‘মেড ইন ইন্ডিয়া’র আসল অর্থ যখন ‘মেড ইন চায়না’

ভীম ভুর্তেল

‘মেড ইন ইন্ডিয়া’র আসল অর্থ যখন ‘মেড ইন চায়না’

উৎপাদনের পরিমাণের দিক থেকে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ জেনেরিক ওষুধ ভারত তৈরি করে এবং সাশ্রয়ী মূল্যে সরবরাহের মাধ্যমে বিভিন্ন টিকাদান কর্মসূচিতে সহায়তা করে থাকে। এসব অর্জন এ খাতে ভারতের আত্মনির্ভরশীল হয়ে ওঠার ধারণাকেই শক্তিশালী করে। কিন্তু ওপরের এই চাকচিক্যের আড়ালে এ খাতে ভারতের উল্লেখযোগ্য দুর্বলতাও রয়েছে এবং তা দিন দিন প্রকট হচ্ছে। আর এই দুর্বলতাটি হচ্ছে, ভারত তার ওষুধ উৎপাদনের প্রয়োজনীয় কাঁচামালের জন্য দীর্ঘদিন ধরেই চীনের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল।

ভারতের সরকারি থিংক-ট্যাংক ‘নীতি আয়োগ’-এর এক প্রতিবেদনে সরকারের আত্মনির্ভরশীল হওয়ার উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিয়ে কিছু সমস্যার কথা তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনে ভারতের রপ্তানি সক্ষমতার আড়ালে ওষুধ খাতের জন্য চীনা কাঁচামালের ওপর এক ধরনের কাঠামোগত নির্ভরতা লুকিয়ে আছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

প্রতিবেদনে অত্যন্ত ভঙ্গুর এক সরবরাহ ব্যবস্থার চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। উৎপাদন সক্ষমতার দিক থেকে বিশাল হলেও ভারতের এই শিল্প খাতটি আসলে ‘মাটির পায়ের ওপর দাঁড়ানো এক দৈত্যের’ মতো দুর্বল। নীতি আয়োগের ‘ট্রেড ওয়াচ কোয়ার্টারলি’র তথ্য অনুযায়ী, ওষুধ তৈরির মূল উপাদান বা ‘কি স্টার্টিং মেটেরিয়ালস’ (কেএসএম) এবং ‘অ্যাক্টিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্টস’ (এপিআই), যা যেকোনো ওষুধের রাসায়নিক প্রাণকেন্দ্র, তার ৬৫ শতাংশেরও বেশির জন্য ভারত চীনের ওপর নির্ভরশীল।

অ্যান্টিবায়োটিক এবং জ্বর কমানোর ওষুধের মতো জীবনরক্ষাকারী বিভিন্ন শ্রেণির ওষুধের ক্ষেত্রে এই নির্ভরতার হার ৮৫ শতাংশেরও বেশি। এটি কোনো সমকক্ষ অংশীদারত্ব নয়, বরং একটি অত্যন্ত অনিশ্চিত সরবরাহ ব্যবস্থা। ভূ-রাজনৈতিক কোনো অস্থিরতা, বাণিজ্য বিরোধ কিংবা চীনের কোনো বন্দরে নতুন করে লকডাউন—এসবের যেকোনো একটি ঘটনা ভারতের জন্য এই গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহ ব্যবস্থাকে অচল করে দিতে পারে।

এর ফলে ভারত এবং সাশ্রয়ী ওষুধের জন্য ভারতের ওপর নির্ভরশীল অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশে দ্রুত জনস্বাস্থ্য সংকট দেখা দিতে পারে। ভারতের ‘বিশ্বের ফার্মেসি’ (ফার্মেসি অব দ্য ওয়ার্ল্ড) খেতাবের সঙ্গে এখন ‘মেড ইন চায়না’ বা ‘চীনে তৈরি’র একটি সতর্কবার্তা যুক্ত হওয়া প্রয়োজন।

এই নির্ভরতা নরেন্দ্র মোদি সরকারের ‘মেড ইন ইন্ডিয়া’ বা ‘ভারতে তৈরি’ নীতির আওতায় গড়ে ওঠা অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যদিও সরকারের নীতিমালায় স্থানীয় উৎপাদনকে উৎসাহিত করা হচ্ছে, তবুও এই শিল্পের সরবরাহ ব্যবস্থা চীনের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে আছে।

নীতি আয়োগের প্রতিবেদনটি সরকারি বিবৃতি এবং ওষুধশিল্পের প্রকৃত আমদানি-নির্ভরতার মধ্যেকার পার্থক্য তুলে ধরেছে। একটি শীর্ষস্থানীয় খাত কীভাবে আমনারির ওপর এতটা নির্ভরশীল হয়ে পড়ল, তা একটি বড় প্রশ্ন। ভারত উৎপাদনশীলতার দিক থেকে এগিয়ে থাকলেও সবসময় লাভজনক অবস্থানে থাকে না। বিশ্বজুড়ে ব্যবহৃত টিকার প্রায় ৬০ শতাংশ অর্থাৎ প্রতি দশটির মধ্যে ছয়টিই ভারত সরবরাহ করে, যা দেশটিকে বিশ্বব্যাপী স্বীকৃতি এনে দিয়েছে। কিন্তু অর্থমূল্যের (ডলারের) দিক থেকে ভারত একেবারেই পিছিয়ে আছে। বিশ্ব টিকার বাজারে মূল্যের দিক থেকে ভারতের হিস্যা নগণ্য, মাত্র শূন্য দশমিক ৬ শতাংশ।

আয়ের প্রতি ডলারের বিপরীতে ভারত পায় এক পেনিরও (এক সেন্টের একশ ভাগ) কম। মূলত ভারতীয় অর্থনীতি তার উৎপাদন সক্ষমতার সুবিধাটি যেন বিনামূল্যে বিলিয়ে দিচ্ছে। শিল্পনীতির ক্ষেত্রে এটি এক ধরনের দাতব্য কর্মকাণ্ড যা যেমন উদার, তেমনি দীর্ঘমেয়াদে অস্থিতিশীল। নীতি আয়োগের ভাইস চেয়ারম্যান অশোক কুমার লাহিড়ী বলেছেন, ভারতের শিল্প খাত কঠোর পরিশ্রম করলেও তার বিপরীতে উপযুক্ত অর্থনৈতিক সুফল অর্জনে ব্যর্থ হচ্ছে। বিশ্বব্যাপী ওষুধ শিল্প যখন বায়োলজিকস, সেল ও জিন থেরাপি এবং ইমিউনোলজিকসের মতো উচ্চ-মুনাফার ক্ষেত্রগুলোর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন ভারতের জন্য এই চ্যালেঞ্জ আরো ঘনীভূত হচ্ছে।

এর বিপরীতে, ভারতের শিল্প খাত এখনো স্বল্পমূল্যের জেনেরিক ওষুধ তৈরির মডেলেই আটকে আছে। এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ব্যবসা হলেও এতে মুনাফার হার খুবই কম। এই উদ্ভাবন-ঘাটতির কারণটি কোনো রহস্য নয়। এটি মূলত অপর্যাপ্ত বিনিয়োগ, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণমূলক হস্তক্ষেপের ফল। এসবের সম্মিলিত প্রভাবেই এ খাতটি তার সৃজনশীলতার প্রাণশক্তি বা ‘অক্সিজেন’ হারিয়ে ফেলেছে।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনের শীর্ষস্থানীয় ওষুধ কোম্পানিগুলো সাধারণত তাদের আয়ের ১৫ থেকে ২০ শতাংশ গবেষণা ও উন্নয়নে (আরঅ্যান্ডডি) বিনিয়োগ করে। এটি এমন একটি প্রতিশ্রুতি যার আওতায় একটিমাত্র ওষুধ উদ্ভাবনের পেছনেই বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ব্যয় এবং এক দশকের মতো সময় লেগে যেতে পারে। কিন্তু নীতি আয়োগের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণসহ বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, ভারতীয় ওষুধ কোম্পানিগুলো এ খাতে মাত্র ৭ শতাংশ বিনিয়োগ করে।

ভারতের পেটেন্ট বা মেধাস্বত্ব অনুমোদনের প্রক্রিয়াটি ধীর ও জটিল যা উদ্ভাবক ও বিনিয়োগকারীদের নিরুৎসাহিত করে এবং দীর্ঘমেয়াদি উদ্ভাবনের আগ্রহ কমিয়ে দেয়। এসব চ্যালেঞ্জের কারণে কোম্পানিগুলো নতুন ওষুধ তৈরির পরিবর্তে বিদ্যমান ওষুধের অনুলিপি বা ‘কপি’ তৈরির দিকে ঝুঁকতে পারে।

পরিবেশগত যেসব বিধিনিষেধের মাধ্যমে দায়িত্বশীল ব্যবস্থাপনাকে উৎসাহিত করার কথা ছিল, সেগুলো উল্টো আমলাতান্ত্রিক জটিলতার বেড়াজালে আবদ্ধ হয়ে পড়েছে। ‘জিরো লিকুইড ডিসচার্জ (জেডএলডি)’-এর মতো কঠোর নিয়মগুলোর উদ্দেশ্য মহৎ হলেও এগুলো উৎপাদন খরচ ব্যাপকভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে। এই বাড়তি খরচের বোঝা বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগগুলোর ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে, যারা এপিআই খাতের মেরুদণ্ড হিসেবে কাজ করে।

কিছু গবেষণা ও উন্নয়ন কার্যক্রমে এখন ব্যয়ের ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশই বিজ্ঞানচর্চার পরিবর্তে বর্জ্য পানি ব্যবস্থাপনা এবং পরিবেশগত অনুমোদনের জটিলতা সামলানোর পেছনে ব্যয় হচ্ছে। এজন্য কারখানার মালিকরা যৌক্তিক কারণেই দেশে কাঁচামাল উৎপাদন বন্ধ করে চীন থেকে অপেক্ষাকৃত সস্তা ও বিধিনিষেধ-মুক্ত সংস্করণ আমদানি করে থাকে। ফলে পরিবেশগত বিধিনিষেধগুলো দেশের অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা বাড়ানোর পরিবর্তে উল্টো আমদানি বৃদ্ধি এবং চীনের ওপর নির্ভরতা বাড়িয়ে দিয়েছে। অভ্যন্তরীণ নীতির এই ব্যর্থতার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে, এমন এক পররাষ্ট্রনীতি যা অনেক সময় অর্থনৈতিক বিবেচনার চেয়ে ভূ-রাজনীতিকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে।

২০২০ সালে চীনের সঙ্গে সীমান্ত উত্তেজনার পর থেকে ভারত পশ্চিমা বিশ্বের ‘চায়না প্লাস ওয়ান’ (চীন ছাড়াও অন্য দেশে বিনিয়োগ বা উৎপাদন) এবং ‘ডিকাপলিং’ (চীন থেকে অর্থনৈতিক বিচ্ছিন্নতা) কৌশলগুলোকে অত্যন্ত আগ্রহের সঙ্গে গ্রহণ করেছে। দেশটি চীনা বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি হস্তান্তরর ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে, যে পদক্ষেপকে শক্তির বহিঃপ্রকাশ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। অথচ নীতি আয়োগের প্রতিবেদনে পরোক্ষভাবে এটিই উঠে এসেছে যে, এর ফলে নির্ভরতা কমেনি; বরং তা আরো অস্বচ্ছ হয়ে পড়েছে।

পশ্চিমা দেশগুলো ভারতের এই অবস্থানকে স্বাগত জানালেও তারা নিজেরা চীনের সঙ্গে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ চুক্তি জোরদার করছে এবং নিজেদের সরবরাহ ব্যবস্থাকেও সুরক্ষিত রাখছে। অথচ ভারতের সরবরাহ ব্যবস্থা এখনো ঝুঁকিপূর্ণই রয়ে গেছে। ভারত একদিকে চীনের সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর ক্রমশ বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে, অন্যদিকে, সংকট মোকাবিলা ও ব্যবস্থাপনার জন্য চীনের সঙ্গে প্রয়োজনীয় কূটনৈতিক সম্পর্ক এখনো নড়বড়েই রয়ে গেছে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ভারতের এমন বাস্তবসম্মত কৌশল গ্রহণ করা প্রয়োজন, যা রাজনৈতিক বাগাড়ম্বরের চেয়ে জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেবে।

চীনকে কেবল প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখার মধ্যে সুনির্দিষ্ট বাণিজ্যিক ঝুঁকি আছে। প্রথমত, এর ফলে ওষুধের ঘাটতি দেখা দিতে পারে। এপিআই সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে খরচ বেড়ে যাবে এবং ওষুধ প্রাপ্তির সুযোগ সীমিত হয়ে পড়বে, বিশেষ করে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য। দ্বিতীয়ত, এর ফলে দীর্ঘমেয়াদি প্রযুক্তিগত ব্যবধান তৈরি হতে পারে। চীন এখন আর কেবল পণ্য উৎপাদনকারী দেশ নয়, বরং ডিজিটাল অবকাঠামো, নবায়নযোগ্য শক্তি এবং উন্নত উৎপাদন প্রযুক্তির ক্ষেত্রে দেশটি বিশ্বনেতার আসনে নিজেকে অধিষ্ঠিত করেছে। এদিক থেকে ভারত চীনের ধারে-কাছেও নেই।

প্রকৃত আত্মনির্ভরশীলতা অর্জনের জন্য গবেষণা ও উন্নয়নে ধারাবাহিক বিনিয়োগ, একটি দক্ষ পেটেন্ট প্রক্রিয়া এবং কার্যকর অথচ পালনযোগ্য পরিবেশগত বিধিমালার প্রয়োজন। ভারত যতক্ষণ না এসব ও অন্যান্য সমস্যার সমাধান করছে, ততক্ষণ পর্যন্ত ‘মেড ইন ইন্ডিয়া (ভারতে তৈরি)’-কে ‘মেড ইন চায়না (চীনে তৈরি)’-র ওপর নির্ভরশীল হয়েই থাকতে হবে।

এশিয়া টাইমস অবলম্বনে মোতালেব জামালী

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ

এলাকার খবর
Loading...