দেশজুড়ে বৃষ্টির পানিতে জলাবদ্ধতা, বেড়েছে জনদুর্ভোগ

আমার দেশ ডেস্ক

দেশজুড়ে বৃষ্টির পানিতে জলাবদ্ধতা, বেড়েছে জনদুর্ভোগ
ছবি: আমার দেশ

দেশজুড়ে ভারী বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল ও উজানের পানিতে বন্যা, জলাবদ্ধতা এবং জনদুর্ভোগ ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। শহরের বিভিন্ন সড়ক ও নিচু এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। বিভিন্ন জেলায় সড়ক তলিয়ে জনজীবন স্থবির হয়েছে। কোথাও নদ-নদীর পানি দ্রুত বাড়ছে, হাজারো মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।

সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, সুনামগঞ্জে অতিবৃষ্টি ও ভারতের মেঘালয়ের পাহাড়ি ঢলে জেলার সবগুলো নদ-নদীর পানি দ্রুত বাড়ছে। এতে জেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় সুনামগঞ্জে ২৬৫ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টিপাত রেকর্ড করেছে আবহাওয়া অফিস। পাশাপাশি উজানের ঢলে সুরমা, যাদুকাটা, পাঠলাই, বৌলাই নদীর পানি বাড়ছে।

বিজ্ঞাপন

পানি উন্নয়ন বোর্ড জানায়, গতকাল সকাল ৯টা পর্যন্ত সুরমা নদীর পানি সুনামগঞ্জ পয়েন্টে ৪৭ সেমি. বিপৎসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এদিকে হঠাৎ পানি বাড়ায় তাহিরপুর, দোয়ারাবাজার, বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার নিচু এলাকা প্লাবিত হয়ে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা। নদীভাঙন-কবলিত এলাকার মানুষ আতঙ্কে রয়েছেন।

পত্নীতলা (নওগাঁ) প্রতিনিধি জানান, টানা এক রাতের ভারী বৃষ্টিতে নওগাঁর পত্নীতলা উপজেলায় নজিপুর পৌর শহরসহ বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। বৃহস্পতিবার সকালে উপজেলা সদর নজিপুর পৌর শহরের সাপাহার রোড, নজিপুর সরদারপাড়া মোড় এলাকায়, উপজেলা পরিষদের জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের ভেতরে ডুবে থাকতে দেখা যায়। এছাড়াও নজিপুর পৌর এলাকায় বিভিন্ন মহল্লার কিছু ঢালু রাস্তা পানিতে প্লাবিত ছিল। এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে বিভিন্ন ইউনিয়নে। এতে যান চলাচল ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি চরম দুর্ভোগে পড়েন স্থানীয় এলাকাবাসী, বিশেষ করে কৃষিনির্ভর যানবাহন চলাচলের সময় দুর্ভোগে পড়েন।

রাউজান (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি জানান, রাউজানে টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট বন্যার কারণে কর্মহীন হয়ে পড়া দিনমজুর, গরিব ও অসহায় পরিবারের মধ্যে চাল, আলু ও শুকনো খাবার বিতরণ করা হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার রাউজানের সংসদ সদস্য গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরীর নির্দেশনায় এ মানবিক সহায়তা প্রদান করা হয়।

চট্টগ্রাম উত্তর জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সহক্রীড়া বিষয়ক সম্পাদক ও সমাজসেবক মোহাম্মদ আলী সুমনের ব্যক্তিগত অর্থায়নে রাউজান পৌরসভার ছয় নম্বর ওয়ার্ডের বিভিন্ন এলাকার কর্মহীন, দিনমজুর, গরিব ও অসহায় পরিবারের মধ্যে এসব খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করা হয়।

কাঁঠালিয়া (ঝালকাঠি) প্রতিনিধি জানান, আষাঢ়ের টানা বৃষ্টিতে ঝালকাঠির কাঁঠালিয়া উপজেলার জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। চার-পাঁচ দিন ধরে থেমে থেমে মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টিপাতে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। প্রয়োজন ছাড়া মানুষ ঘরের বাইরে বের হচ্ছেন না। রাস্তাঘাট ও হাট-বাজারে মানুষের উপস্থিতিও কমে গেছে। সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন দিনমজুর, ইজিবাইক ও ভ্যানচালক, নির্মাণশ্রমিক এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা। যাত্রী ও ক্রেতা কম থাকায় তাদের আয়-রোজগার প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। ইজিবাইকচালক রাজ্জাক বলেন, ‘সারা দিন বৃষ্টি হলে যাত্রী পাওয়া যায় না। সংসার চালানো খুবই কষ্টকর হয়ে পড়েছে।’

চন্দনাইশ (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি জানান, টানা ভারী বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা বন্যার পানিতে সয়লাব হয়ে গেছে চট্টগ্রামের চন্দনাইশ উপজেলার দুটি পৌরসভা ও আটটি ইউনিয়নের অধিকাংশ মানুষ। জলাবদ্ধতা ও রাস্তাঘাট পানিতে ডুবে যাওয়ায়, ঘর হতে বের হতে না পেরে শ্রমজীবীসহ হাজারো মানুষ পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছে। পানিতে ডুবে গেছে আউশ আমন বীজতলা। অধিকাংশ পুকুর ও মাছের প্রজেক্ট ডুবে গেছে। পানির নিচে তলিয়ে গেছে বিভিন্ন মৌসুমি শাকসবজি। সাংগু নদীর পানি বিকাল ৫টার সময় দোহাজারী ব্রিজ পয়েন্ট এলাকায় বিপৎসীমার দুই ফুট ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। বৃষ্টি না কমলে যেকোনো সময় নদীর দুপাড়ের লোকজনের বাড়িতে পানি ঢুকে যেতে পারে।

চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের চন্দনাইশ উপজেলার কসাইপাড়া এলাকায় আরাকান সড়ক পানিতে ডুবু ডুবু অবস্থা। বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে চট্টগ্রাম কক্সবাজার মহাসড়কে যান চলাচল যেকোনো মুহূর্তে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে পারে

লোহাগাড়া (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি জানান, টানা বৃষ্টি ও উজানের পানির ঢলে ভয়াবহ বন্যার পানিতে আটকা পড়েছে চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার লাখো মানুষ। তার মধ্যে উপজেলার আমিরাবাদ ইউনিয়নের খৈয়ারকুল এলাকায় এক গর্ভবতী মহিলা আটকা পড়ে।

গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল ৬টার দিকে আমিরাবাদ ইউনিয়নের খৈয়ারকুল এলাকা থেকে গর্ভবতী মহিলাকে উদ্ধার করে চুনতি ফায়ার সার্ভিসের একটি টিম।

উদ্ধারকৃত মহিলার নাম মেজবাহুল জান্নাত। তিনি আমিরাবাদ ইউনিয়নের খৈয়ালকুল এলাকার রেজা উদ্দীনের স্ত্রী। চুনতি ফায়ার সার্ভিস স্টেশন সূত্র জানায়, গতকাল ভোরে স্থানীয় এলাকাবাসীর মাধ্যমে খবর পেয়ে খৈয়ারকুল এলাকায় ফায়ার সার্ভিসের একটি দল আটকে পড়া নারীকে উদ্ধার করে নিরাপদ স্থানে স্থানান্তর করে। চুনতি ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের কর্মকর্তা ফিরোজ খান বলেন, একজন গর্ভবতী মহিলা আটকে থাকার খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা তাকে উদ্ধার করে নিরাপদ স্থানে নিয়ে আসেন।

হাটহাজারী (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি জানান, চট্টগ্রামের হাটহাজারীতে টানা বর্ষণে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পগেছে। বৃষ্টির পানিতে উপজেলার শিকারপুর, বুড়িশ্চর, চিকনদণ্ডী, মেখল, গড়দুয়ারা, উত্তর ও দক্ষিণ মাদার্শা, ছিপাতলী, ফতেপুর, মির্জাপুরসহ পৌরসভার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে।

জলাবদ্ধতার ফলে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন ওই সব এলাকার মানুষ। এর মধ্যে চারটি ইউনিয়নে শত শত বসতঘরে পানি ঢুকে পড়ায় ৪০০ পরিবার আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছে বলে উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে।

এদিকে, গত বুধবার রাতে বন্যাদুর্গত এলাকার বেশ কয়েকটি স্পটে ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করেন স্থানীয় সংসদ সদস্য এবং ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন।

বাঁশখালী (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি জানান, পাঁচ দিনের টানা বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল ও সমুদ্রের জোয়ারের পানি বেড়ে বাঁশখালীতে বন্যা পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি হয়েছে। বর্তমানে উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি রয়েছে। চার দিনেও পৌঁছেনি সরকারি ত্রাণসহায়তা, চলছে বানভাসি মানুষের মধ্যে হাহাকার। দুর্গত এলাকায় প্রয়োজনীয় খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে।

বৃষ্টিপাত ও পাহাড়ি ঢল অব্যাহত থাকার কারণে উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে।

উপজেলা নির্বাহী অফিসার রুহুল আমীন জানান, সরকার থেকে ত্রাণসামগ্রী এলেই আমরা তা দ্রুত দুর্গত এলাকায় পৌঁছে দেব। তিনি বিধ্বস্ত বেড়িবাঁধ ও দুর্গত এলাকা পর্যবেক্ষণে আছেন বলেও জানান।

গত বুধবার রাত ৯টার দিকে পাহাড়ি ঢলের তোড়ে চট্টগ্রাম-বাঁশখালী প্রধান সড়কের বৈলছড়ি এলাকায় প্রধান সড়ক তলিয়ে যাওয়ায় বাঁশখালীর সঙ্গে চট্টগ্রাম শহরের সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। এদিকে পাহাড়ি ঢলে অন্তত তিন শতাধিক কাঁচামাটির ঘর তলিয়ে গেছে। স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী ও প্রশাসনের উদ্যোগে পানিবন্দি কিছু মানুষকে আশ্রয়কেন্দ্রে আনা হলেও গ্রামীণ সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ও সড়কগুলো হাঁটুপানিতে ডুবে থাকায় বহু মানুষকে আশ্রয়কেন্দ্রে আনা সম্ভব হয়নি। অধিকাংশ বসতবাড়িতে পানি ঢুকে পড়ায় স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হয়েছে। সড়ক যোগাযোগ, বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। অসংখ্য বসতবাড়ি পানিতে তলিয়ে গেছে। গ্রামীণ সড়কের বিভিন্ন অংশ প্লাবিত হওয়ায়, অনেক এলাকায় নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়াও কঠিন হয়ে পড়েছে।

নওগাঁ প্রতিনিধি জানান, গত ২৪ ঘণ্টার ব্যাপক বৃষ্টিপাতের নওগাঁ শহরসহ আশপাশের এলাকা পানিতে ডুবে গেছে। রাস্তাঘাটগুলো হাঁটু পানির নিচে। গত রাতের অবিরাম বৃষ্টিপাতে শহরের নিচু এলাকাগুলোর বাড়িঘরে পানি প্রবেশ করেছে। বাসিন্দারা আশপাশের উঁচু এলাকায় অবস্থান নিয়েছেন। পানি উন্নয়ন বোর্ড থেকে পাওয়া তথ্যে জানা গেছে, গতকাল ২৪ ঘণ্টার বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ২৪০ মিলিমিটার। এদিকে অতিবর্ষণে নওগাঁ জেলার ভেতর দিয়ে প্রবাহিত আত্রাই নদী ও ছোট যমুনা নদীর পানি বিপৎসীমা ছুঁই ছুঁই করছে।

পটিয়া (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি জানান, চট্টগ্রামের পটিয়ায় টানা কয়েক দিনের বৃষ্টির কারণে এক পরিবারের মাটির ঘর সম্পূর্ণ ধসে পড়েছে। গত বুধবার রাতে উপজেলার হাইদগাঁও ইউনিয়নের ছয় নম্বর ওয়ার্ডের আব্দুস সামাদ মাতব্বরের বাড়িতে এ দুর্ঘটনা ঘটে। ঘরটি ধসে পড়ায় ভেতরে থাকা আসবাবপত্র ও খাদ্যসামগ্রী সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে। তবে প্রাণে বেঁচে গেছেন ঘরের বাসিন্দা বৃদ্ধ মাজেদা বেগম। এছাড়া একই এলাকায় শামসুল আলম ও শাহজাহান নামের আরো দুই ব্যক্তির মাটির ঘর আংশিক ধসে পড়েছে বলে জানা গেছে।

জানা গেছে, কয়েক দিন ধরে পটিয়াজুড়ে টানা ভারী বর্ষণ ও বন্যা পরিস্থিতি বিরাজ করছে। মাটির দেয়াল অতিরিক্ত পানি শোষণ করে চরম ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে। বুধবার রাতে হঠাৎ করেই বৃদ্ধ মাজেদা বেগমের পুরো ঘরটি ভেঙে পড়ার শব্দ পেয়ে তিনি দ্রুত বাইরে বের হয়ে আসায় বড় ধরনের কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। তবে ঘরের ভেতরে থাকা সব মালামাল মাটির নিচে চাপা পড়ে নষ্ট হয়ে গেছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হেলাল উদ্দিন বলেন, ‘মাটির ঘর ধসে পড়ার বিষয়টি আমরা জেনেছি। দ্রুত সরকারি সহায়তা ও পুনর্বাসনের জন্য টিন দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।

এএস

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন