রাজপথে ‘বাংলা ব্লকেড’, বিক্ষোভের কঠোর বার্তা

স্টাফ রিপোর্টার

রাজপথে ‘বাংলা ব্লকেড’, বিক্ষোভের কঠোর বার্তা

সরকারি চাকরিতে কোটা পদ্ধতি বাতিলসহ চার দফা দাবিতে ২০২৪ সালের ৬ জুলাই রাজধানীসহ সারা দেশের সড়ক-মহাসড়ক অবরোধ করে বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ ক্যাম্পাসগুলোতে ধর্মঘট পালিত হয়।

এ দিন দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে আগের দিনের মতোই বিক্ষোভ ও অবরোধ কর্মসূচি পালিত হলেও গণজমায়েত বাড়তে থাকে। এ সময় আন্দোলনকারীরা সব বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন, ছাত্রধর্মঘট এবং সারা দেশে সড়ক-মহাসড়ক অবরোধের ডাক দেন। এর নাম দেওয়া হয় ‘বাংলা ব্লকেড’।

বিজ্ঞাপন

এ কর্মসূচির অংশ হিসেবে দেশের যোগাযোগের সব গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে শিক্ষার্থীদের অবরোধ করার আহ্বান জানানো হয়। নতুন বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিন হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে ৬ জুলাই।

ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম, খুলনা, কুমিল্লা, কুষ্টিয়া, টাঙ্গাইল, রংপুর, ময়মনসিংহসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভে অংশ নিয়েছিলেন। রাজধানীর শাহবাগ, নীলক্ষেত, সায়েন্স ল্যাব, মিরপুর রোড, বাংলামোটর, মিন্টো রোড, ঢাকা-আরিচা এবং ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক কয়েক ঘণ্টা অচল ছিল।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েট, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় ও ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নেমে মিছিল, পদযাত্রা এবং মানববন্ধনে অংশ নিয়েছিলেন। ‘কোটা না মেধা- মেধা মেধা’, ‘দফা এক, দাবি এক- কোটা নট কাম ব্যাক’, ‘তারুণ্যের হাতিয়ার- গর্জে উঠুক আরেকবার’ স্লোগানে মুখর ছিল রাজপথ।

বেলা ৩টা থেকে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী মিছিল নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ঘুরে শাহবাগ মোড়ে এসে অবরোধ করেন। এ সময় পুলিশ বাধা দেওয়ার চেষ্টা করে। পরে শিক্ষার্থীরা এগোতে থাকলে পুলিশ রাস্তা ছেড়ে দিয়ে মেট্রোরেল স্টেশনের কাছে অবস্থান নেয়। ৪৫ মিনিট অবস্থানের পর তারা বিকাল সাড়ে ৫টার দিকে শাহবাগ ছাড়লে যানচলাচল স্বাভাবিক হয়।

সেখানে ৭ জুলাইর মধ্যে সরকারের প্রতিক্রিয়া না পেলে হরতাল কর্মসূচিতেও যাওয়ার হুঁশিয়ারি দেন আন্দোলনের সমন্বয়ক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, ৭ জুলাই বেলা ৩টা থেকে ‘বাংলা ব্লকেড’ কর্মসূচি হবে। শুধু শাহবাগ মোড় নয়, সায়েন্স ল্যাব, চানখাঁরপুল, নীলক্ষেত, মতিঝিলসহ প্রতিটি পয়েন্টে শিক্ষার্থীরা নেমে এসে কর্মসূচি সফল করবেন। ঢাকার বাইরে শিক্ষার্থীরা জেলায় জেলায় মহাসড়ক অবরোধ করবেন।

এদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সূর্যসেন হলের শিক্ষার্থীদের ব্যানার ছিঁড়ে ফেলেছিলেন ছাত্রলীগের এক নেতা। হলগুলোতে আন্দোলনকারীদের বাধা দিয়েছিল নিষিদ্ধ সংগঠনটির ক্যাডাররা।

৬ জুলাই পুরান ঢাকার তাঁতীবাজার মোড়ে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা অবরোধ করেন। সঙ্গে ছিলেন কবি নজরুল কলেজ ও শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজের শিক্ষার্থীরাও। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা মিছিল নিয়ে হলে হলে ঘুরে আন্দোলনে অংশগ্রহণের আহ্বান জানিয়েছিলেন এবং শেষ পর্যন্ত শহীদ মিনারে অবস্থান নিয়েছিলেন।

টাঙ্গাইলের মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা মহাসড়ক অবরোধ করেছিলেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররাও ঢাকা-রাজশাহী মহাসড়কে ঘণ্টাব্যাপী অবস্থান করেছিলেন।

রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা মডার্ন মোড়ে রংপুর-ঢাকা মহাসড়ক অবরোধ করে সমাবেশ করেছিলেন। কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা মুষলধারে বৃষ্টির মধ্যেও ক্যাম্পাস ফটকের সামনে সড়ক অবরোধ করেছিলেন।

খুলনার শিববাড়ি মোড়ে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্যান্য কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা তৃতীয় দিনের মতো অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছিলেন।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের হাজারো শিক্ষার্থী পুলিশের বাধা উপেক্ষা করে নগরীর ষোলশহর ও দুই নম্বর গেট এলাকায় বিক্ষোভ করেন। এ সময় শিক্ষার্থীরা দুই নম্বর গেট এলাকায় সড়ক অবরোধ করেন।

ময়মনসিংহের আনন্দ মোহন কলেজের ছাত্ররা টাউন হল মোড়ে মানববন্ধন ও সমাবেশ করেছিলেন।

৬ জুলাইয়ের সেই কর্মসূচি শিক্ষা, রাজনীতি ও রাষ্ট্রের সঙ্গে তরুণদের সম্পর্ক নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেছিল। ‘বাংলা ব্লকেড’ শুধু একটি অবরোধ কর্মসূচি ছিল না, তা হয়ে উঠেছিল তারুণ্যের বিদ্রোহের প্রতীক।

কোটা আন্দোলনে অংশ নেওয়ার কারণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগ ডিবেটিং সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক মোশাররফ হোসাইনকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। এর প্রতিবাদে সংগঠনের ২১ সদস্য একযোগে পদত্যাগ করেছিলেন।

ছাত্রদলসহ তিন সংগঠনের সংহতি

শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সঙ্গে সংহতি জানায় ছাত্রদল, ছাত্র ইউনিয়ন ও সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট। ওই সময় ছাত্রদল সাধারণ সম্পাদক নাসির উদ্দিন নাসির বলেন, বর্তমান বাস্তবতায় আমার মনে হয় এ দেশে কোটা থাকা উচিত নয়। শিক্ষার্থীদের এ আন্দোলন অরাজনৈতিক হলেও তাদের দাবির প্রতি ছাত্রদলের পূর্ণ সমর্থন রয়েছে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন