বিমানবন্দরে প্রবাসীদের লাশ ছাড় করাতে ভোগান্তি, যা বলছে কর্তৃপক্ষ

আমার দেশ অনলাইন
আমার দেশ অনলাইন

বিমানবন্দরে প্রবাসীদের লাশ ছাড় করাতে ভোগান্তি, যা বলছে কর্তৃপক্ষ
ঢাকায় হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে লাশ সংগ্রহ করে নিয়ে যাচ্ছেন স্বজনরা। ছবি: বিবিসি বাংলা

সৌদি আরবের রিয়াদে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গিয়েছিলেন গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জের ওমর ফারুক। গত ডিসেম্বরের এক রাতে তার লাশ ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এসে পৌঁছায়। কিন্তু সেই লাশ স্বজনরা বুঝে পান পরদিন বেলা ৪টায়। কাগজের জটিলতা আর বিভিন্ন কক্ষের চক্কর কেটে বিমানবন্দর থেকে লাশ বের করতেই সময় লেগে যায় ১৪ ঘণ্টা।

ওমর ফারুকের ভায়রা নুর ইসলাম এই হেনস্তার কথা জানান।

বিজ্ঞাপন

প্রতিবছর প্রবাসে বহু বাংলাদেশির স্বাভাবিক ও দুর্ঘটনাবশত মৃত্যু হয়। সাধারণত বিদেশে বাংলাদেশ মিশন ও প্রবাসী কমিউনিটি লাশ দেশে পাঠাতে সহায়তা করে। তবে লাশ দেশে পৌঁছানোর পর বিমানবন্দর থেকে তা নেওয়ার ক্ষেত্রে মৃতের স্বজনরা চরম জটিলতা ও দুর্নীতির মুখে পড়েন বলে অভিযোগ রয়েছে।

অবশ্য সরকারের ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের মহাপরিচালক মো. আসাদুজ্জামান এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি দাবি করেন, প্রবাসী কর্মীর লাশ দেশে আসামাত্রই কোনো অহেতুক বিলম্ব ছাড়া তা পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। একই সঙ্গে দাফন খরচ বাবদ প্রতিটি পরিবারকে তাৎক্ষণিকভাবে ৩৫ হাজার টাকার চেক দেওয়া হয়। এখন আর এখানে হেনস্তার কোনো সুযোগ নেই।

সম্প্রতি প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এক বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, গত ১৮ এপ্রিল কুয়েত, মালয়েশিয়া ও লিবিয়া থেকে ভিন্ন ভিন্ন ফ্লাইটে ৩৪ জন প্রবাসী বাংলাদেশির লাশ দেশে আসে। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে লাশগুলো দীর্ঘদিন আটকে ছিল। এই ৩৪ জনের লাশ হস্তান্তরের সময়ও সরকারের পক্ষ থেকে দাফন ও অন্যান্য খরচ বাবদ প্রতিটি পরিবারকে ৩৫ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার কর্মকর্তারা জানান, সাধারণত গ্রাম থেকে আসা প্রবাসীদের স্বজনরা বিমানবন্দরের প্রক্রিয়াগুলো সহজে বুঝতে পারেন না। কিছু প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেওয়া নিয়ে সমস্যা তৈরি হলে বিমানবন্দরের ভেতরে থাকা একটি চক্র এর সুযোগ নেয়। তবে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) সার্টিফিকেট থাকলে লাশ পেতে কোনো সমস্যা হয় না।

মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিমানবন্দর থেকে এখন প্রবাসীদের লাশ বিনা খরচে দেশের যেকোনো প্রান্তে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী সম্প্রতি লাশ পরিবহনের জন্য নতুন দুটি অ্যাম্বুলেন্স যুক্ত করার কর্মসূচির উদ্বোধন করেছেন।

বিমানবন্দরের প্রবাসী কল্যাণ ডেস্ক থেকে জানা গেছে, লাশ ও ৩৫ হাজার টাকার আর্থিক সহায়তার চেক পেতে কিছু নির্দিষ্ট কাগজপত্র জমা দিতে হয়। এগুলো হলো—মৃতের পাসপোর্টের ফটোকপি, স্থানীয় চেয়ারম্যান বা কমিশনারের দেওয়া ওয়ারিশ সনদ, মৃতের স্ত্রী বা বাবা-মায়ের এনআইডি কার্ডের ফটোকপি, মৃত্যু সনদের কপি, বাংলাদেশ দূতাবাসের এনওসি এবং এয়ারওয়েজ বিলের মূল কপি।

সঠিক তথ্যের অভাবে অনেকেই প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্র ছাড়াই বিমানবন্দরে চলে আসেন। প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা জানান, এই সুযোগে দুর্নীতিবাজ চক্র সামান্য পরামর্শ দিয়েও টাকা হাতিয়ে নেয়। ওয়ারিশ সনদ না থাকলে টাকা নিয়ে চেয়ারম্যানের কাছ থেকে মোবাইলে ছবি আনানোর মতো কাজ করে তারা টাকা আদায় করে।

অনেকের মতে, বিদেশের মাটিতে মৃত্যুর পর লাশ দেশে আনা আরো জটিল। বিমান ভাড়া সংগ্রহ, দূতাবাসের কাগজ ও কাস্টমস ক্লিয়ারেন্সসহ সংশ্লিষ্ট দেশের অনেক নিয়মকানুন মানতে হয়। কিছু এয়ারলাইন্স আবার লাশ পরিবহন করতেও রাজি হয় না।

এ বিষয়ে ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের মহাপরিচালক জানান, মৃতের পাসপোর্ট নম্বর জানালে সংশ্লিষ্ট দেশে বাংলাদেশ দূতাবাসের লেবার উইংয়ের মাধ্যমে এনওসি সংগ্রহ ও দ্রুততম সময়ের ফ্লাইটে লাশ দেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ৪ হাজার ৮১৩ জন প্রবাসী কর্মীর লাশ দেশে এসেছিল। এর আগের বছর অর্থাৎ ২০২৩ সালে এসেছিল ৪ হাজার ৫৫২ জনের লাশ।

আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী, লাশ পরিবহনের জন্য স্থানীয় হাসপাতাল ও পুলিশের কাগজ, এয়ারলাইন্সের অনুমোদন, বাংলাদেশ দূতাবাসের অনুমতি এবং এমবামিং সার্টিফিকেট প্রয়োজন হয়। বাংলাদেশে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিমানবন্দরে কাস্টমস ও স্বাস্থ্য বিভাগের অনুমোদন শেষে লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

সূত্র: বিবিসি বাংলা

এএম

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...