শতবর্ষী পুকুর ভরাটে জলাবদ্ধতা: হাঁটুপানি মাড়িয়ে বিদ্যালয়ে যাচ্ছে শিশুরা

উপজেলা প্রতিনিধি, নিকলী (কিশোরগঞ্জ)

শতবর্ষী পুকুর ভরাটে জলাবদ্ধতা: হাঁটুপানি মাড়িয়ে বিদ্যালয়ে যাচ্ছে শিশুরা
ছবি: আমার দেশ

কিশোরগঞ্জের নিকলী উপজেলার পশ্চিম নিকলী এলাকায় প্রায় শতবর্ষী একটি পুকুর ভরাটের ২০ দিনের মাথায় ভয়াবহ জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। এতে অন্তত ছয়টি গ্রামের প্রায় ৩ হাজার মানুষ দুর্ভোগে পড়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে পশ্চিম নিকলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।

বিদ্যালয়ে যাওয়ার সড়ক হাঁটুপানিতে তলিয়ে থাকায় শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষে যেতে হচ্ছে। জলাবদ্ধতার কারণে বিদ্যালয়ের টয়লেটও ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। এতে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেছে।

বিজ্ঞাপন

স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রায় ২০ দিন আগে মালিকপক্ষ শতবর্ষী পুকুরটি বালু দিয়ে ভরাট করে। দীর্ঘদিন ধরে পুকুরটি এলাকার বৃষ্টির পানি ধারণ ও নিষ্কাশনের অন্যতম প্রাকৃতিক আধার হিসেবে কাজ করত। পুকুরটি ভরাট হওয়ার পর বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের স্বাভাবিক পথ বন্ধ হয়ে আশপাশের এলাকায় স্থায়ী জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, পশ্চিম নিকলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যাওয়ার একমাত্র সড়কে হাঁটুসমান পানি জমে রয়েছে। ছোট ছোট শিক্ষার্থীদের কোমরপানি মাড়িয়ে বিদ্যালয়ে যেতে হচ্ছে। বিদ্যালয়ের টয়লেটও পানিতে তলিয়ে থাকায় শিক্ষার্থীরা তা ব্যবহার করতে পারছে না। স্বাস্থ্যঝুঁকি ও নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে অনেক অভিভাবক সন্তানদের বিদ্যালয়ে পাঠাচ্ছেন না। এতে বিদ্যালয়ের উপস্থিতির হার উদ্বেগজনকভাবে কমে গেছে।

পশ্চিম নিকলী আদর্শ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী মো. আরাফাত বলে, ‘পানি দিয়ে বিদ্যালয়ে যেতে খুব কষ্ট হয়। অনেক সময় বই-খাতা ভিজে যায়। পাশের পুকুরটি ভরাট করায় এখন পানি নামতে পারে না, তাই জলাবদ্ধতা হয়েছে।’

নিকলী সদরের পালপাড়া গ্রামের বাদল পাল জানান, পুকুর ভরাট করার পর বৃষ্টির পানিতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়ে আশপাশের সাতটি গ্রামের ১০ হাজারের অধিক লোক ও শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে বলে তিনি জানান।

পশ্চিম নিকলী প্রাথমিক বিদ্যালয়সংলগ্ন দোকানি ইব্রাহিম মিয়া বলেন, পুকুর ভরাটের কারণে জলাবদ্ধতায় ব্যবসা বন্ধ, কোমরপানি দিয়ে যাতায়াত করতে হয়। মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বলে জানান তিনি।

নিকলী উপজেলা বিএনপির সহদপ্তর সম্পাদক রফিকুল আলম বলেন, পুকুরটি ভরাটের প্রস্তুতি চলাকালেই বিষয়টি প্রশাসনের নজরে আনা হয়েছিল। নিকলী সদরের মাইজহাটিতে শতবর্ষী পুকুরটি ভরাটের জন্য যখন পাইপ বসানো হচ্ছিল, তখনই আমি সরাসরি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে বিষয়টি জানাই।

পুকুরটি ভরাট বন্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ করি। আমি ইউএনওকে বলেছিলাম, এটি পাঁচ-ছয়টি এলাকার একমাত্র বড় পুকুর। বর্ষা মৌসুমে আশপাশের এলাকার বৃষ্টির পানি এই পুকুরেই এসে জমা হয়। বিষয়টি শোনার পর ইউএনও সহকারী কমিশনারকে (ভূমি) প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য বলেন। এরপর কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল, তা আমার জানা নেই।

কিন্তু শেষ পর্যন্ত শতবর্ষী পুকুরটি ভরাট হয়ে গেছে। আজ তারই পরিণতিতে সাতটি এলাকার মানুষ জলাবদ্ধতার দুর্ভোগে পড়েছেন। সবচেয়ে বেশি কষ্ট পাচ্ছে পশ্চিম নিকলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কোমলমতি শিশু শিক্ষার্থীরা। তাদের কোমরপানি মাড়িয়ে বিদ্যালয়ে যেতে হচ্ছে।

পশ্চিম নিকলী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক মোছা. আকলিমা আক্তার পাখি বলেন, প্রতি বছর এই এলাকায় সামান্য জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হতো, কিন্তু পুকুর ভরাটের কারণে জলাবদ্ধতা বেড়েছে, সেই সঙ্গে পুরো এলাকা ডুবে গেছে। কোথাও বুকপানি, কোথাও আবার কোমরপানি ভেঙে বিদ্যালয়ে আসতে হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কমে গিয়েছে বলে জানান তিনি।

নিকলী উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আবু সিদ্দিক বলেন, বিদ্যালয়ের মাঠ ও আশপাশের সড়কে জলাবদ্ধতার বিষয়টি তিনি জেনেছেন। সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়ের শিক্ষক ভিডিও পাঠিয়ে পরিস্থিতি দেখিয়েছেন। তিনি তাৎক্ষণিকভাবে বিষয়টি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে অবহিত করেন। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হবে এবং সংশ্লিষ্ট সংসদ সদস্য এলাকায় এলে তার নজরেও আনা হবে।

এ বিষয়ে নিকলী উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোছা. রেহানা মজুমদার মুক্তি বলেন, মাইজহাটি স্কুলের পাশে একটি পুকুর ভরাট হচ্ছে এমন অভিযোগ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তিনি সহকারী কমিশনারকে (ভূমি) তাৎক্ষণিক সরেজমিনে গিয়ে পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলেন। পরে সহকারী কমিশনার (ভূমি) বালু দিয়ে পুকুর ভরাটের কাজ বন্ধ করে দেন।

তবে পশ্চিম নিকলীর শতবর্ষী পুকুর ভরাটের বিষয়টি তিনি সাংবাদিকদের কাছ থেকে জানতে পেরেছেন। এ বিষয়ে তদন্তসাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।

এমএইচ

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন