থার্ড টার্মিনালের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং

কাজ পেতে বিশ্বখ্যাত পাঁচ অপারেটরের প্রতিযোগিতা

কবিতা
কবিতা

কাজ পেতে বিশ্বখ্যাত পাঁচ অপারেটরের প্রতিযোগিতা

রাজধানীর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং কার্যক্রমে দীর্ঘদিনের একচেটিয়া অবস্থান হারাতে যাচ্ছে রাষ্ট্রীয় সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। সেবার মানোন্নয়ন, দক্ষতা বৃদ্ধি ও আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করতে বিমানের পাশাপাশি বিদেশি অপারেটরদেরও গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং পরিচালনার অনুমতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এতে দেশের বিমান পরিবহন খাতে নতুন প্রতিযোগিতার সূচনা হতে যাচ্ছে।

জানা গেছে, শাহজালালের থার্ড টার্মিনালে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং সেবায় প্রথমবারের মতো যুক্ত হতে যাচ্ছে বিদেশি অপারেটর। প্যাসেঞ্জার গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং সেবা এখন বিমানের পাশাপাশি বিদেশি অপারেটররাও পরিচালনা করবে। এই সেবার প্রতিযোগিতা উন্মুক্ত করা হয়েছে। এতে পাঁচটি দেশের প্রতিষ্ঠান আগ্রহ প্রকাশ করেছে। গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং কার্যক্রমে সিঙ্গাপুরের স্যাটস্, সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) ডানাটা, যুক্তরাজ্যের মেনজিস, তুরস্কের সেলেবি এভিয়েশন এবং সুইজারল্যান্ডের সুইসপোর্ট আগ্রহ প্রকাশ করেছে।

বিজ্ঞাপন

এভিয়েশন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যাত্রী সেবার পাশাপাশি দেশের সার্বভৌমত্বের বিষয়টিও মাথায় রাখতে হবে। অনেক আগেই প্রয়োজন ছিল বিমানের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং বিষয়ে মনোযোগ দেওয়ার, যাতে তারা থার্ড টার্মিনালের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং নিজেরা অপারেট করতে পারে।

সূত্র জানায়, একটি উড়োজাহাজ অবতরণের পর থেকে পুনরায় উড্ডয়ন পর্যন্ত যেসব কার্যক্রম পরিচালিত হয় (ব্যাগেজ হ্যান্ডলিং, কার্গো লোডিং-আনলোডিং, ক্যাটারিং, ক্লিনিং, যাত্রী বোর্ডিং, বিমানের পুশব্যাক, র‌্যাম্প অপারেশন এবং বিভিন্ন নিরাপত্তা কার্যক্রম) সবই গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের আওতাভুক্ত।

সূত্র জানায়, এর মধ্য দিয়ে এই খাতে বিমানের দীর্ঘ ৫৪ বছরের একচ্ছত্র আধিপত্য ভাঙতে যাচ্ছে। তবে কার্গো হ্যান্ডলিং বিমানের নিয়ন্ত্রণেই থাকছে। কেবল যাত্রীসেবা-সংক্রান্ত কার্যক্রমে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করবে সংস্থাটি। মূলত লাগেজ চুরি, যাত্রী হয়রানি ও ধীরগতির মতো দীর্ঘদিনের অভিযোগগুলো ঘুচিয়ে সেবার মান আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উন্নীত করতেই প্রতিযোগিতামূলক এই নতুন ব্যবস্থা চালু করা হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রতিযোগিতা সৃষ্টি হলে সেবার মান উন্নয়ন, প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক এয়ারলাইন্সগুলোর কাছে বাংলাদেশের বিমানবন্দরগুলোর গ্রহণযোগ্যতাও বাড়বে। এখানে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং কোম্পানিগুলো নিজেরাই আগ্রহ দেখাচ্ছে। কারণ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এভিয়েশন হাবে পরিণত হতে পারে এটি। এক সময় আন্তর্জাতিক এয়ারলাইন্সগুলো বাংলাদেশকে শুধু যাত্রী পরিবহনের উৎস হিসেবে দেখত। এখন তারা বাংলাদেশকে একটি সম্ভাব্য আঞ্চলিক সংযোগ কেন্দ্র হিসেবে বিবেচনা করছে। এই পরিবর্তনই সবচেয়ে বড় অর্জন।

সূত্র জানায়, শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে বর্তমানে বছরে এক কোটির বেশি যাত্রী পরিবহন হলেও নতুন টার্মিনাল পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হলে সেই সংখ্যা আড়াই কোটির কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে। একই সঙ্গে কার্গো পরিবহনেও উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি ঘটবে। এই বিশাল বাজারই বিদেশি অপারেটরদের আকৃষ্ট করছে। বিদেশি অংশগ্রহণের সবচেয়ে বড় সুবিধা হবে প্রযুক্তি ও দক্ষতার স্থানান্তর। আধুনিক গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং এখন অনেকাংশে স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তিনির্ভর। ব্যাগেজ ট্র্যাকিং, কার্গো ম্যানেজমেন্ট, ডিজিটাল র‌্যাম্প কন্ট্রোল এবং স্মার্ট অপারেশন সিস্টেমের ব্যবহার যাত্রীসেবাকে দ্রুত ও নির্ভুল করে।

বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত বলেন, আমরা চাই বিমানকে আরো আধুনিক ও সক্ষম প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে। যে বিদেশি প্রতিষ্ঠানই আসুক না কেন, বিমানের অংশীদারত্ব থাকবে। এতে বিমানের কর্মীরাও কাজের সুযোগ পাবেন এবং প্রয়োজন হলে নতুন জনবলও নিয়োগ দেওয়া হবে। শুধু সেবা দেওয়া নয়, বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো আমাদের জনবলকে প্রশিক্ষণও দেবে। এতে দক্ষতা বাড়বে এবং আন্তর্জাতিক মানের সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং প্রসঙ্গে বিমানের পাইলট অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি ক্যাপ্টেন হেলাল আমার দেশকে বলেন, থার্ড টার্মিনাল যখন তৈরি করা হয়েছে, তার আগেই বিমানের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং নিয়ে কাজ শুরু করা প্রয়োজন ছিল। কীভাবে বিমানের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং আরো আধুনিক করা যায়, সে বিষয়ে মনোযোগ দেওয়া জরুরি ছিল। আধুনিক ইকুইপমেন্ট এখানে খুব প্রয়োজন। তাছাড়া রয়েছে পরিকল্পনার অভাবও। এত কম জনশক্তি দিয়ে পৃথিবীর কোনো বিমানবন্দরে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং হয় না। এমনকি ভারতেও না।

তিনি আরো বলেন, আমাদের মধ্যে কোনো দেশপ্রেম নেই। কীভাবে কর্মীদের দক্ষতা বৃদ্ধি করা যাবে, সেদিকে অনেক আগেই ফোকাস করা উচিত ছিল।

তিনি উল্লেখ করেন, বিমানে সব সময় দলীয় লোকজন বসানো হয়। তারাই বিমান চালাচ্ছে। মন্ত্রণালয় থেকে বিমানে উচ্চ পদে লোক আসে, আবার দুবছর পর চলে যায়। তারা হয়তো এভিয়েশন ব্যবসার কিছুই জানে না। আবার তারাই বিমান ও সিভিল এভিয়েশনকে নিয়ন্ত্রণ করেন। ফলে পরিকল্পনায় ঘাটতি থেকে যায়। কুয়ালালামপুর নতুন বিমানবন্দর তৈরি করা হচ্ছে। সেখানে বিমানবন্দরের সঙ্গে মেট্রোরেল ও এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে করে আপগ্রেড করা হয়েছে। নীতিনির্ধারকদের চিন্তা করতে হবে কীভাবে বিজনেস কার্গো হাব গড়ে তোলা যায়।

ক্যাপ্টেন হেলাল জানান, থার্ড টার্মিনালে দ্বিতীয় আরেকটি রানওয়ে করা জরুরি ছিল। ক্যান্টনমেন্টের পশ্চিমদিকে জায়গা রয়েছে। সেখানে চাইলে সরকার আরেকটি রানওয়ে তৈরি করতে পারতেন। এতে অনেক বেশি উড়োজাহাজ ওঠানামা করতে পারত। কিন্তু সরকার সে সিদ্ধান্তে যায়নি। এর আগে যখন বোয়িং থেকে উড়োজাহাজ কেনা হয়, তখন তারা প্রস্তাব দিয়েছিল তারা শাহজালালে আরেকটি রানওয়ে করে দেবে। কিন্তু সরকার তখন রাজি হয়নি। এমিরেটস, কাতার ও সাউদিয়াকে বোয়িং দেওয়ার পাশাপাশি তারা কনসালটেন্সিও দিয়েছে।

এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলম আমার দেশকে বলেন, বিশ্বের বহু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে একাধিক গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং অপারেটর কাজ করে। এতে প্রতিযোগিতা তৈরি হয়, সেবার মান বাড়ে এবং এয়ারলাইন্সগুলোও বিকল্প সেবা গ্রহণের সুযোগ পায়। বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রতিষ্ঠানের একক নিয়ন্ত্রণ থাকায় দক্ষতা, জবাবদিহিতা ও আধুনিকায়নের ক্ষেত্রে কিছু সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। থার্ড টার্মিনালে বিদেশি অপারেটর যুক্ত হলে আন্তর্জাতিক মানের প্রযুক্তি, ব্যবস্থাপনা ও প্রশিক্ষণ দেশে আসবে। তবে এজন্য এমন একটি কাঠামো নিশ্চিত করতে হবে, যাতে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বিমান ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। যৌথ উদ্যোগের মাধ্যমে স্থানীয় জনবলের দক্ষতা বৃদ্ধি, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং সেবার মান উন্নয়ন নিশ্চিত করা গেলে এটি দেশের বিমান পরিবহন খাতের জন্য ইতিবাচক পরিবর্তন বয়ে আনবে।

জানা গেছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশের বিভিন্ন বিমানবন্দরে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং সেবা দিয়ে প্রায় ১৫০০ কোটি টাকা আয় করেছে বিমান। আগের অর্থবছরে এই আয় ছিল প্রায় ১২০০ কোটি টাকা। তবে দীর্ঘদিনের একক নিয়ন্ত্রণের কারণে সংস্থাটির সেবার মান নিয়ে নানা প্রশ্ন রয়েছে। মালামাল চুরি, যাত্রী হয়রানি, ফ্লাইট পরিচালনাকারী বিদেশি এয়ারলাইন্সগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় জনবল ও সরঞ্জাম সরবরাহে ঘাটতি এবং সেবার ধীরগতির অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরেই রয়েছে।

সূত্র জানায়, শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনাল চালু হলে যাত্রীসেবার সক্ষমতা ও পরিচালন দক্ষতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা হচ্ছে। এ কারণে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বিমানসেবা প্রতিষ্ঠান বিমানবন্দর পরিচালনা ও সংশ্লিষ্ট সেবায় অংশ নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছে।

ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের জনসংযোগ মহাব্যবস্থাপক কামরুল ইসলাম আমার দেশকে বলেন, বিশ্বব্যাপী বিমান পরিবহন শিল্পে একটি বিমানবন্দরের প্রকৃত শক্তি নির্ধারিত হয় তার রানওয়ে বা টার্মিনালের আকার দিয়ে নয়, বরং অপারেশনাল দক্ষতা দিয়ে। গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং সেই দক্ষতার মূল ভিত্তি। বিশ্বের ব্যস্ত বিমানবন্দরগুলোতে একটি উড়োজাহাজের টার্নঅ্যারাউন্ড বা গ্রাউন্ড টাইম ৩০-৬০ মিনিটের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয়। এই সময় যত কম হবে, এয়ারলাইন্সের লাভ তত বাড়বে। ফলে দক্ষ গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি আন্তর্জাতিক এয়ারলাইন্সগুলোর আস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একইভাবে সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক ডানাটা আগ্রহ দেখা যাচ্ছে। দুবাই ও আবুধাবির মতো হাব বিমানবন্দর পরিচালনার অভিজ্ঞতা নিয়ে তারা বাংলাদেশে সুযোগ খুঁজছে। অথচ বাংলাদেশের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ভিন্ন। এখানে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং কোম্পানিগুলো নিজেরাই আগ্রহ দেখাচ্ছে। কিন্তু বিষয়টি কেবল আনন্দের নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে কৌশলগত, অর্থনৈতিক ও জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন