ফেসবুকে জালনোটের বিজ্ঞাপন

আমাদের সব মাল ‘হাই কোয়ালিটির’

মঈন উদ্দিন, রাজশাহী

আমাদের সব মাল ‘হাই কোয়ালিটির’
জালনোট। ছবি: সংগৃহীত

কেউ হাতে নিয়েও বুঝতে পারবে না আসল, না জাল- এমনটি দাবি করে প্রকাশ্যে ফেসবুকে চলছে জালনোট বিক্রির বিজ্ঞাপন। পোস্টের নিচে দেওয়া হয়েছে একটি হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর। এতে উল্লেখ করা হয়েছে, যোগাযোগ করলেই মিলবে ‘হাই কোয়ালিটি’ জালনোট। শুধু একটি পোস্ট নয়, একই ভাষা, একই মোবাইল নম্বর এবং একই ধরনের ছবি ব্যবহার করে একাধিক ফেসবুক আইডি ও গ্রুপে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে এসব বিজ্ঞাপন।

ফেসবুকে জালনোটের এই প্রচারণা নিয়ে রাজশাহীতে সৃষ্টি হয়েছে উদ্বেগ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, এটি শুধু জালনোট চক্রের বিষয় নয়, এর পেছনে বড় ধরনের ডিজিটাল প্রতারণার নেটওয়ার্কও থাকতে পারে। বিষয়টি নিয়ে ইতোমধ্যে সাইবার ইউনিট তদন্ত শুরু করেছে।

বিজ্ঞাপন

অনুসন্ধানে দেখা যায়, ‘রাজশাহীর নতুন-পুরাতন জিনিস ক্রয়-বিক্রয়’ নামে ফেসবুক গ্রুপে ‘নিল আকাশের মাঝে নিল’ নামে একটি আইডি থেকে জালনোট বিক্রির পোস্ট দেওয়া হয়েছে। একই সময় ‘এমডি নাহিদ আহমেদ’ নামের আরেকটি আইডি থেকেও হুবহু একই ভাষায় পোস্ট করা হয়েছে। দুই পোস্টেই ব্যবহার করা হয়েছে একই হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর।

পোস্টে লেখা হয়েছে, ‘যারা জাল টাকা নিতে চান, তারা হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ দিন। আমাদের সব মাল হাই কোয়ালিটি মেশিন দিয়ে তৈরি। হাতে নিয়ে কেউ বুঝতে পারবে না।’

পোস্টের সঙ্গে ৫০, ২০০, ৫০০ ও ১০০০ টাকার বান্ডিলের একাধিক ছবি যুক্ত করা হয়েছে। কোথাও আবার ভিডিও এবং স্থিরচিত্রও ব্যবহার করা হয়েছে, যাতে বিপুল পরিমাণ নোটের বান্ডিল দেখা যায়। এসব ছবি সাধারণ মানুষের কাছে বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরির উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, একই নম্বর ব্যবহার করে একাধিক ভুয়া আইডি থেকে একই ধরনের পোস্ট ছড়ানো সাইবার প্রতারণার কৌশল। এতে বিভিন্ন গ্রুপে একযোগে প্রচার চালিয়ে আগ্রহীদের হোয়াটসঅ্যাপে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর শুরু হয় মূল প্রতারণা।

অনুসন্ধানে আরো দেখা গেছে, পোস্টগুলোতে ভাষাগত অসংগতি থাকলেও মূল বার্তা একই। একই নম্বর, একই ধরনের বান্ডিলের ছবি এবং একই দাবি বারবার ব্যবহার করা হয়েছে। এতে ধারণা করা হচ্ছে, এটি বিচ্ছিন্ন কোনো ব্যক্তি নয়, বরং সংঘবদ্ধ একটি চক্র পরিকল্পিতভাবে এসব পোস্ট ছড়াচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জালনোটের ছবি দেখিয়ে প্রচার চালানো অপরাধকে উৎসাহিত করার শামিল। এ ধরনের পোস্টে আগ্রহ দেখানো, যোগাযোগ করা কিংবা লেনদেনের চেষ্টা করাও আইনি ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে।

রাজশাহী মহানগর পুলিশের (আরএমপি) মুখপাত্র উপ-পুলিশ কমিশনার গাজিউর রহমান বলেন, বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে। প্রাথমিকভাবে আমাদের ধারণা, এটি প্রতারকচক্র। তারা জালনোট দেওয়ার নামে অগ্রিম টাকা হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে।

তিনি বলেন, সাইবার ক্রাইম ইউনিট পোস্টগুলো বিশ্লেষণ করেছে। প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, চক্রটির অবস্থান রাজশাহীর বাইরে এবং সিলেট বিভাগের দিকে। তাদের শনাক্তে কাজ চলছে।

তদন্ত-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জালনোট বিক্রির নামে প্রতারণা বেড়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ক্রেতাদের প্রথমে বিশ্বাস অর্জন করা হয়। পরে ডেলিভারি চার্জ, সিকিউরিটি মানি, অগ্রিম বুকিং কিংবা কুরিয়ার খরচ বাবদ টাকা নেওয়ার পর যোগাযোগ বন্ধ করে দেওয়া হয়। ফলে জালনোট পাওয়ার আগেই অর্থ হারান ক্রেতারা। অর্থাৎ, অপরাধীরা মানুষের অবৈধ লাভের মানসিকতাকেই তাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. ফরিদ উদ্দিন খান বলেন, জালনোট অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। এটি বাজারে আস্থার সংকট তৈরি করে। এতে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও নিম্ন আয়ের মানুষরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন। একইসঙ্গে এমন প্রচারণা সমাজে অপরাধ প্রবণতাকেও উৎসাহিত করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ ধরনের অবৈধ কার্যক্রম ঠেকাতে নিয়মিত মনিটরিং এবং দ্রুত আইনি ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

সাইবার নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, অপরাধীরা এখন আর নির্দিষ্ট এলাকায় বসে কাজ করে না। এক জেলার নামে ফেসবুক গ্রুপ খুলে অন্য জেলা থেকে প্রতারণা করা হচ্ছে। আবার বিদেশি সার্ভার, ভুয়া পরিচয় ও অস্থায়ী মোবাইল নম্বর ব্যবহার করায় তাদের শনাক্ত করাও কঠিন হয়ে পড়ছে।

আইনজীবীদের মতে, বাংলাদেশে জাল মুদ্রা তৈরি, সংরক্ষণ, বহন, সরবরাহ কিংবা লেনদেনের চেষ্টা গুরুতর দণ্ডনীয় অপরাধ। পাশাপাশি অনলাইনে প্রতারণার মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের ঘটনাও ফৌজদারি অপরাধের আওতায় পড়ে।

সচেতন নাগরিকরা বলছেন, এ ধরনের পোস্ট দেখলে সেটি শেয়ার না করে বরং ফেসবুকে রিপোর্ট করা এবং পুলিশের সাইবার ইউনিটকে জানানো উচিত। কারণ, একটি পোস্ট যত বেশি ছড়ায়, তত বেশি মানুষ প্রতারণার ঝুঁকিতে পড়েন।

তারা বলছেন, রাজশাহীর মতো শান্ত নগরীকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ্যে জালনোটের এমন প্রচারণা উদ্বেগজনক। এটি শুধু আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়, বরং ডিজিটাল নিরাপত্তা, আর্থিক স্থিতিশীলতা ও সামাজিক সচেতনতারও পরীক্ষা।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন