স্মৃতির পাতায় শিল্পের মহিরুহ মুস্তাফা মনোয়ার

কামরুননেসা-হাসান
কামরুননেসা হাসান

স্মৃতির পাতায় শিল্পের মহিরুহ মুস্তাফা মনোয়ার

মৃত্যু জীবনের অবসান ঘটায়; কিন্তু কিছু মানুষের সৃষ্টিশীলতা, চিন্তা ও কর্ম তাদের সময়ের সীমানা অতিক্রম করে চিরকাল বেঁচে থাকে। মুস্তাফা মনোয়ার তেমনই একজন বিরল প্রতিভার অধিকারী মানুষ—যিনি শুধু একজন শিল্পী ছিলেন না, তিনি ছিলেন বাংলাদেশের টেলিভিশন সংস্কৃতির অন্যতম স্থপতি।

কলকাতা চারুকলা ইনস্টিটিউট থেকে গোল্ড মেডেল অর্জন করে দেশে ফিরে তার সামনে ছিল শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত হওয়ার স্বাভাবিক পথ। কথা ছিল ঢাকা চারুকলা ইনস্টিটিউটে যোগ দেওয়ার। কিন্তু সেই সময়ে ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত হয় টেলিভিশন কেন্দ্র। তৎকালীন টেলিভিশন কর্তৃপক্ষ বুঝতে পেরেছিলেন—এই অসাধারণ শিল্পীর সৃজনশীলতা শুধু শ্রেণিকক্ষের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকার নয়; এর প্রয়োজন একটি বৃহত্তর মাধ্যম, যেখানে একটি জাতির কল্পনা, রুচি ও সাংস্কৃতিক চেতনাকে নতুনভাবে গড়ে তোলা যায়।

বিজ্ঞাপন

তাই তাকে টেলিভিশনে যোগ দেওয়ার জন্য অনুরোধ করা হয়। শিক্ষকতার নিরাপদ পথ ছেড়ে তিনি বেছে নিলেন নতুন এক অজানা ক্ষেত্র—টেলিভিশন। এরপরের ইতিহাস বাংলাদেশের গণমাধ্যমের ইতিহাসের এক উজ্জ্বল অধ্যায়।

মুস্তাফা মনোয়ারের শৈল্পিক দৃষ্টিভঙ্গি, নান্দনিকতা ও সৃজনশীল চিন্তার স্পর্শে বাংলাদেশ টেলিভিশনের অনুষ্ঠান নির্মাণ এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছায়। তিনি বুঝেছিলেন, টেলিভিশন শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়; এটি মানুষের চিন্তা, সংস্কৃতি, শিক্ষা ও মূল্যবোধ নির্মাণের শক্তিশালী মাধ্যম। তার হাতে অনুষ্ঠান হয়ে উঠেছিল শিল্পের এক নতুন ভাষা।

আশির দশকে বাংলাদেশ টেলিভিশনে প্রযোজক হিসেবে যোগ দেওয়ার পর এই বিশাল সৃষ্টিশীল ব্যক্তিত্বকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয় আমার। প্রতিবার তাকে দেখলেই শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে আসত। তার মধ্যে ছিল শিল্পীর বিনয়, শিক্ষকের গভীরতা এবং একজন প্রকৃত সংস্কৃতিসেবীর নিরহংকার ব্যক্তিত্ব।

তার সঙ্গে কাজের একটি স্মৃতি আজও আমার মনে উজ্জ্বল হয়ে আছে

বাংলাদেশ টেলিভিশনে উপমহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করার সময় চীন থেকে একটি বিশেষ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের আমন্ত্রণ আসে। এশিয়ার ১৩টি দেশ সেই অনুষ্ঠানে অংশ নেবে। বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করার জন্য বিশিষ্ট নৃত্যশিল্পী শিবলী মুহাম্মদের নেতৃত্বে ১০ সদস্যের একটি দল প্রস্তুত করি।

এরপর আমাকে জানানো হলো—এই আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতার জন্য বাংলাদেশ থেকে একজন বিচারক নির্বাচন করতে হবে।

আমি কিছুটা চিন্তায় পড়ে গেলাম। এমন একটি আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করার জন্য কাকে নির্বাচন করা যায়? অনেক নামের ভিড়ে হঠাৎ একটি নাম যেন স্পষ্ট হয়ে উঠল—মুস্তাফা মনোয়ার।

শিল্প, নন্দনতত্ত্ব, সংস্কৃতি ও আন্তর্জাতিক মানের বিচারে তিনি ছিলেন এই দায়িত্বের জন্য একেবারে উপযুক্ত একজন মানুষ। তাকে প্রস্তাব দেওয়ার পর তিনি সানন্দে আমন্ত্রণ গ্রহণ করলেন।

আমরা সবাই চীনের শেনজেনে যাত্রা করলাম। আয়োজকদের কাছেও খুব দ্রুত স্পষ্ট হয়ে উঠল—বাংলাদেশ থেকে আসা এই মানুষটি শুধু একজন বিচারক নন, তিনি একজন জীবন্ত শিল্প-প্রতিষ্ঠান। তার জ্ঞান, রুচি ও ব্যক্তিত্ব সবাইকে মুগ্ধ করেছিল।

এরপর এলো সেই প্রতীক্ষিত মুহূর্ত। শুরু হলো প্রতিযোগিতা। এশিয়ার ১৩টি দেশের অংশগ্রহণে সেই আয়োজন ছিল অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ।

স্টেজের পেছনে বসে আমি উৎকণ্ঠা নিয়ে অপেক্ষা করছিলাম। প্রত্যাশা ছিল—বাংলাদেশ যেন তার সংস্কৃতির মর্যাদা ধরে রাখতে পারে।

যখন ঘোষণা এলো—১৩টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ গোল্ডেন ক্রেস্ট অর্জন করেছে—সেই আনন্দের মুহূর্ত ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।

আমরা সবাই উচ্ছ্বসিত হয়ে ক্রেস্ট হাতে মুস্তাফা মনোয়ারের কাছে গেলাম। তাকে সালাম জানালাম। তার মুখের আনন্দ, তার চোখের উজ্জ্বলতা—আজও আমার স্মৃতিতে অমলিন হয়ে আছে।

তিনি ছিলেন এমন একজন মানুষ, যার কাছে শিল্প মানে শুধু সৌন্দর্যের চর্চা নয়; শিল্প মানে ছিল মানুষের মননকে সমৃদ্ধ করা, একটি জাতির আত্মপরিচয়কে শক্তিশালী করা।

মুস্তাফা মনোয়ার ছিলেন শুধু একজন শিল্পী নন, তিনি ছিলেন বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক চেতনার এক উজ্জ্বল নির্মাতা। চিত্রকলা, টেলিভিশন, নাটক, পাপেট ও সৃজনশীল শিক্ষার মাধ্যমে তিনি প্রজন্মের পর প্রজন্মকে সৌন্দর্য, মানবতা ও দেশপ্রেমের পাঠ দিয়েছেন। তার হাত ধরে বাংলাদেশ টেলিভিশন পেয়েছে নতুন নান্দনিক ভাষা, শিশুরা পেয়েছে কল্পনার জগৎ, আর বাংলা সংস্কৃতি পেয়েছে বিশ্বমঞ্চে পরিচয়ের এক অনন্য ঠিকানা। শিল্পের প্রতি তার নিষ্ঠা ও মানুষের প্রতি তার ভালোবাসা তাকে করে তুলেছে এক অমলিন আলোকবর্তিকা।

কোনো একদিন একান্ত আলাপচারিতায় স্যারকে প্রশ্ন করেছিলাম—টেলিভিশনের পর্দায় আপনি যে অসংখ্য স্মরণীয় নাটক, অনুষ্ঠান ও শিল্পসৃষ্টির মাধ্যমে একটি প্রজন্মের রুচি ও চিন্তাকে সমৃদ্ধ করেছেন, চলচ্চিত্র নির্মাণে নিজেকে সম্পূর্ণভাবে নিবেদন করলেন না কেন?

স্যার কিছুটা আক্ষেপের সুরে বলেছিলেন—‘এটি আমার জীবনের একটি বড় ভুল।’

সেই মুহূর্তে আমি কিছু বলতে পারিনি। কারণ মনে হলো, বাংলাদেশের চলচ্চিত্র হয়তো আরেকজন বিশ্বমানের নির্মাতাকে পেতে পারত। তার শিল্পবোধ, নান্দনিকতা, মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি ও সৃজনশীলতার গভীরতা যদি চলচ্চিত্রের ভাষায় প্রকাশ পেত, তবে বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে হয়তো আরো একটি উজ্জ্বল অধ্যায় যুক্ত হতো।

তবু একজন মুস্তাফা মনোয়ারকে শুধু তিনি কী করতে পারেননি, সেই হিসাব দিয়ে মূল্যায়ন করা যায় না। তিনি যা দিয়েছেন, তা-ই একটি জাতির সাংস্কৃতিক সম্পদ হয়ে আছে। টেলিভিশনের পর্দায় তিনি শুধু অনুষ্ঠান নির্মাণ করেননি, তিনি তৈরি করেছেন একধরনের শিল্পচেতনা; পুতুলে প্রাণ দিয়েছেন, শিশুদের কল্পনাকে ডানা দিয়েছেন, চিত্রকলায় সৌন্দর্যের ভাষা নির্মাণ করেছেন আর বাঙালির আত্মপরিচয়কে সৃজনশীলতার আলোয় উদ্ভাসিত করেছেন।

আজ যখন স্যারের স্মৃতির পাতা খুলে দেখি, মনে হয়—কিছু মানুষ চলে গেলেও তাদের সৃষ্টি আমাদের চারপাশে নীরব আলোর মতো থেকে যায়। মুস্তাফা মনোয়ার তেমনই একজন মানুষ। তিনি ছিলেন শিল্পী, শিক্ষক, সংগঠক, স্বপ্নদ্রষ্টা এবং সর্বোপরি একজন সংস্কৃতির সাধক।

মুস্তাফা মনোয়ার আমাদের কাছে শুধু অতীতের একটি নাম নন; তিনি বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক বিবেকের এক উজ্জ্বল অধ্যায়। তার প্রতি আমাদের ঋণ কখনো শোধ হওয়ার নয়। গভীর শ্রদ্ধায় তাকে স্মরণ করি।

লেখক : সাবেক উপমহাপরিচালক, বাংলাদেশ টেলিভিশন

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন