ট্রাইব্যুনালে সাক্ষী

আমাকে ইলেক্ট্রিক শক দিয়ে বিবস্ত্র করে ঝুলিয়ে রাখতো

স্টাফ রিপোর্টার

আমাকে ইলেক্ট্রিক শক দিয়ে বিবস্ত্র করে ঝুলিয়ে রাখতো
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল

আওয়ামী সরকারের সমালোচনা করে ফেসবুকে লেখালেখি করার কারণে ২০১৬ সালের ২০ জুন গুম করা হয় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা মাহমুদুল হাসানকে। এরপর নির্জন কক্ষে গুম রেখে তার ওপর অবর্ণনীয় নির্যাতন করা হয়। মাঝেমাঝে জিজ্ঞাসাবাদের সময় চেয়ারে বসিয়ে কানের লতি এবং লজ্জাস্থানে ইলেক্ট্রিক শক দিতো। এরপর বিবস্ত্র করে দিকে ঝুলিয়ে রাখা হতো। বলা হতো জঙ্গি হিসেবে স্বীকারোক্তি দিলে ছেড়ে দেবে।

সোমবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনা, সাবেক আইজিপি বেনজির আহমেদ ও সাবেক-বর্তমান ১২ সেনা কর্মকর্তাসহ মোট ১৭ জনের বিরুদ্ধে পঞ্চম সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দিতে এসব কথা বলেন।

বিজ্ঞাপন

জবানবন্দিতে মাহমুদুল হাসান বলেন, আমার বর্তমান বয়স আনুমানিক ৩৬ বৎসর। আমি বর্তমানে চট্টগ্রামে একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থায় প্রোগ্রাম ম্যানেজার হিসেবে মৎস্য সেক্টরে কর্মরত আছি। ঘটনার সময় আমি বাগেরহাটে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ছিলাম। আমি ২০০৮ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে মৎস্য বিজ্ঞান বিভাগে ছাত্র থাকাকালীন শিবিরের সমর্থক ছিলাম। ওই সময় ফেসবুকে সরকারের গঠনমূলক সমালোচনা করে লেখালেখি করতাম এবং মিছিল-মিটিংয়ে অংশগ্রহণ করতাম। ২০১৬ সালের ২০ জুন আনুমানিক রাত ৯টার সময় সাদা পোশাকে ২-৩ জন ব্যক্তি আমার রুমে প্রবেশ করে আমাকে গুলে আনে। আমাকে গাড়িতে তুলে হাতে হ্যান্ডকাফ লাগায় এবং মাথায় জম টুপি পরিয়ে দেয়। এরপর থুতনির নিচে ও দুই কাঁধে লাঠি দিয়ে মারছিল এবং কানের ওপরে চড়-থাপ্পড় মারছিল। ১-২ ঘণ্টা গাড়ি চলার পর একটি রুমে এনে এলোপাথাড়ি লাঠি দিয়ে মারতে থাকে। পরে অন্য একটি সেলে এনে গারদের বাইরে হাত বের করে পিছমোড়া করে হ্যান্ডকাফ লাগিয়ে দেয়। আমি বসতে ও ঘুমাতে পারতাম না। এভাবে কিছুদিন থাকার পর রমজান মাস আসে। তখন সকাল, বিকাল ও রাতে তিন বেলা খাবার দিতো। কিন্তু আমি রোজা রাখার জন্য একবেলা খেতে চাইতাম, সেজন্য আমাকে মারধর করা হতো। বলা হতো, এখানে তিনবেলা খাওয়া দাওয়া করার নিয়ম।

জবানবন্দিতে তিনি বলেন, জিজ্ঞাসাবাদের সময়ে ইলেক্ট্রিক শকের কারণে লজ্জাস্থান দিয়ে ৩-৪ দিন রক্ত বের হতো এবং জ্বালাপোড়া করতো। তারা আমাকে মৃত মানুষের বিভিন্ন অঙ্গ প্রত্যঙ্গের ছবি দেখিয়ে বলতো, যদি তাদের কথামতো স্বীকারোক্তি না দিই, তাহলে তোমার অবস্থাও এমন হবে। সেলে থাকার সময় অন্যান্য সেল থেকে নির্যাতনে কান্নার শব্দ শুনতে পেতাম। সেলের ভিতর সবসময় হ্যান্ডকাফ পরিয়ে রাখা হতো। সারাক্ষণ হাতে হ্যান্ডকাফ থাকার কারণে দু হাতের কব্জিতে ঘা হয়ে যায় এবং চোখে কাপড় বেঁধে রাখার কারণে দুই চোখের পাশে ঘা হয়।

জবানবন্দিতে এই ভিকটিম বলেন, একদিন নাপিত এসে আমার চুল দাঁড়ি গুমের আগে যেমন ছিলো তা জেনে নিয়ে তেমন করে কেটে দেয়। নাপিত আমাকে আস্তে আস্তে বলে আপনি খুব সৌভাগ্যবান। এখান থেকে কেউ বের হতে পারে না। এরপর আমাকে একটি বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট পরানো হয়। আমি চোখের বাঁধনের নিচ দিয়ে দেখতে পাই এরগায়ে তাতে র‍্যাব লেখা। পরে আমিসহ আরো তিনজনকে একটি গাড়িতে তোলে। তখন রাতের বেলা ছিল। ৩-৪ ঘণ্টা চলার পর সকাল বেলা কোনো একজায়গায় থামে। আমাদের চোখের বাঁধন খুলে দিয়ে গাড়ি থেকে নামানো হয়। সেখানে অনেক সাংবাদিক ছিল তারা আমাদের ছবি তোলে। আমাদের পার্শ্ববর্তী একটি বাড়ির চারতলা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে র‍্যাব সদস্যরা সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন। এরপর আমাদের র‍্যাব-১ এ নিয়ে আসে। সেখানে থেকে টঙ্গী মডেল থানায় সোপর্দ করে। আমাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র আইন, বিস্ফোরক দ্রব্য আইন ও সন্ত্রাস বিরোধী আইনে তিনটি মামলা দেওয়া হয়। পরবর্তীতে দীর্ঘ ২৫ মাস পর আমার জামিন হয়। কিন্তু জেল গেট থেকে কাউন্টার টেরোরিজম আমাকে মিন্টু রোডস্থ অফিসে নিয়ে একটি সেলে ১৬ দিন গুম করে রাখে। এরপর আমার বাবার উপস্থিতিতে মুচলেকা নিয়ে আমাকে ছেড়ে দেয়। জেলে আটক থাকা অবস্থায় আমার বিরুদ্ধে আরো চারটি মামলা দেওয়া হয়। এ চারটি মামলায় আমি খালাস পেয়েছি। থানায় সোপর্দ কালীন দায়েরকৃত তিনটি মামলা এখনও চলমান আছে। আমাকে গুম করার পিছনে জড়িত ছিল র‍্যাবের ইন্টেলিজেন্স উইং, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং তৎকালীন সরকার। আমি তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।

এএস

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন