আর্জেন্টিনা বনাম কেপ ভার্দে

বাংলাদেশে ক্ষমতার স্বৈরতান্ত্রিক প্রবণতা

ড. মুহাম্মাদ সাইদুল ইসলাম

বাংলাদেশে ক্ষমতার স্বৈরতান্ত্রিক প্রবণতা

কেন বাংলাদেশে প্রায় সব সরকারই ধীরে ধীরে বাকশাল, স্বৈরতন্ত্র বা ফ্যাসিবাদী প্রবণতার দিকে ঝুঁকে পড়ে? এটি একটা বড় সমাজতাত্ত্বিক প্রশ্ন (Sociological question)। বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রায় প্রত্যেক সরকারই ক্ষমতায় যাওয়ার পর ধীরে ধীরে আরো কেন্দ্রীভূত, অসহিষ্ণু এবং কর্তৃত্ববাদী হয়ে ওঠার প্রবণতা শুধু একটি দল বা ব্যক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। স্বাধীনতার পর বিভিন্ন আদর্শ, বিভিন্ন নেতৃত্ব এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় এসেছে, কিন্তু দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকলে অধিকাংশ সরকারই বিরোধী শক্তিকে দুর্বল করা, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে দলীয়করণ, সংবাদমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ এবং নির্বাহী ক্ষমতাকে সম্প্রসারণের দিকে ঝুঁকেছে। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময়কে অনেকেই আংশিক ব্যতিক্রম হিসেবে দেখেন, কারণ তার শাসনকাল তুলনামূলকভাবে সংক্ষিপ্ত ছিল এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক পুনর্গঠনের সুযোগ তিনি পাননি।

সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিতে এটি কোনো ব্যক্তিগত চরিত্রের সমস্যা নয়; বরং এটি রাষ্ট্রের কাঠামো, রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং ক্ষমতার সামাজিক সংগঠনের সমস্যা। সংক্ষেপে আমার সমাজতাত্ত্বিক অনুসন্ধানগুলো নিচে তুলে ধরা হলো।

বিজ্ঞাপন

এক.

ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের উত্তরাধিকার : বাংলাদেশ যে রাষ্ট্রকাঠামো উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছে, সেটি গণতন্ত্র নির্মাণের জন্য নয়; বরং শাসন ও নিয়ন্ত্রণের জন্য নির্মিত হয়েছিল। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের মূল লক্ষ্য ছিল জনগণকে প্রতিনিধিত্ব দেওয়া নয়, বরং প্রশাসন, পুলিশ ও আমলাতন্ত্রের মাধ্যমে সমাজকে নিয়ন্ত্রণ করা। পরে পাকিস্তানও একই প্রশাসনিক কাঠামো বজায় রাখে। স্বাধীনতার পর রাষ্ট্র বদলালেও রাষ্ট্রযন্ত্রের চরিত্র খুব বেশি বদলায়নি। ফলে যে-ই ক্ষমতায় আসে, সে এই শক্তিশালী রাষ্ট্রযন্ত্রকে নিজের রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করার প্রবল প্রলোভনে পড়ে।

দুই.

Winner-Takes-All রাজনৈতিক সংস্কৃতি : বাংলাদেশের নির্বাচন শুধু সরকার পরিবর্তনের প্রক্রিয়া নয়; এটি প্রায়ই রাষ্ট্রের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের প্রতিযোগিতা। নির্বাচনে জয় মানেই প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ, পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর প্রভাব, উন্নয়ন বাজেটের বণ্টন, রাষ্ট্রীয় নিয়োগ এবং অর্থনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা। অন্যদিকে পরাজয় মানে প্রায়ই রাজনৈতিক অস্তিত্বের সংকট। ফলে ক্ষমতায় থাকা দল মনে করে যে ক্ষমতা হারানো মানেই নিরাপত্তা হারানো। এই বাস্তবতা সরকারকে ক্রমাগত ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করার দিকে ঠেলে দেয়। গবেষকরা একে ‘winner-takes-all politics’ এবং ‘monopolization of state institutions’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

তিন.

দুর্বল প্রতিষ্ঠান, শক্তিশালী ব্যক্তি : বাংলাদেশে রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর তুলনায় ব্যক্তিকেন্দ্রিক নেতৃত্ব অনেক বেশি শক্তিশালী। ফলে রাজনৈতিক দল হয়ে পড়ে নেতানির্ভর, সংসদ হয়ে যায় দুর্বল, দলীয় অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র হয়ে যায় সীমিত আর স্বাধীন প্রতিষ্ঠানগুলো ক্রমাগত রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়তে থাকে। ফরাসি সমাজতাত্ত্বিক Pierre Bourdieu যাকে symbolic power বলেন, বাংলাদেশে তা প্রায়ই ব্যক্তির হাতে কেন্দ্রীভূত হয়।

চার.

পৃষ্ঠপোষকতা (Patron-Client Politics) : বাংলাদেশের রাজনীতি এখনো অনেকাংশে পৃষ্ঠপোষকতাভিত্তিক (patron-client)। ক্ষমতায় থাকা দল চাকরি দেয়, ব্যবসার সুযোগ দেয়, টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ করে এবং প্রশাসনিক সুবিধা দেয়। বিনিময়ে রাজনৈতিক আনুগত্য প্রত্যাশা করে। এভাবে রাষ্ট্র ধীরে ধীরে ‘নাগরিকদের রাষ্ট্র’ না হয়ে ‘দলের সম্পদে’ পরিণত হতে শুরু করে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি নিয়ে বহু গবেষণায় এই patron-client সম্পর্ককে কর্তৃত্ববাদের একটি প্রধান ভিত্তি হিসেবে দেখানো হয়েছে।

পাঁচ.

ভয় ও নিরাপত্তাহীনতার রাজনীতি : বাংলাদেশে ক্ষমতা হারানো অনেক সময় শুধু নির্বাচন হারানো নয়; বরং মামলা, রাজনৈতিক প্রতিশোধ, আর্থিক ক্ষতি এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতায় শিকার হওয়া। ক্ষমতা হারানোটা ব্যক্তিগত নিরাপত্তার ঝুঁকির সঙ্গেও যুক্ত। ফলে ক্ষমতায় থাকা সরকার মনে করে, ক্ষমতায় থাকা মানেই নিরাপদ থাকা আর ক্ষমতার বাইরে থাকা মানেই অস্তিত্বহীনতা। এই নিরাপত্তাহীনতা সরকারকে আরো বেশি কর্তৃত্ববাদী করে তোলে।

ছয়.

বিরোধী রাজনীতির দুর্বল গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি : বাংলাদেশে প্রায় সব বড় দলই বিরোধী দলে থাকলে গণতন্ত্রের দাবি তোলে, কিন্তু ক্ষমতায় গেলে একই ধরনের রাষ্ট্রীয় কৌশল ব্যবহার করার প্রবণতা দেখা যায়। আবার বিরোধী দল যদি সংসদ এবং সংসদের বাইরে সরকারি দলকে পর্যাপ্ত চেক অ্যান্ড ব্যালান্সের মধ্যে রাখতে অক্ষম হয়, সে ক্ষেত্রেও সরকারি দলের ফ্যাসিস্ট প্রবণতা বৃদ্ধি পায়। অর্থাৎ সমস্যা শুধু সরকারে নয়; সমস্যা বিরোধী দলের এবং সর্বোপরি রাজনৈতিক সংস্কৃতির।

সাত.

রাষ্ট্র ও দলের সীমারেখা মুছে যাওয়া : সমাজবিজ্ঞানী Max Weber রাষ্ট্রকে বৈধ কর্তৃত্বের প্রতিষ্ঠান হিসেবে ব্যাখ্যা করেছিলেন। তবে রাষ্ট্র এবং সরকার সম্পূর্ণ দুটো ভিন্ন প্রতিষ্ঠান; একটার সঙ্গে আরেকটা গুলিয়ে ফেললেই সমস্যা। অথচ বাংলাদেশে বহু সময় দেখা যায় : দল মানেই সরকার; আর সরকার মানেই রাষ্ট্র। রাষ্ট্র এবং সরকারের সীমারেখা দুর্বল হলে রাষ্ট্রীয় নিরপেক্ষতা ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং সরকার নির্ঘাত এক ফ্যাসিবাদের দিকে ধাবিত হয়।

আট.

জবাবদিহির দুর্বলতা : গণতন্ত্র শুধু নির্বাচন নয়। সুষ্ঠু গণতন্ত্রের জন্য প্রয়োজন অন্তত ছয়টি অপরিহার্য বিষয় : ক. স্বাধীন বিচারব্যবস্থা, খ. কার্যকর সংসদ, গ. স্বাধীন নির্বাচন কমিশন, ঘ. মুক্ত সংবাদমাধ্যম এবং ঙ. সক্রিয় নাগরিক সমাজ। এসব প্রতিষ্ঠান দুর্বল হলে নির্বাহী ক্ষমতা স্বাভাবিকভাবেই সম্প্রসারিত হয়। এ কারণেই অনেক গবেষক বাংলাদেশকে ধীরে ধীরে ‘competitive authoritarianism’-এর দিকে অগ্রসর হয়েছে বলে বিশ্লেষণ করেছেন।

নয়.

উন্নয়ন দিয়ে বৈধতা অর্জনের প্রবণতা : বাংলাদেশে প্রায় সব সরকার উন্নয়নকে রাজনৈতিক বৈধতার প্রধান উৎস হিসেবে ব্যবহার করেছে। যখন উন্নয়নই বৈধতার প্রধান ভিত্তি হয়ে যায়, তখন বিরোধিতা সহজেই ‘উন্নয়নবিরোধী’ হিসেবে চিত্রিত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে। ফলে মতভিন্নতার রাজনৈতিক পরিসর সংকুচিত হতে থাকে এবং সরকার হয়ে পড়ে কর্তৃত্ববাদী।

দশ.

ক্যারিশম্যাটিক নেতৃত্বের অতিনির্ভরতা : Max Weber ক্যারিশম্যাটিক কর্তৃত্বের কথা বলেছিলেন। বাংলাদেশে রাজনৈতিক দলগুলো প্রায়ই ব্যক্তিকে প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বে স্থান দেয়। ফলে জন্ম নেয় কিছু উদ্ভট রাজনৈতিক সংস্কৃতির : ক. নেতার সমালোচনা মানে দলের সমালোচনা এবং খ. দলের সমালোচনা মানে রাষ্ট্রের সমালোচনা! এই সংস্কৃতি গণতান্ত্রিক বিতর্ককে দুর্বল ও সংকুচিত করে ফ্যাসিবাদের রাস্তাকেই উন্মুক্ত করে।

তাহলে সমাধান কোথায়?

বাংলাদেশে গণতন্ত্র টেকসই করতে হলে ব্যক্তি নয়, প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে : স্বাধীন নির্বাচন কমিশন, দলীয় অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র, সংসদের কার্যকর জবাবদিহি, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, প্রশাসনের রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা, স্থানীয় সরকারের ক্ষমতায়ন, সংবাদমাধ্যম ও নাগরিক সমাজের স্বাধীনতা এবং ক্ষমতার সাংবিধানিক ভারসাম্য।

ফ্যাসিবাদ যাতে আর কখনো ফিরে না আসে, সে লক্ষ্যেই অন্তর্বর্তী সরকার জুলাই চার্টার প্রণয়ন করে গণভোটের মাধ্যমে তা অনুমোদন করেছিল। এর মাধ্যমে বাংলাদেশে ইনসাফভিত্তিক, জবাবদিহিমূলক এবং প্রকৃত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলার এক ঐতিহাসিক সুযোগ সৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু পরে গণভোটের রায় ও জুলাই চার্টারের মৌলিক চেতনাকে কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের পরিবর্তে যদি পুরোনো রাজনৈতিক বন্দোবস্তই বহাল এবং আরো প্রাতিষ্ঠানিক করা হয়, তাহলে সেই ঐতিহাসিক সুযোগ নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। কারণ, যে কাঠামোগত দুর্বলতাগুলো অতীতে বারবার কর্তৃত্ববাদ ও ফ্যাসিবাদী প্রবণতার জন্ম দিয়েছে, সেগুলো অক্ষুণ্ণ থাকলে ভবিষ্যতেও একই ধরনের রাজনৈতিক পুনরাবৃত্তির ঝুঁকি থেকেই যাবে। ফলে আশঙ্কা থেকেই যায় যে, এভাবে অনিচ্ছাকৃতভাবে আরেকটি ফ্যাসিবাদী পথই প্রশস্ত হতে পারে।

লেখক : অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর (সমাজবিজ্ঞান), নানইয়াং টেকনোলজিক্যাল ইউনিভার্সিটি সিঙ্গাপুর

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন