বাজেটে কর্মসংস্থান এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ

আনোয়ার ফারুক তালুকদার

বাজেটে কর্মসংস্থান এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ

আসন্ন ২০২৬-২৭ সালের বাজেট আগামী ১১ জুন সংসদে উপস্থাপন করতে পারেন বিএনপি সরকারের অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এটি তাদের প্রথম বাজেট। বিভিন্ন পত্রপত্রিকার প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে জানা যায়, এবারের বাজেটের আকার হতে পারে ৯ লাখ ৩২ হাজার কোটি টাকার মতো। গতবারের বাজেট ছিল ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা। টাকার অঙ্কে স্বাধীনতার পর এটি সর্বোচ্চ এবং এটাকে উচ্চাভিলাষী বাজেট বলা যায়। এবারের বাজেটের অন্যতম লক্ষ্য হবে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা, যা বিএনপির অন্যতম প্রধান নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি। সরকার আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে এক কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য নির্ধারণ করে কাজ করছে এবং এর একটি বড় অংশই আগামী দুই বছরের মধ্যে অর্জন করতে চেষ্টা করা হচ্ছে বলে এক নাগরিক সভায় জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। কর্মসংস্থান করতে হলে বন্ধ কলকারখানা চালুসহ নতুন শিল্পে বিনিয়োগ করার উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে।

অর্থাৎ বিদ্যুৎ ও গ্যাসের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে হবে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ ঋণ, কর প্রণোদনা এবং প্রযুক্তিগত সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে স্থানীয় অর্থনীতি শক্তিশালী হবে এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পাবে। এদিকে বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) বলছে, চলতি অর্থবছরের জিডিপির প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশের নিচে থাকবে। এমতাবস্থায় প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশের ওপরে রাখতে হলে দেশের ব্যবসার পরিবেশ স্থিতিশীল রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। খেলাপি ঋণ এখন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সমস্যা। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের হিসাবে মোট ঋণের প্রায় ৩০ শতাংশ খেলাপি হয়ে আছে। খেলাপি ঋণের কশাঘাতে আমাদের অর্থনীতি বিপর্যস্ত। খেলাপি ঋণ আদায়ে জোর পদক্ষেপ নিতে প্রয়োজনে বিশেষ প্রণোদনা দেওয়ার ব্যবস্থা রাখা যেতে পারে আসন্ন বাজেটে। বৃহৎ ঋণ আদায়ের জন্য ব্যাংকগুলোর মধ্যে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ব্যবস্থা নিলে ঋণ আদায় বা পুনঃতফসিলীকরণ সহজ হতে পারে। বড় ঋণ আদায়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রত্যক্ষ তদারকি সুফল দিতে পারে।

বিজ্ঞাপন

দেশের চলমান মূল্যস্ফীতি মানুষের ক্রয়ক্ষমতাকে সংকুচিত করছে এবং ফলে মানুষের জীবনধারণের কষ্ট বহুগুণে বাড়িয়ে দিচ্ছে। এর বহুমুখী প্রভাব পড়ছে অর্থনীতিতে। মূল্যস্ফীতিকে সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনা অন্যতম লক্ষ্য হওয়া উচিত এই বাজেটের, যা গত এপ্রিল মাসে ৯ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশে পৌঁছায়। দ্রব্যমূল্যের কশাঘাতে নিম্ন আয়ের মানুষের জীবন যখন অতিষ্ঠ, সেই অবস্থায় নতুন সরকারের প্রথম বাজেটে সাধারণ মানুষের জন্য স্বস্তির বার্তা থাকবে এই বাজেটে, এমনি আশা সংশ্লিষ্টদের। শুধু নীতি সুদহার বাড়তি রেখে মূল্যস্ফীতি কমানোর হাতিয়ার খুব একটা কাজে দিচ্ছে না বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এর বাইরে নতুন কি পদক্ষেপ নেওয়া যায়, তা নিয়ে গবেষণা দরকার।

আমাদের মূল্যস্ফীতি সরবরাহজনিত, তাই পণ্যের সরবরাহ বৃদ্ধি করে পাশাপাশি নীতি সুদহার সমন্বয় করে দেখা যেতে পারে। বাংলাদেশের অর্থনীতি গত এক দশকে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি অর্জন করলেও বেশ কিছু কাঠামোগত দুর্বলতা রয়ে গেছে। যেমন কর-জিডিপি অনুপাত প্রায় ৮-৯ শতাংশের মধ্যে আটকে আছে, যা দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের তুলনায় অনেক কম। ফলে সরকার নিজস্ব রাজস্ব খাত থেকে উন্নয়ন খাতে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ করতে পারে না, যার জন্য দেশি, বিদেশি ঋণ ও সহায়তার ওপর নির্ভর করতে হয়। সরকারের রাজস্ব আহরণের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। প্রত্যক্ষ করের অংশ বৃদ্ধি করে পরোক্ষ করের ওপর নির্ভরতা কমাতে হবে, যাতে সাধারণ জনগণের ওপর চাপ কমে এবং রাজস্ব কাঠামো আরো ন্যায্য হয়। বিদ্যমান করদাতার ওপর চাপ না বাড়িয়ে করের আওতা বাড়ানো উচিত। আমাদের দেশের কর কাঠামো অনেকটা ভালো ছাত্রের ওপর পড়া বাড়িয়ে দেওয়ার মতো। অর্থাৎ যে ভালো পড়া পারে, তার ওপর ছাপিয়ে দাও। তেমনি আমাদের দেশের যারা নিয়মিত কর দেয়, তাদের ওপর ফি বছর করের বোঝা বাড়তে থাকে।

কর-জিডিপি অনুপাতকে ধাপে ধাপে ১২-১৫ শতাংশে উন্নীত করার একটি বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা থাকতে হবে। আমাদের গতানুগতিক করব্যবস্থা থেকে বের হয়ে প্রগ্রেসিভ করব্যবস্থায় প্রবেশ করা উচিত। মানুষ যেন কর দিতে উৎসাহী থাকে, সেই ব্যবস্থাপনা জরুরি। যারা কর দেন, তাদের জন্য নির্দিষ্ট হারে পেনশনের ব্যবস্থা রাখা একটি বড় প্রণোদনা হতে পারে। আমাদের দেশে সরকারি চাকরিজীবীরাই শুধু পেনশনের আওতায় আসে। কিন্তু বেসরকারি চাকরিজীবীদের কোনো পেনশনের ব্যবস্থা নেই। বেসরকারি চাকরিজীবীদের পেনশনের আওতায় আনার জন্য করদাতাদের প্রদেয় করের ১০ শতাংশ তাদের অবসরের সময় পেনশন আকারে দেওয়ার ব্যবস্থা করার জন্য প্রস্তাবনা আশা করছি। এটি করদাতাদের জন্য কর প্রদানে উৎসাহিত করবে বলেই অনেকের বিশ্বাস।

আমাদের দেশে কর শনাক্তকরণ নম্বরধারীর সংখ্যা প্রায় ১ কোটি ২৮ লাখ অথচ নিয়মিত আয়কর রিটার্ন দাখিল করেন ৪২ থেকে ৪৬ লাখের কাছাকাছি। এই বিপুলসংখ্যক মানুষকে কর প্রদানের আওতায় আনতে পারে করদাতাদের জন্য পেনশন স্কিম। মানুষের ব্যয়যোগ্য আয় বিবেচনায় নিয়ে করারোপ করা উচিত। দেখা যায়, আমাদের দেশে বহুদিন ধরে করের নিম্নসীমা সাড়ে ৩ লাখ থেকে ৫ লাখ টাকার মধ্যে রয়েছে। সেই নিম্নসীমাকে ৫ থেকে ৮ লাখ টাকায় উন্নীত করা প্রয়োজন। যেভাবে মূল্যস্ফীতি মানুষের ব্যয়যোগ্য আয়কে কমিয়ে ফেলছে, তা বিবেচনার দাবি রাখে। এমনকি আমাদের সমপর্যায়ের অর্থনীতির দেশগুলোয়ও করের নিম্নসীমা ৫ লাখ টাকার অধিক রয়েছে। সেই বিবেচনায় করের নিম্নসীমা ৫ লাখে উন্নীত করলে কর প্রদানে মানুষের উৎসাহ যেমন বাড়বে এবং বেশিসংখ্যক মানুষ কর প্রদানে আগ্রহী হবেন বলেই সংশ্লিষ্টদের বিশ্বাস।

এদিকে রপ্তানির প্রায় ৮০ শতাংশ তৈরি পোশাক খাত থেকে আসা একক খাতের ওপর নির্ভরশীলতাকে তুলে ধরে। এ জন্য রপ্তানি বহুমুখীকরণ করতে হবে। পোশাক খাতের মতো অন্য খাতে আরো বেশি করে প্রণোদনার ব্যবস্থা রাখা যেতে পারে এই বাজেটে। আগামী বাজেটে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে আরো বেশি বরাদ্দের দাবি রাখে। কারণ শিক্ষিত মানুষ জাতি গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

এছাড়া দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলতে কারিগরি শিক্ষার ওপর জোর দেওয়া যেতে পারে। আমাদের দেশে সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষিত জনগোষ্ঠী বাড়ছে; কিন্তু তাদের যথাযথ কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা যাচ্ছে না। কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিতরা দেশে যেমন স্বকর্মে নিয়োজিত থাকতে পারেন, তেমনি বিদেশে গেলে উচ্চ বেতনের কাজ পেতে পারেন, যা দেশের রেমিট্যান্স আয়ে গতি আনতে পারে। বাজেটে এই জাতীয় বিষয়ে সুনির্দিষ্ট ঘোষণা থাকা উচিত। মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা প্রশমিত হলে, সেখানে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের কাজ বেগবান হবে। সেখানে আমরা যাতে পর্যাপ্তসংখ্যক দক্ষ জনবল পাঠাতে পারি, সেজন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেয়ে রাখা যেতে পারে। নতুন সরকারে কাছে মানুষের প্রত্যাশা আকাশচুম্বী, কারণ ১৭ বছর পর মানুষ নিজেদের ভোট দিয়ে একটি গণতান্ত্রিক সরকার পেয়েছে। দেখা যাক নতুন সরকার মানুষের প্রত্যাশার কতখানি কাছাকাছি যেতে পারে।

লেখক : ব্যাংকার ও অর্থনীতি বিশ্লেষক

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন