বাজেট ঘাটতি মেটাতে সদ্যসমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ব্যাংক থেকে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় ৩৩ হাজার কোটি টাকা বেশি ঋণ নিয়েছে সরকার। অর্থবছরের জুলাই থেকে ২৩ জুন পর্যন্ত সরকারের নিট ব্যাংক ঋণ দাঁড়িয়েছে এক লাখ ৩৭ হাজার কোটি টাকার বেশি। অথচ মূল বাজেটে ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য ছিল এক লাখ চার হাজার কোটি টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা যায়।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, রাজস্ব আদায়ে বড় ঘাটতি, বৈদেশিক ঋণপ্রবাহে প্রত্যাশিত অগ্রগতি না হওয়া এবং সরকারি ব্যয় বৃদ্ধি—এই তিন কারণে সরকারকে ব্যাংক ঋণের ওপর বেশি নির্ভর করতে হয়েছে। সদ্যসমাপ্ত অর্থবছরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) রাজস্ব আদায়ে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ৮৮ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি হয়েছে বলে জানা গেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বিদায়ী অর্থবছরের জুলাই থেকে ২৩ জুন পর্যন্ত সরকারের নিট ব্যাংক ঋণ আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ২৯ হাজার ৭৪৬ কোটি টাকা বা ২৭ দশমিক ৭১ শতাংশ বেড়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের একই সময়ে সরকারের নিট ব্যাংক ঋণের পরিমাণ ছিল এক লাখ সাত হাজার ৩৩১ কোটি টাকা।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মোস্তফা কে মুজেরী বলেন, বাজেটে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরেই সরকারের ব্যয় নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু বাস্তবে রাজস্ব আদায় প্রত্যাশার তুলনায় অনেক কম হয়েছে। ফলে ব্যয় নির্বাহে সরকারকে ব্যাংক থেকে অতিরিক্ত ঋণ নিতে হয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছর শেষে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে সরকারের মোট ঋণ স্থিতি ছিল চার লাখ ৫২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা। বিদায়ী অর্থবছরের জুলাই থেকে ২৩ জুন পর্যন্ত তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে পাঁচ লাখ ৭৯ হাজার ৮১১ কোটি টাকায়। অর্থাৎ ১১ মাস ২৩ দিনে বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে সরকারের নিট ঋণ বেড়েছে এক লাখ ২৭ হাজার ৩২৯ কোটি টাকা। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এই বৃদ্ধি ছিল এক লাখ ২৫ হাজার ৫৮৬ কোটি টাকা।
অন্যদিকে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের ৩০ জুন শেষে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণের স্থিতি ছিল ৯৮ হাজার ৪২৩ কোটি টাকা। বিদায়ী অর্থবছরের জুলাই থেকে ২৩ জুন পর্যন্ত তা বেড়ে হয়েছে এক লাখ আট হাজার ১৭১ কোটি টাকা। ফলে এ সময় কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ বেড়েছে ৯ হাজার ৭৪৭ কোটি টাকা। অথচ আগের অর্থবছরের একই সময়ে সরকার বাংলাদেশ ব্যাংকের ১৮ হাজার ২৭৪ কোটি টাকা ঋণ পরিশোধ করেছিল।
সব মিলিয়ে বিদায়ী অর্থবছরের শুরু থেকে ২৩ জুন পর্যন্ত ব্যাংক খাত থেকে সরকারের মোট ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ছয় লাখ ৮৭ হাজার ৯৮২ কোটি টাকা। আগের অর্থবছরের এ স্থিতি ছিল পাঁচ লাখ ৫০ হাজার ৯০৫ কোটি টাকা।
বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মূল বাজেটে ব্যাংক থেকে এক লাখ চার হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হলেও পরে সংশোধিত বাজেটে তা বাড়িয়ে এক লাখ ১৮ হাজার কোটি টাকা করা হয়। আর নতুন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ব্যাংক খাত থেকে এক লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সরকার।
প্রতিবছরই বাজেটে বড় অঙ্কের ঘাটতি রাখা হয়। এই ঘাটতি পূরণে সরকার অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক—দুই উৎস থেকেই ঋণ নেয়। তবে বৈদেশিক উৎস থেকে প্রত্যাশিত অর্থায়ন না এলে ব্যাংক ব্যবস্থা, সঞ্চয়পত্র, নন-ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বীমা কোম্পানিসহ অভ্যন্তরীণ উৎসের ওপর নির্ভরতা বেড়ে যায়।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

