দুর্ভোগের রাজধানী

চলাচলের অনুপযোগী বহু সড়ক

Mahmuda Doly
মাহমুদা ডলি

চলাচলের অনুপযোগী বহু সড়ক

রাজধানীর মূল সড়ক থেকে শুরু করে অলিগলি—সবই যেন মৃত্যুকূপ। এবড়ো-থেবড়ো, খানাখন্দে ভরা সড়কগুলোতে স্বাভাবিক চলাচল প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। কোথাও কোথাও পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, ঘর থেকে বের হওয়াই দুষ্কর। চলাচলের প্রায় অযোগ্য এসব সড়কে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ চরমে। ছোট-বড় অসংখ্য গর্তে পানি জমে অনেক জায়গা ডোবায় পরিণত হয়েছে। গর্ত এড়িয়ে চলতে গিয়ে যানবাহনগুলো পড়ছে আরো বিপদে। রাজধানীর বহু সড়কের চিত্র এখন এমনই।

ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ সড়ক বর্তমানে ভাঙাচোরা অবস্থায় রয়েছে। কোথাও ছোট-বড় গর্ত ও খানাখন্দ, কোথাও উন্নয়ন কাজের নামে দীর্ঘদিনের খোঁড়াখুঁড়ি, আবার কোথাও বিপজ্জনকভাবে খোলা পড়ে আছে সুয়ারেজ লাইন ও ম্যানহোল। রাজধানীর কয়েকটি ভিআইপি সড়ক ছাড়া প্রায় সব সড়কই কার্যত চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। এমন কোনো রাস্তা খুঁজে পাওয়া কঠিন, যেখানে যানবাহন লক্কর-ঝক্কর করে চলে না।

বিজ্ঞাপন

জানা গেছে, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের নতুন যুক্ত ১৮টি ওয়ার্ডের বাসিন্দা রয়েছেন চরম দুর্ভোগে। সিটি করপোরেশনের সব ধরনের কর পরিশোধ করলেও তারা নগরসেবার মৌলিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত। বছরের প্রায় ছয় মাস রাস্তাঘাট, স্যুয়ারেজ লাইন ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার অভাবে এসব এলাকা জলাবদ্ধতায় ডুবে থাকে।

সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা যায়, সায়েদাবাদ থেকে খিলগাঁওগামী পথে খিলগাঁও উড়াল সড়কের মুখ থেকে নন্দীপাড়া ব্রিজ পর্যন্ত বাসাবো-মাদারটেক সড়কটি খানাখন্দে ভরা। কোথাও বড় বড় গর্ত, যেগুলোতে সাময়িকভাবে ইট বিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। সড়কটির বেহাল অবস্থার কারণে দিনভর লেগেই থাকে যানজট।

নিকুঞ্জ–২ এর সরকার বাড়ি রোডে হাজী নুরুজ্জামান সরকারের ‘শান্তির ছায়া টু নাগরিক টিভি সংলগ্ন রাস্তা’ নামটি যতটা শান্তির ইঙ্গিত দেয়, বাস্তব চিত্র ঠিক তার উল্টো। ধীরগতির নির্মাণ কাজের কারণে সামান্য বৃষ্টিতেই রাস্তাটি হাঁটুসমান কাদা ও আবর্জনার ডিপোতে পরিণত হয়। স্কুল-মাদরাসার শিক্ষার্থী ও কর্মজীবী মানুষের জন্য প্রতিদিনের এই পথচলা এখন এক ভয়াবহ অগ্নিপরীক্ষা। এলাকার বাসিন্দা জাহিদ ইকবাল ক্ষোভ প্রকাশ করে আমার দেশকে বলেন, সিটি করপোরেশনের উচিত দ্রুত কাজ শেষ করে জনদুর্ভোগ কমানো। জনগণের জন্য এ পথকে আর এক মুহূর্তও বিপজ্জনক করে রাখা উচিত নয়। অবিলম্বে কাজের গতি বাড়ানোর জোরালো দাবি জানাই।

পরিকল্পনাবিদ আদিল মুহাম্মদ খান আমার দেশকে বলেন, স্থানীয় সরকারের প্রতিনিধিত্বকারী সংস্থা হিসেবে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন নাগরিকদের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হচ্ছে। যত্রতত্র রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি, ফুটপাতে হকারদের দখল, বর্জ্যের অব্যবস্থাপনা এবং জলাশয় দখল ইত্যাদি কারণে ঢাকার বাসযোগ্যতা তলানিতে ঠেকেছে। অনুমতি ছাড়া একই সড়কে বারবার রাস্তা খোঁড়ার ফলে বিভিন্ন এলাকায় জনভোগান্তি এখন চরমে।

ঢাকার অনেক সড়কের অবস্থা দেখে বোঝার উপায় নেই—এগুলো কোনো রাজধানী শহরের রাস্তা। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পরও যথাযথভাবে সড়ক সংস্কার শুরু করতে পারেনি। সময়মতো মেরামত না করায় রাজধানীবাসীর দুর্ভোগ আরো বেড়েছে।

ঢাকা উত্তর সিটিতে সড়কের মোট দৈর্ঘ্য প্রায় এক হাজার ৩৪০ কিলোমিটার। এর মধ্যে প্রধান সড়ক ১৯০ কিলোমিটার, সংযোগ সড়ক ৩৪৫ কিলোমিটার, আর অলিগলি ৮০৫ কিলোমিটার। এর মধ্যে নতুন যুক্ত ১৮টি ওয়ার্ডসহ প্রায় ৩৪০ কিলোমিটার সড়কের এখনই সংস্কার প্রয়োজন, যা মোট সড়কের প্রায় ২৫ শতাংশ। ডিএনসিসির প্রকৌশল বিভাগ বলেছেÑনতুন ১৮টি ওয়ার্ডের মধ্যে উত্তর খান এলাকায় ২৪ কিলোমিটারের মধ্যে ৯ কিলোমিটার এবং দক্ষিণখানে ৩৯ কিলোমিটারের মধ্যে প্রায় ১২ কিলোমিটার রাস্তা এখনো কাঁচা রয়েছে।

অন্যদিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় প্রায় ১,৬৫৬ কিলোমিটার সড়কের মধ্যে অন্তত ১০০ কিলোমিটার মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। মৌচাক, মালিবাগ, রাজারবাগ, সায়েদাবাদ, ওয়ারী, গেণ্ডারিয়া, খিলগাঁওসহ পুরান ঢাকার বহু এলাকায় খানাখন্দ ও খোলা ম্যানহোল মৃত্যুঝুঁকি তৈরি করছে।

এদিকে নগরীর অলি-গলিগুলোতে সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায় ভোগান্তির আরেক চিত্র। সিটি করপোরেশন, ওয়াসা, তিতাস ও ডেসকোসহ বিভিন্ন সংস্থার লাগাতার খোঁড়াখুঁড়িতে বাড্ডা লিংক রোড, সায়েদাবাদ, যাত্রাবাড়ী, মহাখালী, ফার্মগেট, কারওয়ান বাজার, মিরপুর ও মোহাম্মদপুরের বহু সড়ক খানাখন্দে পরিণত হয়েছে। দক্ষিণ সিটির যাত্রাবাড়ী, শনির আখড়া ও ধলপুর এলাকায় অনেক সড়কের পিচ উঠে গিয়ে গর্তের সৃষ্টি হয়েছে।

পুরান ঢাকার স্বামীবাগ, ওয়ারী, গোলাপবাগ, বকশীবাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় বছরের পর বছর সড়ক খোঁড়া অবস্থায় পড়ে আছে। সারা বছর এসব রাস্তা পানিতে ডুবে নালার মতো হয়ে থাকে। অনেক সড়কে খোলা ম্যানহোল ও স্যুয়ারেজ লাইনের কারণে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে। মুগদা, বাসাবো ও গোড়ানসহ নতুন ওয়ার্ডগুলোতে কাঁচা রাস্তা ও জলাবদ্ধতায় বাসিন্দাদের দুর্ভোগ চরমে। ধলপুরে সড়ক নির্মাণের উদ্যোগ না থাকায় পুরো এলাকা কাদামাটিতে পরিণত হয়েছে।

ধলপুর আঞ্চলিক অফিসের প্রকৌশলীরা সরেজমিনে ৭০ নম্বর ওয়ার্ডের বেহাল দশা ঘুরে দেখে আসার পরেও গত ছয় মাসে কোনো উদ্যোগ নেয়নি রাস্তা তৈরির। বস্তুত, পুরো নগরী যেন অভিভাবকহীন। নগরবাসীর ভোগান্তি দেখার কেউ নেই। দীর্ঘদিন ধরে চলা সড়ক ও ফ্লাইওভার নির্মাণকাজে নগরীর যান চলাচল স্থবির হয়ে পড়েছে। ঘণ্টায় গড়ে চার কিলোমিটার গতিতে যান চলছে, নষ্ট হচ্ছে বিপুল কর্মঘণ্টা। অনেক সড়কে অ্যাম্বুলেন্স চলাচলের সুযোগও নেই। দায়িত্বশীলরা মেরামতের আশ্বাস দিলেও বাস্তবে তেমন অগ্রগতি দেখা যায় না।

মিরপুরের সেনপাড়া-পর্বতা ও ভাটারা মাদানী অ্যাভিনিউতেও সড়কের অবস্থা বেহাল। গর্তে জমে থাকা পানির কারণে যানবাহন ধীরে চলায় সৃষ্টি হচ্ছে তীব্র যানজট। এসব রাস্তায় এখন হেঁটে চলতেও ভোগান্তিতে পড়তে হয়। বেগম রোকেয়া সরণি, মিরপুর রোড, শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ সরণি ও প্রগতি সরণি তুলনামূলক ভালো থাকলেও কিছু জায়গায় ভাঙনের চিহ্ন রয়েছে। কোথাও সড়ক দেবে গিয়ে তৈরি হয়েছে উঁচু-নিচু পথ।

ঢাকা দক্ষিণ সিটির প্রধান প্রকৌশলী নূর আজিজুর রহমান আমার দেশকে বলেন, সিটিতে যুক্ত হওয়া পাঁচটি ইউনিয়নের নতুন ১৮টি ওয়ার্ডের মধ্যে পাঁচটির জন্য প্রায় ৯৮০ কোটি টাকার ডিপিপি পরিকল্পনা অর্থমন্ত্রণালয়ের সম্মতির কমিশনে রয়েছে। আরো প্রায় ৯০০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে অনুমোদনের অপেক্ষায়। গত বুধবার এ সংক্রান্ত একটা মিটিংও হয়েছে। যদিও জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে কাজ কিছুটা পিছিয়েছে। আশা করছি দ্রুত প্রকল্পগুলো অনুমোদন পাবে।

এদিকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ আমার দেশকে বলেন, সিটি করপোরেশনের বাজেট অত্যন্ত সীমিত। নাগরিক সংকট কমাতে সরকারের উচিত ছিল সিটি করপোরেশনের সক্ষমতা বাড়ানোর দিকে জোর দেওয়া। সিটি করপোরেশনের সক্ষমতা বাড়াতে সমস্ত বিভাগ বা সংস্থাগুলোকে ওয়ান ইন আমব্রেলার মধ্যে নিয়ে আসতে হবে বলেও জানান তিনি।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ

এলাকার খবর
Loading...