বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাসে ব্যক্তিপূজা এবং ব্যক্তি-বন্দনা এক অন্যতম প্রধান সংক্রামক ব্যাধি বা দুরারোগ্য ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। ক্ষমতার কাছাকাছি থাকা বা ক্ষমতাকে ব্যবহার করে ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিল, চাঁদাবাজি এবং ক্ষমতার বলয় তৈরি করতে ব্যক্তি-বন্দনাকে এ দেশে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে বছরের পর বছর ধরে। এই চাটুকারিতার সংস্কৃতি রাজনৈতিক কর্মীদের সৃজনশীলতা ও আদর্শিক নিষ্ঠাকে ধ্বংস করে তাদের অন্ধ অনুসারীতে পরিণত করে।
এই দীর্ঘকালীন অপরাজনীতির ইতিহাসে সম্প্রতি একটি ব্যতিক্রমী এবং অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক ঘটনা আমরা লক্ষ করেছি। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) শীর্ষনেতা তারেক রহমান দলীয় নেতাকর্মী ও জনপ্রতিনিধিদের কঠোর নির্দেশনা দিয়েছেন যে, ব্যক্তিগত স্বার্থ, প্রচার-প্রচারণা বা অন্য কোনো রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের উদ্দেশ্যে যেখানে-সেখানে বা যত্রতত্র জিয়া পরিবার কিংবা তার ছবি ব্যবহার করা যাবে না। এরই ধারাবাহিকতায় গত ৫ জুলাই মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সাধারণ অধিশাখা কর্তৃক স্বাক্ষরিত একটি পরিপত্রে সরকারি অনুষ্ঠানের ব্যানার, ফেস্টুন ও বিলবোর্ডে প্রধানমন্ত্রীর ছবি ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। রাজনীতিতে ব্যক্তিগত প্রচার-প্রচারণা বন্ধ করার ক্ষেত্রে এবং সুস্থ ধারার গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনার আন্দোলনে এটি একটি অবিস্মরণীয় ও যুগান্তকারী দৃষ্টান্ত।
একটি স্বাধীন রাষ্ট্রে রাজনৈতিক সংস্কৃতি কেমন হওয়া উচিত, তা নির্ধারণ করে দলের শীর্ষ নেতাদের আদর্শিক অবস্থান। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, বিগত দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে আওয়ামী শাসনামলে আমরা দেখেছি সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র। আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনের মূল চালিকাশক্তিই যেন ছিল ব্যক্তি-বন্দনা। ‘বঙ্গবন্ধু বন্দনা’ এবং ‘শেখ হাসিনা বন্দনা’র নামে দেশে একপ্রকার শ্বাসরুদ্ধকর পরিবেশ তৈরি করা হয়েছিল। শুধু রাজনৈতিক মঞ্চেই নয়, রাষ্ট্রীয় প্রশাসন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে পাঠ্যপুস্তক পর্যন্ত সর্বত্র এই বন্দনা সংস্কৃতিকে বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল। দেশের সাধারণ মানুষের প্রাণের উৎসব অমর একুশে বইমেলাকেও রেহাই দেওয়া হয়নি এই বলয় থেকে। ২০২২ সালের অমর একুশে গ্রন্থমেলা প্রাঙ্গণ ও সমসাময়িক রাজনৈতিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করলে এর ভয়াবহতা আঁচ করা যায়। সেবারের মেলায় শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবর্ষ এবং স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীকে প্রতিপাদ্য করে মেলাজুড়ে প্রায় ৪০০টির মতো বই প্রকাশ করা হয়েছিল। একে সাধারণ পাঠক এবং বিশ্লেষকরা ‘আওয়ামী লীগের কীর্তনমেলা’ হিসেবে অভিহিত করেছিলেন।
বাস্তবতা হলো, শেখ মুজিবের যতটুকু অবদান এদেশের জন্য রয়েছে—তার জন্য অনেক মানুষ তাকে শ্রদ্ধা করে, তার মানে এই নয় যে তার নাম ব্যবহার করে মানুষকে বিরক্ত করা হবে কিংবা রাজনৈতিক সুবিধা আদায় করা হবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর একশ্রেণির অদক্ষ শিক্ষক কলোনিয়াল ও সাম্প্রদায়িক প্যারাডাইমকে কপি-পেস্ট করে গবেষণাহীন, চর্বিত চর্বণ এবং ভুলে ভরা বই প্রকাশ করে গেছেন শুধু সরকারি অনুদান ও ব্যক্তিগত সুবিধা আদায়ের জন্য। যেখানে তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন ছিল, যেখানে লেখকদের মধ্যে তথ্যসূত্র বা ঋণ স্বীকার না করার তীব্র প্রবণতা ছিল, সেগুলো মুজিববর্ষের ‘ভুয়া’ তকমা দিয়েছিলেন খোদ নিরপেক্ষ সাহিত্যিকরাই। চাটুকারিতার এই প্রতিযোগিতায় মেধার অবমূল্যায়ন ঘটেছিল চরমভাবে।
সবচেয়ে ভয়ের বিষয় ছিল, এই ব্যক্তি-বন্দনার আড়ালে ভিন্নমতের সম্পূর্ণ কণ্ঠরোধ করা হয়েছিল। শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে শত শত বই প্রকাশ হলেও তার রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তকে যারা যৌক্তিকভাবে সমালোচনা করতে চেয়েছেন, তাদের বই কেউ প্রকাশ করতে দেয়নি। বইমেলা প্রাঙ্গণে লেখক হত্যা, প্রকাশনী ও স্টল বন্ধ করে দেওয়া, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দিয়ে বইয়ের বিষয়বস্তু পরীক্ষা করার ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি করে পুরো ভিন্নমতকে স্তব্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। একনায়কতান্ত্রিক শাসনকে দীর্ঘায়িত করতে বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চাকেও লোহার শৃঙ্খলে আবদ্ধ করা হয়। আওয়ামী সংস্কৃতির এই সর্বগ্রাসী নিয়ন্ত্রণের প্রবণতা যে শুধু বইমেলায় ছিল তা নয়; তা বিস্তৃত ছিল স্থানীয় সরকার নির্বাচন থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের প্রতিটি রন্ধ্রে রন্ধ্রে।
লর্ড অ্যাকটনের সেই বিখ্যাত উক্তি—‘Absolute power corrupts absolutely’ (সার্বিক ক্ষমতা মানুষকে সার্বিকভাবই দুর্নীতিগ্রস্ত করে)। আওয়ামী লীগের ক্ষেত্রেও ঠিক তা-ই ঘটেছিল। সমালোচনার পথ রুদ্ধ করে দেওয়ায় তাদের একনায়কতান্ত্রিক মনোভাব ক্রমান্বয়ে সীমালঙ্ঘন করে গিয়েছিল। একদম স্থানীয় পর্যায়—অর্থাৎ ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনেও তারা দলীয় প্রতীক চাপিয়ে দিয়েছিল, যেন তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত সর্বত্র একক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা যায়। এর ফলে গ্রামীণ জনপদে সামাজিক সম্প্রীতি বিনষ্ট হয় এবং দলীয় কোন্দল চরম আকার ধারণ করে। ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের প্রহসনমূলক নির্বাচনের মাধ্যমে তারা ক্ষমতাকে চিরস্থায়ী করতে চেয়েছিল। তবে ইতিহাস নির্মম। সীমালঙ্ঘন ও স্বৈরাচারের চরম ফলস্বরূপ তারা ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে দেশ থেকে সমূলে বিতাড়িত হয়েছে। বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এরই ফলে টকশো কিংবা সংবাদপত্রের কলামে বিভিন্ন এমপি ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা কঠোর ভাষায় বর্তমান সরকার ও শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিবর্গের কাজ, কর্ম ও উদ্যোগের কঠোর সমালোচনা করছেন, যা স্বাধীন বাকস্বাধীনতার বহিঃপ্রকাশ। তবে মনে রাখতে হবে, স্বাধীনতার নাম অবাধ স্বাধীনতা বা স্বেচ্ছাচারিতা নয়; সেখানেও যৌক্তিক দায়বদ্ধতা থাকতে হবে।
আওয়ামী লীগ যখন ক্ষমতা কুক্ষিগত করে আজীবন ক্ষমতায় থাকার নেশায় মত্ত ছিল, তখন তারা জাতীয় সার্বভৌমত্বকে জলাঞ্জলি দিয়েছিল। ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে তারা প্রতিবেশী দেশের প্রভুত্ব মেনে নিয়েছিল নির্দ্বিধায়। আওয়ামী লীগের এক সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্বয়ং ভারতে গিয়ে অনুরোধ করেছিলেন যে, ‘আওয়ামী লীগকে আবার ক্ষমতায় আনতে হবে, তাহলে ভারতেরই লাভ।’ সবচেয়ে লজ্জাজনক বিষয় হলো, বাংলাদেশে ফিরে এসে মিডিয়ার সামনে বুক ফুলিয়ে তিনি এই বক্তব্য স্বীকার করেছিলেন এবং তারপরও তিনি নিজ পদে বহাল ছিলেন। একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের মন্ত্রী যখন বিদেশি শক্তির সহায়তা নিয়ে ক্ষমতায় থাকার আকুতি জানান, তখন তা দেশের সার্বভৌমত্ব ও জনগণের আত্মমর্যাদাকে চরমভাবে ক্ষুণ্ণ করে।
এই চরম ক্রান্তিকালে ব্যক্তি-বন্দনার সংস্কৃতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসার যে দৃঢ় প্রত্যয় বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব দেখিয়েছে, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। এটি অনস্বীকার্য যে, আওয়ামী সংস্কৃতির যে ক্ষতিকর প্রভাব ও ক্ষমতার লোভ, তা দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষমতার বাইরে থাকা বিএনপির তৃণমূল বা মাঝারি স্তরের নেতাকর্মীর মধ্যেও দেখা যেতে পারে। ক্ষমতার স্বাদ বা প্রভাব বিস্তারের জন্য ছবি ব্যবহার করে ব্যানার-ফেস্টুন টানানো কিংবা প্রভাব খাটানোর মনস্তাত্ত্বিক প্রবণতা রাজনীতিতে একটি সাধারণ রোগ। কিন্তু পার্থক্য গড়ে দেয় দলের অভিভাবকত্ব। বিএনপির দলীয় শীর্ষজনরা নিজেদের আদর্শগত জায়গা থেকে নীতিতে অটল থেকে কার্যত এসব ক্ষতিকর প্রবণতা দমন করার দৃষ্টান্ত স্থাপন করে চলেছেন। তারেক রহমান এর আগে নির্বাচনের আগে এবং পরে নেতাকর্মীদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, কোনো ব্যক্তির স্তুতি বা ছবি ব্যবহার করে এলাকায় চাঁদাবাজি, ব্যক্তিস্বার্থ উদ্ধার বা কোনো ধরনের বাড়াবাড়ি সহ্য করা হবে না। বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কালে দুই হাজারেরও বেশি দলীয় নেতাকর্মীকে বহিষ্কারের নজির স্থাপন করেছেন। দলের এই কঠোর ও ত্বরিত অবস্থান প্রমাণ করে, বিএনপি নেতাদের পোস্টার-ব্যানারে নয়, জনগণের হৃদয়ে স্থান করে নেওয়ার রাজনীতিতে বিশ্বাসী এবং একটি সুস্থ ও পরিচ্ছন্ন রাজনৈতিক ধারা বিনির্মাণে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
ইতিহাসের খতিয়ান ঘাঁটলে দেখা যায়, জিয়া পরিবার বাংলাদেশ রাষ্ট্র এবং এদেশের জনগণের সংকটে সবসময় এক অনন্য ও ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছে। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ মেজর জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণা যখন দিশাহারা জাতিকে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার মন্ত্র জুগিয়েছিল, ঠিক তেমনি ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর সিপাহি-জনতার বিপ্লবের মাধ্যমে তিনি রাষ্ট্রকে এক চরম নৈরাজ্য থেকে রক্ষা করেছিলেন। বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবক্তা হিসেবে তিনি স্তিমিত হয়ে যাওয়া গণতন্ত্রকে পুনরুজ্জীবিত করেছিলেন। পরে নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার আপসহীন নেতৃত্ব এবং দীর্ঘ দেড় দশক ধরে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে বিএনপি নেতাকর্মীদের আত্মত্যাগ এদেশের গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। ক্রান্তিকালীন সময়ে জিয়া পরিবার সর্বদা দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং বহুদলীয় গণতন্ত্রের স্বার্থে নিজেকে উৎসর্গ করেছে, কিন্তু কখনো বিদেশি প্রভুদের চাটুকারিতা করেনি।
সবশেষে বলা যায়, প্রধানমন্ত্রীর ‘ছবি ব্যবহার করা যাবে না’—এই ঘোষণাটি শুধু একটি নির্দেশনা নয়, এটি বাংলাদেশকে ব্যক্তিপূজার মরণকামড় থেকে মুক্ত করার এক সাহসী ও সুদূরপ্রসারী পদক্ষেপ। রাজনীতি হওয়া উচিত নীতির ওপর ভিত্তি করে, কোনো ব্যক্তির অন্ধ বন্দনার ওপর নয়। সরকারি প্রতিষ্ঠান কেন প্রধানমন্ত্রীর ছবি প্রদর্শন করবে, তাদের কাজ ব্যানারে সঠিক মেসেজটি ফুটিয়ে তোলা। এই নির্দেশনার ফলে তৃণমূলের রাজনীতি ও প্রশাসনের সর্বত্র চাটুকারদের দৌরাত্ম্য কমবে এবং ত্যাগী ও যোগ্য কর্মীরা মূল্যায়িত হওয়ার সুযোগ পাবেন। আওয়ামী লীগ যে নিয়ন্ত্রণমূলক ও প্রভুত্বকামী সংস্কৃতির জন্ম দিয়েছিল, তা থেকে শিক্ষা নিয়ে বিএনপি যদি এই নীতিতে অটল থাকতে পারে, তবেই বাংলাদেশে প্রকৃত বহুদলীয় গণতন্ত্র, পরমতসহিষ্ণুতা এবং জবাবদিহিমূলক রাজনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হবে। একটি স্বৈরাচারমুক্ত, স্বাধীন ও আত্মমর্যাদাশীল বাংলাদেশ বিনির্মাণের পথে এই আদেশের অনুকূল ও সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত যুগান্তকারী আলো ছড়াবে—এটাই আজ সমগ্র দেশবাসীর প্রত্যাশা।
লেখক : রাজনীতি বিশ্লেষক, সাবেক অধ্যাপক, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


