সীতাকুণ্ডে ভোটে বিজয়ের পর এবার আইনি লড়াইয়ে আসলাম চৌধুরী

উপজেলা প্রতিনিধি, সীতাকুণ্ড (চট্টগ্রাম)

সীতাকুণ্ডে ভোটে বিজয়ের পর এবার আইনি লড়াইয়ে আসলাম চৌধুরী
অধ্যাপক আসলাম চৌধুরী। ছবি: আমার দেশ

জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম-৪ (সীতাকুণ্ড) আসনে বেসরকারিভাবে সর্বোচ্চ ভোট পাওয়ার পরও আইনি জটিলতার কারণে নতুন করে আলোচনায় এসেছেন বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা, চট্টগ্রাম উত্তর জেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক ও সাবেক কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব অধ্যাপক আসলাম চৌধুরী।

দীর্ঘ কারাবাস, একাধিক মামলা, ব্যাবসায়িক কার্যক্রমে ক্ষতির অভিযোগ এবং নির্বাচন-পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া—সব মিলিয়ে তাকে ঘিরে উত্তর চট্টগ্রামের রাজনীতিতে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি হয়েছে বলে দলীয় নেতাকর্মী, আইনজীবী ও স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অভিমত।

বিজ্ঞাপন

দলীয় সূত্র জানায়, ২০১৩ সালের সরকারবিরোধী আন্দোলনের সময় ঢাকা–চট্টগ্রাম মহাসড়কের সীতাকুণ্ডে ও মিরসরাই অংশে ধারাবাহিক কর্মসূচি, অবরোধ, মিছিল ও সমাবেশে নেতৃত্ব দিয়ে আসলাম চৌধুরী উত্তর চট্টগ্রামের বিএনপির অন্যতম প্রভাবশালী নেতা হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। স্থানীয় নেতাকর্মীদের ভাষ্য, ওই সময় সীতাকুণ্ড উত্তর চট্টগ্রামের বিএনপির অন্যতম সাংগঠনিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠে এবং আন্দোলন-সংগ্রামে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

২০১৬ সালের মে মাসে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরবর্তী সময়ে তার বিরুদ্ধে নাশকতা, বিস্ফোরক আইন ও সহিংসতার অভিযোগে ৭৬টি মামলা দায়ের করা হয়। বিএনপির দাবি, এসব মামলা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ছিল। অন্যদিকে সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলো বরাবরই এসব মামলাকে আইনগত প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে উল্লেখ করেছে। দলীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন মামলায় তিনি দীর্ঘ সময় কারাবন্দি থাকার পর ২০২৪ সালের ২০ আগস্ট কারামুক্ত হন।

কারামুক্তির পর থেকেই তিনি উত্তর চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলা ও ইউনিয়নে সাংগঠনিক কার্যক্রম জোরদার করেন। দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময়, কর্মিসভা, সাংগঠনিক বৈঠক এবং তৃণমূল পর্যায়ে যোগাযোগ বাড়ানোর মাধ্যমে তিনি পুনরায় সক্রিয় রাজনৈতিক ভূমিকা পালন করছেন। স্থানীয় পর্যবেক্ষকদের মতে, তার মাঠে ফেরার পর উত্তর চট্টগ্রামের বিএনপিতে নতুন উদ্দীপনা তৈরি হয়েছে এবং সাংগঠনিক কার্যক্রমও আগের তুলনায় সক্রিয় হয়েছে।

আসলাম চৌধুরীর সমর্থকদের অভিযোগ, তার দীর্ঘ কারাবাসের সময় রাইজিং গ্রুপের অধীনে থাকা স্টিল, শিপব্রেকিং, গ্যাস স্টেশন, লবণ ও রিয়েল এস্টেট খাতের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাদের দাবি, ব্যাংকিং ও প্রশাসনিক জটিলতার কারণে অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারেনি এবং বিপুলসংখ্যক শ্রমিক-কর্মচারীর কর্মসংস্থানও সংকটের মুখে পড়ে।

সীতাকুণ্ড উপজেলা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক জহুরুল আলম জহুর বলেন, দীর্ঘ সময় আসলাম চৌধুরীর ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো স্বাভাবিকভাবে পরিচালিত হতে পারেনি। তার অনুপস্থিতিতে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়ে। বর্তমানে তিনি ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠানগুলো পুনরায় সচল করার উদ্যোগ নিয়েছেন এবং আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে কাজ করছেন।

সাম্প্রতিক জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম-৪ আসনে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে তিনি ১ লাখ ৪২ হাজার ৬৭৪ ভোট পেয়ে বেসরকারিভাবে বিজয়ী হন বলে বিএনপি জানিয়েছে। পরে ঋণখেলাপির বিষয়ে আইনি আপত্তির পরিপ্রেক্ষিতে আপিল বিভাগের রায়ের ফলে তার প্রার্থিতা নিয়ে নতুন আইনি পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। তার আইনজীবীরা জানিয়েছেন, রায়ের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে।

হাইকোর্টের আইনজীবী মুজাহিদুল ইসলাম আমার দেশকে বলেন, দীর্ঘ কারাবাস ও একাধিক মামলার কারণে আসলাম চৌধুরীর ব্যক্তিগত, পারিবারিক এবং ব্যাবসায়িক জীবন ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বর্তমানে তিনি আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে সব বিষয়ে আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই সমাধান খুঁজছেন।

স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘ সময় মাঠের বাইরে থাকায় উত্তর চট্টগ্রামে বিএনপির নেতৃত্ব কাঠামোয় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। নতুন নেতৃত্বের উত্থান, সাংগঠনিক পুনর্বিন্যাস এবং তৃণমূল পর্যায়ে নতুন বাস্তবতা তৈরি হওয়ায় বর্তমানে সংগঠন পরিচালনায় সমন্বয়ই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তাদের মতে, আসলাম চৌধুরীর সামনে এখন দলীয় ঐক্য সুদৃঢ় করা, নতুন ও পুরোনো নেতৃত্বের মধ্যে সমন্বয় গড়ে তোলা এবং সাংগঠনিক কার্যক্রমকে আরও গতিশীল করার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে।

তৃণমূলের নেতাকর্মীদের একটি অংশের মতে, দীর্ঘ কারাবাসের পর তার প্রত্যাবর্তন কর্মীদের মধ্যে নতুন উৎসাহ সৃষ্টি করেছে। তাদের ভাষ্য, উত্তর চট্টগ্রামে বিএনপির সাংগঠনিক কার্যক্রম পুনরুজ্জীবিত করার ক্ষেত্রে তাঁর সক্রিয়তা ইতিমধ্যে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে।

সব মিলিয়ে দীর্ঘ কারাবাস, একাধিক মামলা, ব্যাবসায়িক ক্ষতির অভিযোগ, নির্বাচনি সাফল্য এবং চলমান আইনি প্রক্রিয়া—এ বিষয়গুলো এখন উত্তর চট্টগ্রামের রাজনীতিতে আসলাম চৌধুরীকে ঘিরে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, চলমান আইনি প্রক্রিয়ার অগ্রগতি এবং সাংগঠনিক কার্যক্রমে তার ভূমিকা আগামী দিনে উত্তর চট্টগ্রামের রাজনীতির গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।

এমএইচ

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন