জুলাই শহীদদের কতবার শহীদ করা আমরা সহ‍্য করব

মোস্তফা সরয়ার ফারুকী

জুলাই শহীদদের কতবার শহীদ করা আমরা 
সহ‍্য করব

জুলাই অভ‍্যুত্থানের বর্ষপূর্তি উপলক্ষে বিএনপির উদ্যোগে আয়োজিত অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ দলগতভাবে আওয়ামী লীগের অপরাধের বিচার প্রসঙ্গে স্পষ্ট কথা বলেছেন। তাকে এবং বর্তমান সরকারকে এ অবস্থানের জন‍্য ধন্যবাদ।

আমি আরেকটা জরুরি বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই। ফ‍্যাসিবাদ কখনো একা একা তৈরি হয় না, এগজিস্টও করতে পারে না। এটার জন‍্য আদর্শিক ঢালটা তৈরি করে দেয় সাংবাদিক-সংস্কৃতিকর্মী-বুদ্ধিজীবীরা। যেটাকে সবাই এক নামে ফ‍্যাসিবাদের মিডিয়া-কালচারাল উইং নামে ডাকে। এরাই মুক্তিযুদ্ধের নামে, প্রগতিশীলতার নামে ফ‍্যাসিবাদবিরোধীদের সাবহিউমানে পরিণত করেছিল।

বিজ্ঞাপন

আওয়ামী লীগ বাদে সবাইকে এরা রাজাকার বানিয়ে হত‍্যাযোগ‍্য করে তুলেছিল। এরা অন‍্যদের তো সাবহিউমান বানিয়েছেই, এমনকি খালেদা জিয়া বা আজকের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকেও সাবহিউমান বানিয়েছিল। তাহলে সাধারণ নাগরিকদের কি অবস্থা হয়েছিল ভাবেন।

কিন্তু ফ‍্যাসিবাদের সম্মতি উৎপাদন যারা করেছেন এবং এখনো যারা খুব দুর্বল কিছু কৌশলে ফ‍্যাসিবাদকে ঢাল দেওয়ার চেষ্টা করছেন, তাদের ক্ষেত্রে কী করণীয়? সিনিয়র সাংবাদিক, শিল্পী, মডেলÑএ রকম নানা রকমারি নামের আড়ালে বেশ কিছু আওয়ামী ফুট সোলজার এসব কাজ করে যাচ্ছেন।

এরা জুলাই এবং ১৬ বছরে মানবতাবিরোধী অপরাধের ভিকটিমদের নিয়ে কটাক্ষ করলে করণীয় কী? আমার কথা যদি বলেন, ব‍্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি, জুলাইয়ের পরাজিত শক্তি পাগল হয়ে কী বলে না বলে এটাকে আলোচনায়ও আনার দরকার নেই।

কিন্তু আমি তো কাউকে হারাইনি। আমি বা আমরা এখানে কোনো বিষয় না। বিষয় হচ্ছে ওই সন্তানহারা মা, বাবা, স্ত্রী ও পরিবার-পরিজন। আমরা কী তাদের অনুভূতিকে কোনো গুরুত্ব দেব না?

নাকি আমরা এই ল‍্যাসপেন্সারদের এভাবে ছুরি হাতে ঘুরে বেড়াতে দেব? আর তারা সেই ছুরি দিয়ে শহীদদের স্মৃতিকে কেটে ফালা ফালা করবে? বলবে ‘জুলাইতে কিছু হয় নাই, সব মেটিকিউলাস ডিজাইন’? শহীদ ইয়ামিনরা যেমন শেষ একবার দম নেওয়ার জন‍্য দুনিয়ার সব বাতাস টেনে ভেতরে নেওয়ার চেষ্টা করছিল, ইয়ামিন-ওয়াসিম-সাঈদ-মুগ্ধ-নাইমাদের বাবা-মায়েরা যখন এসব শোনে, তখন তাদেরও এ রকম নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হয়। প্রতিবার এসব মানবিক বোধ শূন্য জম্বিরা যখন টিভিতে পত্রিকায় এসব বলে, আমাদের শহীদরা দ্বিতীয়বার, তৃতীয়বার, অজস্রবার শহীদ হয়।

একটা শহীদের বাবা কিংবা মা কতবার এটি সহ্য করবে? কেন করবে? এর প্রতিকার কী?

যখন গুমের ভিকটিমদের পরিবারকে রক্তাক্ত করে বলা হয় ‘গুম বলে কিছু নাই’Ñতখন তার প্রতিকার কী?

রাষ্ট্রকে এর প্রতিকারের ব‍্যবস্থা করতে হবে। ১৬ বছরের সব শহীদের বিচারের ব্যবস্থাই শুধু করলে হবে তা না, শহীদদের স্মৃতি ও তাদের পরিবারকে এই ফ‍্যাসিবাদের সম্মতি উৎপাদনকারীদের হাত থেকে রক্ষা করতে হবে রাষ্ট্রকেই।

এটি এক রক্তক্ষয়ী বিপ্লবের পরবর্তী পর্যায়! এটাকে স্বাভাবিক সময় হিসেবে বিবেচনা করলে হবে না।

যদি দরকার হয় আইন করা হোক ফ‍্যাসিবাদের সম্মতি উৎপাদনকারীদের বিচারের জন‍্য। নিদেনপক্ষে ট্রুথ অ‍্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন করা হোক।

পাশাপাশি আইন করা হোক ভিকটিমদের স্মৃতিকে অশ্রদ্ধা করে এমন কোনো কিছু প্রচার নিষিদ্ধ করার লক্ষ্যে। অ‍্যাট লিস্ট ক্ষত শুকানোর সময়টা পর্যন্ত ভিকটিমদের পরিবারকে এই প্রটেকশন দেওয়া হোক।

একবার ভাবেন তো মুক্তিযুদ্ধের পর কোনো লোক সাহস করত টিভি শোতে এসব বলতে? চব্বিশ মুক্তিযুদ্ধের মতো এত ব‍্যাপক না হলেও এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে রক্তাক্ত গণঅভ্যুত্থান তো। এটা তো এই জাতির সার্বভৌমত্ব রক্ষা আর স্বাধীন দেশে পরাধীন দশা থেকে মুক্তির যুদ্ধই।

লেখক : অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন