর্তমানে সেখানে তাদের বিচার চলছে। এর ফলে কর্তৃপক্ষকে এখন সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে যে, মার্কাসসহ অন্যান্য শিশুরা সিঙ্গাপুরের দত্তক নেওয়া মা-বাবার কাছে থাকবে না-কি ইন্দোনেশিয়ায় তাদের আসল মা-বাবার কাছে ফিরে যাবে।
উভয় দেশই এখনো শিশুদের ভবিষ্যৎ নিয়ে স্পষ্ট কিছু জানায়নি। ডেভিড ও অ্যালি এখন চরম উদ্বেগের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। এই ঘটনাটি ইন্দোনেশিয়ায় শিশু পাচারের দীর্ঘস্থায়ী সমস্যাকে আবার সামনে এনেছে, যেখানে অনেক অভাবী মা-বাবা নিজের সন্তান বিক্রি করে দিচ্ছেন। পাশাপাশি কঠোর নজরদারির দেশ হিসেবে পরিচিত সিঙ্গাপুর কীভাবে এই পাচার শনাক্ত করতে ব্যর্থ হলো এবং দত্তক নেওয়ার অনুমোদন দিল, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
'সে আমাদের দেখে হেসেছিল'
ডেভিড ও অ্যালি সন্তান চেয়েছিলেন। কিন্তু অ্যালির পর পর কয়েকবার গর্ভপাত হওয়ার পর তারা শিশু দত্তক নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। সিঙ্গাপুরের একটি সংস্থায় আবেদন করে তারা দেখেন লাইনে ১৪২ নম্বরে আছেন। দীর্ঘ অপেক্ষার কারণে তারা বিদেশ থেকে শিশু দত্তক নেওয়ার পথ বেছে নেন। সিঙ্গাপুরে প্রতি বছর দত্তক নেওয়া শিশুদের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই অন্য দেশের হয়ে থাকে।
তারা ইন্দোনেশিয়ার শিশু দত্তক দেওয়ায় বিশেষজ্ঞ একটি স্থানীয় এজেন্সির সঙ্গে যোগাযোগ করেন। ভিডিও কলে প্রথমবার শিশুটিকে দেখে ডেভিড বলেন, ‘সে খুব বুদ্ধিমান এবং আমাদের দেখে হেসেছিল।’
তারা এজেন্সির ফি, আইনি খরচ ও আসল মা-বাবার জন্য টোকেন মানি হিসেবে হাজার হাজার ডলার পরিশোধ করেন। কয়েক মাসের মধ্যে মার্কাসকে সিঙ্গাপুরে আনা হয়।
সিঙ্গাপুরে মার্কাসের দত্তক প্রক্রিয়া দ্রুত অনুমোদিত হয়। এরপর তার নাগরিকত্বের আবেদন করা হলে ইমিগ্রেশন কর্মকর্তারা তাদের ডেকে জানান, নাগরিকত্বের আবেদন স্থগিত করা হয়েছে এবং মার্কাস সম্ভবত পাচার হয়ে এসেছে।
ডেভিড বলেন, সিঙ্গাপুর সরকারের আরো ভালো করে খোঁজ নেওয়া উচিত ছিল। তারা সব নিয়ম মেনেই প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করেছিলেন।
যেভাবে চলত পাচার চক্র
পশ্চিম জাভায় বর্তমানে ১৯ জন অভিযুক্তের বিচার চলছে। তাদের বিরুদ্ধে জাল কাগজপত্র তৈরি করে আইনি দত্তক দেখানোর মাধ্যমে শিশুদের অবৈধভাবে কিনে বিদেশে পাচারের অভিযোগ রয়েছে।
আদালত সূত্রে জানা গেছে, ২০টি শিশুর মধ্যে অন্তত ১২টি শিশু ইতোমধ্যে সিঙ্গাপুরে প্রবেশ করেছে।
প্রসিকিউটরদের দাবি, লি সিউ লুয়ান নামের এক ইন্দোনেশিয়ান নারী এই চক্রের মূল হোতা।
লি স্বীকার করেছেন, তিনি সিঙ্গাপুরের চারজন এজেন্টের কাছে শিশু সরবরাহ করতেন। তারা প্রতি শিশুর জন্য অন্তত ১৮ হাজার সিঙ্গাপুরি ডলার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। লি দালাল নিয়োগ, শিশু সংগ্রহ, আয়া দিয়ে লালন-পালন এবং ভুয়া জন্মসনদ তৈরির কাজ করতেন। দালালরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সন্তান দত্তক দিতে ইচ্ছুক মা-বাবার খোঁজ করত। কাগজের কলমে চক্রের সদস্যরা নিজেদের শিশুর আসল মা-বাবা সাজত এবং ভিডিও কলেও অংশ নিত।
প্রসিকিউটররা আসামিদের ৫ থেকে ১০ বছরের কারাদণ্ড দাবি করেছেন।
বিবিসি তদন্তে দেখেছে, আদালতের নথিতে পাচার হওয়া শিশুদের তালিকায় মার্কাসের পূর্ণ ইন্দোনেশীয় নাম রয়েছে। আদালতে যে নারী নিজেকে ভুয়া মা দাবি করেছেন, তার নামই মার্কাসের ইন্দোনেশীয় নথিতে রয়েছে। ইন্টারপোলও নিশ্চিত করেছে, যে এজেন্সি মার্কাসকে এনেছিল, সেটিই এই পাচারের সঙ্গে যুক্ত।
সিঙ্গাপুরের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ইন্দোনেশিয়ার আদালতের প্রক্রিয়া চলমান থাকায় তারা এখনই এ বিষয়ে বিস্তারিত মন্তব্য করবে না। তবে তারা তদন্তে সহযোগিতা করছে এবং দত্তক নেওয়ার প্রক্রিয়াটি পর্যালোচনা করবে।
শিশুদের ভাগ্যে কী আছে?
ইন্দোনেশিয়ায় গত কয়েক বছরে অন্তত ৭টি শিশু পাচারকারী চক্রের সন্ধান মিলেছে। ২০২১ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে পাচার হওয়া শিশুর সংখ্যা প্রায় তিন গুণ বেড়েছে। অনেক মা-বাবা দারিদ্র্যের কারণে বা বাধ্য হয়ে সন্তান বিক্রি করেছেন।
পশ্চিম জাভার আদালতে দানি হিদায়াত নামে এক সাক্ষী জানান, দেউলিয়া ও বেকার থাকার সময় পঞ্চম সন্তানের জন্মের খরচ চালাতে তিনি ৫ মিলিয়ন রুপিয়ার বিনিময়ে সন্তান দিতে রাজি হন। পরে দ্বিতীয় কিস্তির টাকা না পেয়ে তিনি পুলিশের কাছে অপহরণের অভিযোগ করেন, যার ফলে এই চক্র ধরা পড়ে।
ইন্দোনেশিয়ার শিশু অধিকার কর্মী ও কর্মকর্তারা মনে করেন, পাচার হওয়া শিশুদের তাদের আসল মা-বাবার কাছে ফিরিয়ে দেওয়া উচিত।
অন্যদিকে সিঙ্গাপুর চিলড্রেনস সোসাইটির জ্যেষ্ঠ ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট জেরেমি হেং বলেন, শৈশবে বারবার পরিবেশ পরিবর্তন শিশুর মানসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
ইন্দোনেশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইভন মেওয়েংকাং জানান, তারা শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থ ও সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দেবেন। তবে ডেভিড তার সন্তানকে সহজে ছাড়তে রাজি নন।
তিনি বলেন, ‘আমি আইনিভাবে লড়াই করব। যেকোনো মা-বাবাই শেষ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাবেন।’
এএম
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

